১৫ মার্চ ২০২৬

করোনায় রাঙ্গামাটিতে পর্যটন বিপর্যয়

বিশেষ প্রতিবেদক  »

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা। পাহাড়, লেক আর ঝুলন্ত সেতুকে ঘিরে এই এলাকার মানুষের আয়ের অন্যতম উৎস। বর্ষা মৌসুমেও এই পার্বত্য ও পর্যটন এলাকায় আয় ধসের কোন ইতিহাস নেই। কিন্তু করোনার কারণে এখন ঘরে ঘরে আয়ের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। পাহাড়েই রাঙ্গামাটি পার্বত্য এলাকার ১৪টি জনগোষ্ঠীর প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মানুষের বসাবাস।
এদিকে, রাঙ্গামাটি অনেকটা পর্যটক নির্ভর জনজীবন হলেও করোনার কারণে ১১৭টি স্পটে ভাসমান হকাররা নিষ্প্রাণ করোনার প্রহর গুণছে। জীবনের ঘানি টানা কঠিন হয়ে পড়েছে পরিবারের কর্তার। করোনার কারণে পর্যটক শূন্য কাপ্তাই- রাঙ্গামাটি নৌঘাট। সেইসঙ্গে যেহেতু বাস বা অন্যকোন যান চলাচল বন্ধ রয়েছে ফলে রাঙ্গামাটি লেকে অলস সময় কাটাচ্ছে নৌযানগুলো। এদের পরিবারের অবস্থাও নাজুক।

অলস বসে আছে ইঞ্জিন বোট

রাঙ্গামাটি জেলা চারটি প্রধান পর্বতমালা বেস্টিত। জেলার সবোর্চ্চ গিরিশৃঙ্গ বরকল উপজেলায় অবস্থিত। যার উচ্চতা- ২ হাজার ৪০৯ ফুট বা ৭৩ হাজার ৪২৬ মিটার। জেলার উত্তরাংশে থাকা উত্তর-দক্ষিণমুখী হাজার ফুট উচ্চতার পাহাড়গুলি এই শহরকে অনেকটা বেড়া দিয়ে রেখেছে। ফলে পর্যটকদের আকর্ষণও এই স্পটকে ঘিরে। রাঙ্গামাটি জেলার পশ্চিমে ফুরমোন পর্বতমালা যার উচ্চতা সর্বোচ্চ ১৫১৮ ফুট। এ পর্বতমালা দক্ষিণ-পূর্ব রামগড় পর্বতমালার অনুবৃত্তিক্রম। শহরের পূর্বে রয়েছে দোলা ঝিরি যা বেশ কিছু জলপ্রপাতে ভরা। সর্ব উত্তরে রয়েছে মাইনী উপত্যকা। ভূয়াছড়ি রেঞ্জ এই পর্বতমালার উচ্চতা ২ হাজার ৩ ফুট। সর্ব উত্তরে বরকল রেঞ্জ পর্যন্ত এ পর্বতমালা বিস্তৃত। শুধু তাই নয় যার কারণে বরকল রেঞ্জটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়েছে। যার একটি শাখা কর্ণফুলী নদীতে মিশে গেছে। অন্য শাখাটি ভারতের মিজোহিলে মিশেছে।

এই অঞ্চলে সমতল যেমন নেই তেমনি বসবাসও নেই সমতলে। সমূদ্রপৃষ্ঠের ৩০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার ফুট উচ্চতায় স্বপরিবারে বসবাস রয়েছে পাহাড়ী তথা আদিবাসী ও বাঙ্গালীর বসবাস। পাহাড় কাটার কোন অভিযোগ না থাকলেও জুম চাষের মাধ্যমে পাহাড়কে ন্যাড়া করার অভিযোগ রয়েছে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে। তবে এবারের এই প্রাকৃতিক ও আকস্মিক বিপর্যয়ের কারনে বিপর্যস্ত এ এলাকার মানুষগুলো।

পাহাড়ের ঢালে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস

এদিকে, রাঙ্গামাটির জলবায়ু ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ুর অন্তর্গত। ফলে প্রকৃতি ঘেরা এই অঞ্চলের উষ্ণতা ও আদ্রতা পর্যটক বান্ধব। ষড়ঋতুর এই দেশে প্রধানত তিনটি ঋতুই মৃুলতঃ জোরালোভাবে পরিলক্ষিত হয়। বর্ষা মৌসুম সাধারণত মে হতে অক্টোবর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এ সময় শতকরা ৯০ ভাগ বৃষ্টিপাত হয়। তবে শীতকাল স্থায়ী হয় নভেম্বর হতে ফেব্রুয়ারি। এ মৌসুম অত্যন্ত শুষ্ক ও শীতল, কখনও সামান্য বৃষ্টি হয়। ফলে পর্যটকদের সর্ব্বো” চাপ থাকে । বর্তমান সরকারের উন্নয়নের আরেকটি দর্পণ সৃষ্টি হয়েছে এই এলাকায়। এটি হল রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ।

এদিকে, মার্চ ও এপ্রিল মাসকে গ্রীষ্ম বা প্রাক-বর্ষাকাল বলে গণ্য হয়। এ সময় বাতাস খুবই উত্তপ্ত হয় এবং বাতাসে জলীয় বাস্প খুব কম থাকে। মাঝে মাঝে ‘কাল বৈশাখী’ বা শিলাবৃষ্টি হয়ে থাকে। এখানে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে নিম্ন তাপমাত্রা পরিলক্ষিত হয় যার গড় প্রায় ২০৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এপ্রিল মাসে চরম উষ্ণতা ৩৬৫ ডিগ্রি এবং জানুয়ারি মাসে চরম শীতলতা ১০২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে পারে।

