১৩ জুলাই ২০২৪

কর্ণফুলীতে কলেজ ও সিডিএ’র খেলার মাঠে পশুর হাট

কর্ণফুলীতে

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেক এলাকার সিডিএ কর্ণফুলী আবাসিক প্রকল্পের খেলার মাঠ ও কর্ণফুলী আবদুল জলিল চৌধুরী কলেজ মাঠে কোরবানির পশুর হাট বসেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে মইজ্জ্যারটেক পশুর হাটের ইজারাদার সেলিম উদ্দিন আহমদ ও কলেজ বাজার পশুর হাটের ইজারাদার জকির আহমদ মামুন দাবি করেছেন, তাঁরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কতৃপক্ষ (সিডিএ) এর অনুমতি পেয়েছেন।

কিন্তু খেলার মাঠে পশুর হাট বসানোর অনুমতি নিয়ে নানা সন্দেহ পোষণ করেছেন ক্রীড়া সংগঠকরা। কেননা, কয়েক দিন আগেও এই দুই প্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠে খেলায় মেতে উঠতো এলাকার শিশু-কিশোররা। এখন মাঠ জুড়ে হাটের ক্ষতচিহ্ন বসবে তাঁতে ব্যথিত শিশু কিশোররা। প্রায় সব জায়গায় গরুর খুঁটির গর্ত। পড়ে আছে ইটের ভাঙা টুকরো আর বাঁশের খুঁটি।

এছাড়াও কর্ণফুলী আবদুল জলিল চৌধুরী কলেজ মাঠেও কোরবানির পশুর হাট বসানোর প্রস্তুতি শেষ। তবে প্রশাসনের অনুমতির বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত করেননি। অন্যদিকে, প্রভাব বিস্তার করে এ মাঠে হাট বসানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এরই মধ্যে কলেজ মাঠে কোরবানির পশুর হাট বসাতে খুঁটি পুঁতে প্রস্তুত করে রেখেছেন ইজারাদার প্রতিষ্ঠান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাট বসানোর বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে মাটি খুঁড়ে বাঁশের খুঁটি পুঁতে সারিবদ্ধভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে গরু-মহিষ বাঁধার স্থান। সেখানে কাজ করছেন ইজারাদারের শ্রমিকেরা। তবে অন্য সূত্র বলছে, পশুর বর্জ্যে এবং খোঁড়াখুঁড়িতে খেলার মাঠের বিষয়ে অনেক আগেই দফারফা হয়ে গেছে।

হাট প্রস্তুত করার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা জানান, দৈনিক মজুরিতে মাঠে কাজ করছেন। হাট কর্তৃপক্ষ কলেজ মাঠে তাঁদের বাঁশ পুঁতে খুঁটি দিয়ে হাট প্রস্তুত করতে বলেছে। তবে প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কিনা, সেটা তাঁরা জানেন না।

কলেজ অধ্যক্ষ মো. জসীম উদ্দিন জানিয়েছেন ভিন্ন কথা কিন্তু কলেজ কতৃপক্ষের গভর্নিং বডির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, তাঁদের না জানিয়ে খেলার মাঠে হাট বসিয়েছেন ইজারাদার।

আর শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কলেজ কর্তৃপক্ষ গত দুই বছর কোন পশুরহাট বসতে দেয়নি। এবার কি কারণে বা কাদের অবহেলায় খেলার মাঠে হাট বসানো হচ্ছে তাঁরাও জানে না। তবে এতে মাঠটি খেলাধুলার অনুপযোগী হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন। কারণ পশুর হাটের পরে মাঠে একটি ক্ষত রেখে যাবে তাতে সন্দেহ নেই।

কর্ণফুলী মইজ্জ্যারটেক এলাকার মো. জুয়েল বলেন, গত দুই বছর কলেজ বাজার মাঠ ও সিডিএ’র আবাসিক খেলার মাঠে গরু ছাগলের হাট বসানো হয়নি। কিন্তু এবারে আবার হাট বসানো হয়েছে। হাটে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা বেচাকেনা হয়। এই হাট থেকে প্রতিবছর রাজস্ব আয় করে উপজেলা পরিষদ কিংবা প্রশাসন। কিন্তু হাটের উন্নয়নের বিষয়ে কারো কোনো নজর নেই।

অথচ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় বিভাগ থেকে জারি করা সরকারি হাট বাজারের ইজারা পদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা ও আয় বন্টন বিষয়ক নীতিমালা অনুযায়ি, হাট ইজারার শতকরা ১৫ টাকা সংশ্লিষ্ট হাটের রক্ষাণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কাজে খরচ করার কথা।

