২৫ এপ্রিল ২০২৪

অসীম সাহস আর সততাই যার পুঁজি

সাইদুল ইসলাম »

জীবন যেন এক সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমা। এই পরিক্রমায় কিছু কিছু মানুষ নিজের কর্মগুণে সফল হয়ে ওঠেন। সাহস আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। সেবা ও ত্যাগের মহিমায় নিজেকে উজাড় করে দিয়ে একজন সমাজহিতৈষী মানুষে রূপান্তরিত হন। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি তাদেরই একজন, যিনি তার দীর্ঘ জীবনে দেশ, মানুষ আর আদর্শের প্রতি অবিচল থেকেছেন। কখনো প্রশ্রয় দেননি শঠতা, প্রতারণা আর ভণ্ডামিকে। আশ্রয় দেননি অন্যায়কারী, সন্ত্রাসী আর দেশদ্রোহীদের। সব সময় নিজ গুণে ভালোবেসে গেছেন আদর্শকে।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি মীরসরাই উপজেলার ধুম ইউনিয়নের একটি ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম এস রহমান তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। মা পাঞ্জেবুনেছা। পড়াশোনায় বরাবরই মেধাবী ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ১৯৬৬ সালে তিনি লাহোর থেকে খনিজ বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। সাহসিকতার জন্য লাহোরে বাঙালি ছাত্রদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় মোশাররফ ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। সেখানে পড়াশোনাকালে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ৬ দফার ডাক দিলে লাহোরে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদের নিয়ে মোশাররফ হোসেন ছয় দফা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৯ সালে কক্সবাজারে হোটেল সায়মনের লনে বঙ্গবন্ধুর সম্মানে ক্যান্ডেললাইট নৈশভোজের আয়োজন করেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

বঙ্গবন্ধুপ্রেমী মোশাররফ চট্টগ্রামের তৎকালীন সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতা এম এ আজিজের পরামর্শে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়েন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে মীরসরাই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১ মার্চ দুপুরে ৩ মার্চের জন্য প্রস্তাবিত গণপরিষদ অধিবেশন মুলতুবি ঘোষণা করলে সারা বাংলা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে স্বদেশ মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। যুদ্ধকালীন চট্টগ্রামের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তিনি গেরিলাযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। ১৭ মার্চ জন্মদিনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম পাকিস্তানি সেনাদের রসদ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা হিসেবে শুভপুর ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনাটা বঙ্গবন্ধুকে জানান। বঙ্গবন্ধু খুশিতে বুকে জড়িয়ে বলেন ‘সাবাশ’।

যুদ্ধকালীন ২৫ মার্চ ব্রিগেড পাকিস্তানি সৈন্য চট্টগ্রাম অভিমুখে রওনা দেয়। এ খবর জানতে পেরে তৎকালীন এমপিএ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তার সাথিদের নিয়ে মীরসরাই শুভপুর ব্রিজের কাঠের অংশে অগ্নিসংযোগ করেন। ফলে পাকিস্তানি সৈন্যবাহী ২৬টি সাঁজোয়া যান চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করতে বেশ কালক্ষেপণ হয়। এরপর তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মীরসরাই থানার পাশে অবস্থিত অচি মিয়ার ব্রিজ ধ্বংসের নেতৃত্ব দেন। এরপর ধ্বংস করে দেন হিঙ্গুলি ব্রিজ। পরে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপারেশনের জন্য পরিকল্পনা করেন এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচল মন্থর করে দিতে সহযোদ্ধাদের নিয়ে বাড়বকুণ্ড কেমিক্যাল কমপ্লেক্স ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সাব-সেক্টর কমান্ডার ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ৮ ডিসেম্বর মীরসরাই হানাদারমুক্ত হয়। ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। মুক্তিযুদ্ধে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বপরূপ বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে বাংলাদেশ সরকার ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও সর্বশেষ ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদে তিনি বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের এবং ১৯৯৬ সালে অত্যন্ত দক্ষতা ও সততার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন, পর্যটন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮০, ২০০৪ ও ২০১২ সালে সভাপতি এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি চতুর্থ বারের মতো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৭৫-পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের মন্ত্রী পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আহ্বান তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজ দলের আদর্শে অবিচল থেকেছেন। লোভ-লালসা তাকে কখনোই স্পর্শ করতে পারেনি।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আস্থার সেতু তৈরিতে নিরলস কাজ করেছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তিনি ১৯৭২ সালে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহামায়া লেক প্রকল্প আকারে বঙ্গবন্ধুর কাছে পেশ করেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মহামায়া বহুমুখী প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম লেক মহামায়া উদ্বোধন করেন। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন জমি খুঁজছিলেন, তখন মীরসরাইয়ে জমির সন্ধান দেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তিনি মেজ ছেলে আইটি বিশেষজ্ঞ মাহবুব রহমান রুহেলের সহায়তায় ম্যাপসহ একটি প্রস্তাবনা নিয়ে ইছাখালী চরের জায়গাটি ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রীকে দেখান। যেখানে বর্তমানে মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল তথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর গড়ে উঠেছে। মীরসরাই-সীতাকুণ্ড-সোনাগাজী উপজেলার ৩৩ হাজার একর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল এটি। এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে পরিবহন, আবাসান, শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের ছোঁয়া লাগবে। মীরসরাই হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম পরিকল্পিত স্মার্ট সিটি।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তার মরহুম বাবা এস রহমানের নামে ট্রাস্ট গঠন করে চট্টগ্রামের মীরসরাই অঞ্চলের শিক্ষা খাতে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যার অন্যতম মহাজনহাট ফজলুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, গোলকেরহাট পাঞ্জেবুনেছা বালিকা বিদ্যালয় (পিএন গালর্স স্কুল), মীরসরাই সদরে এস রহমান আইডিয়াল স্কুল, নতুন করে হাইতকান্দি ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন কলেজ। যুক্ত ছিলেন জোরারগঞ্জ মহিলা কলেজ, বারইয়ারহাট ডিগ্রি কলেজসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে। ১৯৬৭ সালে আয়েশা সুলতানার সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তিন পুত্র এবং এক কন্যাসন্তানের বাবা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, দৈনিক ইত্তেফাক।

আরও পড়ুন