কাপ্তাই-রাঙামাটি সংযোগ জলপথ

পর্যটন নগরী হিসেবে খ্যাত এই রাঙ্গামাটির উত্তরে রয়েছে ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম, দক্ষিণে বান্দরবান, পূর্বে মিজোরাম ও পশ্চিমে চট্রগ্রাম ও খাগড়াছড়ি। এ জেলা আয়তনের দিক থেকে দেশের সর্ববৃহৎ জেলা। দেশের এক মাত্র রিক্সা বিহীন শহর রাঙ্গামাটি। হ্রদ পরিবেষ্টিত হওয়ার কারণে পর্যটন শহর এলাকা হিসেবে বিশ্ব সমাদৃত। এ জেলায় চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, মুরং, বোম, খুমি, খেয়াং, চাক্, পাংখোয়া, লুসাই, সুজেসাওতাল, রাখাইন সর্বোপরি বাঙ্গালীসহ ১৪টি জনগোষ্ঠি বসবাস করে।
রাঙ্গামাটি আবহাওয়া দফতর সূত্রে জানা গেছে, অক্ষ রেখার ২২ ডিগ্রী- ২৭ ফারহেনাইট ও ২৩ ডিগ্রী- ৪৪ ফারহেনাইট উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১ ডিগ্রী- ৫৬ ফারহেনাইট ও ৯২ডিগ্রী- ৩৩ ফারহেনাইট পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে এই শহরের অবস্থান হওয়ায় শীতকালে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নেমে আসে। যেখানে অতি বৃষ্টি যেমন আছে তেমনি অতি শীতও অনুভূত হয়।

রাঙ্গামাটির ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান- এই তিন পার্বত্য অঞ্চলকে নিয়ে একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা সৃষ্টির পূর্বের নাম ছিল কার্পাস মহল (১৭১৫-১৮৬০ )। পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা থেকে ১৯৮১ সালে বান্দরবান এবং ১৯৮৩ সালে খাগড়াছড়ি পৃথক জেলা সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার মূল অংশ রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা হিসাবে থেকে যায়। প্রথাগত রাজস্ব আদায় ব্যবস্থায় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় রয়েছে চাকমা সার্কেল চীফ। চাক্মা রাজাই চাক্মা সার্কেল চীফ।
বৃটিশ আমল থেকে পার্বত্য অঞ্চলে বিদ্যমান বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামোর পাশাপাশি বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময় তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। পার্বত্য চুক্তির আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় নামে একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্যাবলী সমন্বয় সাধনের জন্য রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন এর জন্য ১টি টাস্ফফোর্সও গঠন করা হয়।

রাঙামাটির রওনার উদ্যেশে কাপ্তাইস্থ সরকারি ঘাটে পর্যটক শূন্য নৌকা

এছাড়াও পার্বত্য এলাকায় ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং হাট-বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য বাজার ফান্ড নামক প্রতিষ্ঠানও গঠন করা হয়েছে। রাঙ্গামাটি পার্বত্যজেলায় জাতীয় সংসদের ১টি আসনও রয়েছে। রাঙ্গামাটির ১০টি উপজেলার ২টি পৌরসভায় ইউনিয়নের সংখ্যা ৫০টি। আইনশৃঙ্খলা নিযন্ত্রনে ১২টি থানা রয়েছে। এরমধ্যে জনবহুল এলাকায় পড়েছে কাপ্তাই উপজেলায় কাপ্তাই ও চন্দ্রঘোনা থানা এবং বাঘাইছড়ি উপজেলায় বাঘাইছড়ি ও সাজেক থানা। ১৩৪৭টি গ্রামে লোকসংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ। এরমধ্যে নারী প্রায় ৩ লাখ ও পুরুষ সাড়ে ৩ লাখ।

কাপ্তাই লেককে ঘিরে রয়েছে দেশের একমাত্র পানি বিদ্যুত কেন্দ্রের ইতিহাস রয়েছে। ৭২৫ বর্গকিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে লেক ছাড়াও উচু-নীচু পর্বত শ্রেণী পরিবেষ্টিত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা। পাহাড়গুলি সংকীর্ণ উপত্যকায় ভরপুর এবং হালকা বন ও লতায় ভরা। পার্বত্য চট্টগ্রামের আয়তন ৫ হাজার ৯৩ বর্গমাইল বা ১৩ হাজার ১২৮ বর্গকিলোমিটার। এ জেলার উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম, দক্ষিণে বান্দরবান, পূর্বে মিজোরাম ও পশ্চিমে চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি।

রাঙামাটি ঝুঁলন্ত সেতুর ঘাটে অপেক্ষমান নৌকা পর্যটকের আশায়

এ জেলার প্রধান নদী কর্ণফুলী। এ নদী ভারতের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে রাঙ্গামাটি উত্তর-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে ঠেগা নদীর মোহনা হয়ে এ অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। কর্ণফুলীর উপনদীগুলো হলো- বড়হরিণা, সলক, রাইনখ্যং কাচালং, চেঙ্গী, ঠেগা, ও কাপ্তাই।এ উপনদীগুলো বষাকালে যথেষ্ট খরস্রোত থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতাসহ পানির পরিমান প্রায় থাকেনা।

বাংলাধারা/এফএস/এআর

আরও পড়ুন