এ ছাড়া ইজারার শতকরা ৫ টাকা হাটটি যে ইউনিয়নে অবস্থিত সে ইউনিয়ন পরিষদকে অতিরিক্ত হিসাবে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। সেক্ষেত্রে চরলক্ষ্যা ও শিকলবাহা ইউনিয়ন পরিষদ কোন অর্থ পান কিনা নিশ্চিত করা যায়নি।

স্থানীয়রা জানান, কর্ণফুলীর ৩০ জন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়িরা এবারের হাট ইজারা নিয়েছেন। তাঁদের মধ্য থেকে নামেমাত্র দুজনকে ইজারায় অংশ গ্রহণ করিয়েছেন।

কিন্তু নির্দিষ্ট বাজার ইজারা পেলেও হাট কর্তৃপক্ষ অনুমতির তোয়াক্কা না করে সিডিএ আবাসিকের খেলার মাঠ ও কলেজ মাঠে হাট সম্প্রসারিত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

খেলার মাঠে গরু নিয়ে বসা ব্যাপারী ঝিনাইদহের সাঈয়েদ বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর মইজ্জ্যারটেক পশুর হাটে গরু নিয়ে আসি। এটি খেলার মাঠ কি না নির্ধারিত বাজার? বৈধ না অবৈধ হাট? এসবের কিছুই আমরা জানি না। তবে আমরা মাঠে নেই। মহাসড়কের পাশে গরু বেঁধেছি।’

যদিও ২০১৭ সালে খেলার মাঠ, পার্ক, রাস্তার ওপর পশুর হাট না বসাতে নির্দেশনা দিয়েছিলো সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। কিন্তু তা মানছেন ইজারাদারেরা। উপজেলার অধিকাংশ পশুর হাটও ছড়িয়ে পড়েছে খেলার মাঠে, প্রধান সড়কে এবং অলিগলিতে।

কলেজ বাজার খেলার মাঠে হাট বসানোর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে জকির আহমেদ মামুন বলেন, ‘অনুমতি নিয়েই এ জে চৌধুরী কলেজ মাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। হাট শেষে মাঠ আগের মতো পরিষ্কার করে দেওয়া হবে। যদি আরও সংস্কার এর প্রয়োজন হয়, আমাদের পক্ষ থেকে করে দেওয়া হবে।’

এ প্রসঙ্গে মইজ্জ্যারটেক পশুর হাটের ইজারাদার সেলিম উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কলেজ বাজার মাঠে ও সিডিএ মাঠে পশুর হাট বসাতে আমরা অনুমতি পাইছি। আপনি ডিসি অফিসে পাবেন। আমি এখন দুরে আছি কাগজ দিতে পারছি না। কালকে উপজেলায় মিটিং আছে। তখন পাবেন।’

কর্ণফুলী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বাবুল চন্দ্র নাথ বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোন মাঠে হাট বসানো যাবে না। উপজেলার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তা দেওয়া আছে। ওই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। প্রতিষ্ঠান প্রধান অধ্যক্ষ বলতে পারবেন তাঁরা কিভাবে তা অনুমতি দিলেন। ডিপার্টমেন্টাল অফিসার হিসেবে আমি কিছুই জানি না। আমার কাছে কেউ জানতেও চায়নি।’

উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সেলিম হক বলেন, ‘কর্ণফুলীতে এমনি ভালো খেলার মাঠ নেই। এ দুটো মাঠ সংস্কার করার জন্য উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গার আবেদন করে মাঠ ঠিক করেছেন। গতবার উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে আমরা অনুরোধ করলে উনি ইজারাদারদের খেলার মাঠে পশুর হাট বসাতে দেয়নি। কারণ এখান রাজস্ব আয় করে উপজেলা। তাঁদের উচিত হচ্ছে ইজারাদারদের সাথে পরামর্শ করা। মাঠের ক্ষতি হলে এটার দায় কে নেবে।’

