১৩ এপ্রিল ২০২৪

এক আজিজেই কপোকাত অর্ধশতাধিক নারী

শিলা (ছদ্মনাম) দুই সন্তানের জননী। দুরারোগ্য ব্যাধিতে এক যুগ আগে স্বামীর মৃত্যুর পর দুসন্তানকে বুকে আগলে সংগ্রামী জীবন পার করছেন তিনি। এ সময়ের মাঝে বিয়ের অনেক প্রস্তাব এলেও সাই দেননি। মাস ছয়েক আগে কক্সবাজার বিচ কার্নিভাল দেখতে এসে ফেঁসে যান আজিজ নামের এক ভয়ংকর নারী শিকারীর জালে।

মেয়ে পটাতে পটু আজিজ কৌশলে নাম্বার নেন শিলার। সে থেকে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করে একপর্যায়ে বিয়ের প্রস্তাব দেন। সহজসরল নারী শিলাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে কৌশলে শহরে নিয়ে আসেন। তবে, বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজি না হওয়ায় তৎক্ষণাৎ কালিমা পড়ে মৌখিক বিয়ে করে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। শহরের বিভিন্ন হোটেল ও রুমালিয়ার ছড়া তার বড় ভাইয়ের বাসায় নিয়ে স্বামীর অধিকার খাটান। এ সময় ধূর্ত ও সুচতুর আজিজ গোপনে একান্তে সময় কাটানোর ভিডিও ধারণ করেন।

এদিকে, শিলা আনুষ্ঠানিক বিয়ে করে ঘরে তুলতে জোরাজুরি করলে বেরিয়ে আসে লম্পট আজিজের আসল রূপ। সে তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিড়িও ধারণ করে রেখেছেন বলে হুমকি দেন। বেশি বাড়াবাড়ি করলে হাতে থাকা ভিডিও সামাজিক যোগযাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিতে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকেন। প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার শিলাকে হোটেলে যেতে বাধ্য করেন আজিজ। একপর্যায়ে অনন্যোপায় হয়ে আইনের আশ্রয় নেন ভুক্তভোগী শিলা।

শিলা কক্সবাজার সদর মডেল থানায় উপস্থিত হয়ে অভিযুক্ত আজিজের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছেন।

মামলার এজাহারে শিলা উল্লেখ করেন, কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সমিতিপাড়া এলাকার নজির আহমেদের ছেলে আজিজ উদ্দিন অত্যন্ত খারাপ চরিত্রের যুবক। তিনি নারী লোভী, চরিত্রহীন ও লম্পট। নারী শিকারী এ যুবক বিভিন্ন কায়দা-কৌশলে নারীকে ফাঁদে ফেলে টাকা আদায় করেন। নারীদের সর্বনাশ করা তার পেশা ও নেশা। শিলা উল্লেখ করেন, প্রায় ৫/৬ মাস পূর্বে কক্সবাজার শহরে বেড়াতে এসে লাবণী বিচ পয়েন্ট এলাকায় আজিজের সঙ্গে পরিচয় হয়। তখন থেকে আজিজ তার পিছু নিয়ে মোবাইলে নিয়মিত যোগাযোগ করেন।

আজিজ তার স্ত্রী অসুস্থ ও অক্ষম দাবি করে শিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেন। একপর্যায়ে গত বছরের ১৩ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টায় তাকে বিয়ে করার কথা বলে আজিজের বসতঘরে নিয়ে যায়। পরদিন বিয়ে করবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আজিজ তাকে ওই রাতেই একাধিকবার ধর্ষণ করেন। ১৪ অক্টোবর পরদিন শিলা বিয়ের জন্য কাজী অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলে আজিজ তাকে আজ নয়, পরে বিয়ে করবেন জানিয়ে সকাল ১০টার দিকে শিলাকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। পরবর্তীতে বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করলে আজিজ-শিলাকে তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের আপত্তিকর ছবি, ভিডিও ধারণ করা আছে বলে জানান। বিয়ের জন্য চাপাচাপি করলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গোপন ভিডিও প্রকাশ্যে আনার হুমকি দেন।

এরপর ধারাবাহিক ভাবে শিলাকে জিম্মি করে মাসের পর মাস শহরের বিভিন্ন হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ করতে থাকেন। শুধু ধর্ষণকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকেননি আজিজ। তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল অংকের টাকাও হাতিয়ে নেন। কয়েকদফায় আজিজ তার কাছ থেকে নগদ ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করেন শিলা।

