১৫ জুলাই ২০২৪

লেংগ্যা খাল পুনঃখনন কোন কাজে আসেনি

কর্ণফুলীতে খাল খননে পাউবির ২ কোটি টাকা জলে

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে দুই বছর আগে জলাবদ্ধতা নিরসন, ফসলের জন্য পানির সমস্যার সমাধান, মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্য শিকলবাহা-চরলক্ষ্যার লেংগ্যা খালের (লেইঙ্গা খাল) খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুনঃখনন কোন কাজে আসেনি। পরিকল্পনার অভাবে খাল খননে পানি উন্নয়নের ২ কোটি টাকা জলে গেছে।

জানা যায়, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে খনন কাজ শেষও করে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কিন্তু খননের দুই বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পশু খামারের বর্জ্য আর অপ্রয়োজনীয় জলজ উদ্ভিদ আবর্জনায় পলি পড়ে খাল ভরাট হয়ে গেছে। খননের দুই বছরেই কাজের কোন চিহ্ন নেই।

সরেজমিনে দেখে গেছে, খালের জিরো পয়েন্ট ছাড়া এখন কোথাও খালের কোনো অস্তিত্ব নেই। নেই পানি প্রবাহের চিহ্নও। কেউ বলে না দিলে দেখেও বোঝার উপায় নেই সেখানে একটি খাল আছে। বেশির ভাগ অংশ সবুজ ঘাসে ভরে গেছে। পড়েছে খালে টনকে টন পশু খামারের বর্জ্য।

অথচ দুই বছর আগে এ প্রকল্পে ২ কোটি ৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দের পুন:খনন করেন মেসার্স গরীবে নেওয়াজ এন্টারপ্রাইজ নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২১ সালের ২৭ জুন কাজ শুরু করলেও কার্যাদেশ অনুযায়ি কাজ সমাপ্তির বাহিরে ২০২২ সালে এসে কাজ শেষ করে। এতে কর্ণফুলী উপজেলাধীন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকার শিকলবাহা-চৌমুহনী-নয়াহাট- লেইঙ্গাখাল পুনঃখননন কাজ হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ পাউবোর অপরিকল্পিত খননে এমন অবস্থা হয়েছে। খালে জল আনার টাকা জলে ফেলা হয়েছে। দুই কোটি টাকা খরচ করে খননেও টেকানো যায়নি লেংগ্যা খালকে। খালের প্রায় ৯ কিলোমিটার খনন কাজে সে সময় অনিয়মের অভিযোগও উঠেছিলো। যদিও প্রাচীনতম এই খাল খনন হয় প্রায় ৪১ বছর পরে।

পাউবো সূত্রে আরো জানা গেছে, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) খাল পুনঃখননের ডেলটা প্ল্যানের আওতায় খালটি পুনর্জীবিত ও ফসলি জমির চাষাবাদে কৃষকদের উপকারের উদ্দেশে খনন করেন। কিন্তু এরই মধ্যে পুর্বের অবস্থায় রুপ নিয়েছে লেংগ্যা খাল।

কার্যাদেশ অনুযায়ী খালটির জিরো পয়েন্ট থেকে উপরিভাগে স্থানভেদে কোথাও ২৫ থেকে ৩৫ ও ৪০ ফুট প্রশস্ত আর তলদেশ কোথাও স্থানভেদে ১০ থেকে ১২ ফুট প্রশস্ত এবং খালের গভীরতা ১০ ফুট করে খনন করার কথা। কিন্তু তা সঠিক ভাবে হয়নি।

কথা হয় খাল পাড়ের বাসিন্দা শাহ আলমের সাথে। ষাটোর্ধ মুরুব্বির চোখের সামনেই ঘটেছে লেংগ্যা খালের বাঁচা-মরা। তিনি বলেন, এক সময় এই খাল এতটাই বড় ছিল যে বড় নৌকা চলাচল করতো। পণ্য আনা নেওয়া করতাম। ৯০ সালের দিকে খালটি ভরাট হতে শুরু করে। এক সময় পুরোপুরি ভরাট হয়ে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় খালের পানি প্রবাহও। ভরাট হওয়া খাল পানি উন্নয়ন বোর্ড খনন করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে সেটি ভরাট হয়ে আগের অবস্থায় পরিণত হয়েছে।

জানকে চাইলে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (পটিয়া কর্ণফুলীর দায়িত্ব) অনুপম দাশ বলেন, ‘খালটি খননের কিছুদিনের মধ্যেই আবারো ভরাট হয়ে গেছে। খাল পাড়ে থাকা খামারগুলোর ভারি বর্জ্য খালে ফেলা হচ্ছে। ওদের অন্য জায়গায় ফেলারও পরিস্থিতি নেই। যদি গোবর থেকে গ্যাস তৈরির কোন প্ল্যান থাকতো। তবে খামারিরা গোবর বিক্রি করতে পারতো। সে ভাবে কোন প্রজেক্ট কেউ নিচ্ছে না। আবার পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন দিয়েও আমরা চেষ্টা করেছি খামারিদের পরিবেশ রক্ষা করতে। কিন্তু তাও সম্ভব হচ্ছে না। তবে খালের ময়লা এখন পরিষ্কার করা হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্ণফুলী উপজেলার দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক উর্মি সরকার বলেন, ‘আমাকে কর্ণফুলীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কিছুদিন আগে। আমি বিষয়টি খোঁজ খবর নিয়ে খাল পরিদর্শন করে পরিবেশের কি কি ক্ষতি হচ্ছে তা দেখে ব্যবস্থা নিতে চেষ্টা করব।’

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ জানান, ‘কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা, চরলক্ষ্যা, চরপাথরঘাটা ও জুলধা ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবহমান প্রায় ১২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের লেংগ্যা-শিকলবাহা-চৌমুহনী নয়াহাট খালটি কর্ণফুলী নদীর বাম তীরে ফিশারী ঘাটের নয়াহাট জামে মসজিদের কাছ থেকে উৎপত্তি হয়ে ডায়মন্ড সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এলাকায় পুনরায় কর্ণফুলী নদীতে পতিত হয়েছে।’

‘খালের কিছু অংশ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এছাড়া খালের নিকটবর্তী স্থানে অবস্থিত বিভিন্ন শিল্প কারখানা, বাজার এবং ডেইরি ফার্মের বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলে দেওয়ায় খালের তলদেশ আবর্জনায় ভরাট হয়ে আশপাশের এলাকায় পানিপ্রবাহে বাধাগ্রস্ত হওয়াসহ পরিবেশেরও মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ১৯৯৬-৯৭ সালে এই খালে মালবাহী নৌ-যান চলাচল করতো। আমরা খনন করে দিয়েছিলাম কিন্তু আবারো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে খালের ময়লা আবর্জনা সরানো হচ্ছে।’

আরও পড়ুন