কর্ণফুলী আবদুল জলিল চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ মো. জসীম উদ্দিন বলেন, ‘গত দুই বছর আগে কলেজ ও স্কুল থেকে পৃথক আকারে দরখাস্ত দিয়েছিলাম আমাদের কলেজ মাঠে গরুর বাজার না বসাতে। সে অনুযায়ী সাবেক ইউএনও তা ব্যবস্থা নেওয়ায় মাঠে পশুর হাট বসেনি। এবার ইজারাদারেরা ডিসি অফিসে আবেদন করায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবেদনের আলোকে আমাদের কাছে তথ্য চেয়েছেন আমরা বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছি। কলেজ গভর্নিং বডির সদস্যদের নিয়ে আমরা মিটিং কল করে ফাইনাল সিদ্ধান্ত জানানোর কথা ছিলো। কিন্তু তাঁর আগেই দেখি মাঠে পশুর হাটের জন্য গর্ত করে সারিবদ্ধভাবে বাঁশ ফুঁতে ফেলেছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখার অন্য শিক্ষক জানিয়েছেন, ‘ফরিদ নামে এক ক্রীড়া সংগঠক কোন অনুমতি ছাড়াই কলেজ মাঠে পশুর হাট বসাতে বাঁশ ফেলেছে বলে আমরা জেনেছি। অথচ এই ফরিদ কলেজ মাঠে পশুর হাট না বসানোর জন্য গত দুই বছর অনেক যুদ্ধ করেছেন। অনেকের সাথে ঝগড়াও করেছেন। এখন সেই ফরিদ নিজেই পশুর হাট বসাতে বাঁশ পেলেছেন। তা সত্যিই দুঃখজনক।’

এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. ফরিদ বলেন, ‘ইউএনও মহোদয় কে অবগত করে কলেজ মাঠে কাজ করছি। আমি আশ্বস্ত করতেছি, পশুর হাট শেষে পূর্বের মতো মাঠের অবস্থা ফিরিয়ে দেবো। যেহেতু মাঠটি নিয়ে অতীতে আমি অনেক কষ্ট করেছি। মাঠের ক্ষতি হতে দেব না।’

কর্ণফুলী আবদুল জলিল চৌধুরী কলেজ গভর্নিং বডির এক সদস্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে জানান, জেলা বা উপজেলা প্রশাসন হাটের অনুমতি দেন ইজারাদারদের। প্রশাসন কিংবা উপজেলা পরিষদ মইজ্জ্যারটেক হাটে এবারে ২ কোটি ৫৩ লাখ ১৬ হাজার ৫৪০ টাকা ও কলেজ বাজার হাটে ২১ লাখ ৮৩ হাজার ৭৭৫ টাকার উপরে রাজস্ব আদায় করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো ইজারা প্রদানকারী কতৃপক্ষ রাজস্ব নিয়ে কোথায় হাট বসাবে তারও একটি সুব্যবস্থা করে দেবেন। নিশ্চয় এটাই নিয়ম। কিন্তু সিডিএ আবাসিকের মাঠ ও এ জে চৌধুরী স্কুল-কলেজ মাঠ ব্যবহার করবে তা অনুচিত। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা ও ক্লাস চলাকালীন সময়ে মাঠে পশু তোলা একটি সেলুকাস কাজ!

সিডিএ মাঠ সংলগ্ন চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সোলায়মান তালুকদার বলেন, ‘খেলার মাঠে তো গরুর বাজার না বসানোর কথা। কারণ খেলার মাঠটি আমাদের ছেলেদের জন্য খুব দরকার। আগের উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুরোধে পরিষদ থেকে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে মাঠ সংস্কার করা হয়েছে। আমি যতটুকু জেনেছি মাঠে গরুর বাজার বসায়নি। মাঠের পাশে অফিস করেছে।’

কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাসুমা জান্নাত বলেন, ‘ইজারাদারদের আবদনের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পশুর হাটের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। আমি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানসহ জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। অন্যদিকে, কলেজ মাঠের বিষয়ে জেলা প্রশাসন অনুমতি দেবেন। আর মইজ্জ্যারটেক আবাসিকের খেলার মাঠের বিষয়ে সিডিএ অনুমতি দেবেন।’

ইউএনও’র কাছে জানতে চাওয়া হয় এখন পর্যন্ত তিনি কোন অনুমতিপত্র হাতে পেয়েছেন কিনা, উত্তরে তিনি জানালেন, ‘কোন ধরনের অনুমতির কাগজ তাঁর কাছে নেই।’

সিডিএ মাঠের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কতৃপক্ষ এর উপ-সচিব অমল গুহ বলেন, ‘মইজ্জ্যারটেক আবাসিকের খেলার মাঠে গরু ছাগলের হাট বসানোর বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আবাসিক প্রকল্পের পিডি মনজুর হাসান সাহেব এ বিষয়ে বলতে পারবেন।’

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নির্বাহী প্রকৌশলী (নির্মাণ বিভাগ-৩) মো. মনজুর হাসান এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে কোন অনুমতি নেয়নি। এটা উপজেলা প্রশাসন জানবে।’

এ বিষয়ে মইজ্জ্যারটেক আবাসিক খেলার মাঠ ও কলেজ মাঠে পশুর হাট বসানোর প্রস্তুতির ভিডিও ও ছবি পাঠানো হয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের সরকারি মুঠোফোনে। তবে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।

আরও পড়ুন