এদিকে, এলাকায় তার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্থানীয়দের অনেকে তাকে নারী শিকারী আজিজ বলে ডাকেন। তার কারণে একাধিক নারীর সংসার ভাঙা, এমন কি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

অভিযোগ আছে, কৌশলে মেয়েদের পটিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে যৌন লালসা মিটানো ও টাকা হাতিয়ে নেওয়া তার পেশা ও নেশা। তার খপ্পরে পড়ে অনেক মেয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন। ভুক্তভোগী অনেক নারী বিভিন্ন সময় অভিযোগ নিয়ে থানায় দারস্থ হলেও মামলা পর্যন্ত গড়ায়নি। থানায় অভিযোগ নিয়ে গেলেই শুরু হয় নানামুখী তদবির। বহুরূপী আজিজের বিচরণ সর্বত্র। তার ফেসবুক পেইজে ঢুকে দেখা গেছে, সে একাধারে উদ্যোক্তা, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, নাট্যকর্মী, থিয়েটার কর্মীসহ নানান পরিচয়ে পরিচিত। ফেসবুক ওয়ালে শোভা পাচ্ছে শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে ছবি। সে এসব পরিচয় ও নেতানেত্রীদের ছবিকে পুঁজি করে দিনদিন বিস্তৃত করেছে তার অপকর্মের ফিরিস্তি।

আজিজের হাতে প্রতারণার শিকার শহরের পাহাড়তলী এলাকার এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আজিজ বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আমার সর্বনাশ করেছে। বিচার চেয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছি। কেউ আমার কথা শোনেনি। উল্টো আমাকে খারাপ মেয়ের তকমা দিয়েছে। শেষমেশ তার অব্যাহত হুমকির মুখে সব অন্যায় হজম করতে বাদ্য হয়ছি। এক প্রশ্নের জবাবে ওই নারী বলেন, অবশ্যই সেল্টার পেলে আজিজের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করবেন তিনি।

তার হাতে যৌন লালসার শিকার আরেক নারী সর্বশান্ত হয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়ে গৃহকর্মীর কাজ করছেন। ওই নারী নাম প্রকাশ না করে জানান, আজিজ যে মোটরবাইক চালায় সেটিও আমার টাকায় কেনা। লম্পট আজিজ রঙ্গিন স্বপ্ন দেখিয়ে শুধু আমাকে ভোগ করেনি, আমার টাকা-পয়সা সব হাতিয়ে নিয়েছে। পরে ক্ষোভে অপমানে তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে গৃহকর্মীর কাজ করছেন বলে জানান।

কক্সবাজারের একজন উদ্যোক্তা নারীও একই ধরনের লালসা ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত আজিজের হাত থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভুক্তভোগী একাধিক নারী জানান, আজিজ উদ্যোক্তা ও সাংবাদিক পরিচয়ে ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে প্রথমে নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেন। পরে কৌশলে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এ সময় কৌশলে ভিডিও ধারণ করেন। পরে ব্ল্যাকমেইল করে ফাঁদে ফেলা নারীদের নিয়মিত একান্ত সময় কাটাতে বাধ্য করেন ভংয়কর নারী শিকারী আজিজ উদ্দিন।

এভাবে বিভিন্ন কায়দা-কৌশলে আজিজ প্রায় অর্ধশতাধিকের বেশি নারীর সর্বনাশ করেছেন বলে এলাকায় প্রচার আছে। কৌশলে প্রেমের ফাঁদে ফেলে প্রথমে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন ও গোপনে ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অংকের টাকা আদায় করা যেন তার পেশা। এসব টাকা দিয়ে শহরের নাজিরারটেক নামক এলাকায় বালিচড় শুঁটকি বিতান নামের একটি শুঁটকি মহাল গড়েছেন তিনি।

অভিযুক্ত আজিজ অভিযোগ অস্বীকার করে সব তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র দাবি করে বলেন, আমাকে সামাজিকভাবে ছোট করার জন্য নারীঘটিত অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

কক্সবাজার সদর থানার ওসি রকিবুজ্জামান বলেন, অভিযোগ পেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে তা মামলা আকারে রুজু করা হয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে মাঠে কাজ করছে পুলিশ।

আরও পড়ুন