২৫ এপ্রিল ২০২৪

নব সূর্যোদয়ে সব অন্ধকার কেটে যাক

সম্পাদকীয় »

বাংলা নববর্ষ সুর-সঙ্গীতের, মেলা-মিলনের, আনন্দ ও উৎসবের, সাহস ও সঙ্কল্পের প্রেরণা জোগায়। চিরায়ত ঐতিহ্যের ধারায় বাঙালি বরণ করবে নতুন বছর ১৪৩০। বৈশাখ মানে গ্রীষ্ম ঋতুর শুরু। উজ্জ্বল রৌদ্রময় দিন। তেমনি আবার কালবৈশাখীর বজ্র-বিদ্যুতসহ ভয়াল রূপ। জীবন সংগ্রামের দীক্ষা লাভের নানা রূপের সংমিশ্রণ নববর্ষের সূচনালগ্ন। এই সূচনালগ্নে নতুন ভাবনা-চিন্তায় কতটা এগিয়েছি আমরা তারও মূল্যায়ন করা দরকার। নতুন বছরে পদার্পণের অর্থই হলো নতুনের মুখোমুখি হওয়া। সামনের দিনগুলোকে নব উদ্যমে বিনির্মাণের তাগিদ। আমাদের উদ্যম, আমাদের অধ্যবসায় সব নিয়োজিত হোক জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে। উৎসবের আনন্দ নতুন সঙ্কল্পে দীক্ষিত জাতির ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার নতুন শক্তির প্রেরণা হোক।

পহেলা বৈশাখ মূলত উদযাপিত হতো ব্যবসায়ীদের হালখাতা, শুভেচ্ছা বিনিময়, গ্রামীণমেলা এসবের মাধ্যমে। যদিও বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা সব দাপ্তরিক ক্ষেত্রে ইংরেজি তারিখই প্রাধান্য পাচ্ছে, তবুও এ দেশের প্রকৃতি, জলবায়ু, ঋতুবৈচিত্র্য ও কৃষিকে বুঝতে আমাদের ফিরে যেতে হয় বাংলা সনের কাছে। তাই দেখা যায়, এ যুগে এসে বাংলা বর্ষবরণ উৎসবের বৈচিত্র্য ও ব্যাপ্তি দুই-ই বেড়েছে।

জাতীয় ঐক্য ও সংহতির ভিত্তি রচনা এবং ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির বিকাশে এসবের গুরুত্ব অপরিসীম। আসলে সাম্প্রদায়িক চেতনাধারী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চোখ রাঙানির মুখে নগরকেন্দ্রিক বাংলা নববর্ষ উদযাপন একটা লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছে। এ লড়াই আজো চলছে। অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে নানা সময়ে নানা বিতর্কের জন্ম দেয়া হয়েছে। পাকিস্তান আমলে বলা হতো- বাংলা নববর্ষ হিন্দুদের উৎসব, মুসলমানের জন্য নাজায়েজ। সেই ধারা অনুযায়ী প্রতিক্রিয়াশীল মহল এখনো সক্রিয় আবহমান বাঙালিত্ব ধ্বংস করে ধর্মের ধুয়া তুলে কায়েমি স্বার্থে কূপম-ূক ব্যবস্থা কায়েমে।

অশুভ শক্তি রমনার বটমূলে ছায়ানটের ১৪০৮ সনের বর্ষবরণ উৎসবে ঘটিয়েছে নারকীয় বোমা হামলা। তাতে ঝরে গিয়েছিল কয়েকটি তাজা প্রাণ। সেই শোকাবহ ঘটনার স্মৃতি ভোলার নয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে মৌলবাদী গোষ্ঠী। আমরা দেখেছি, বাঙালি সংস্কৃতির, তার উৎসবের উদার সম্প্রীতি-চেতনাকে বিনষ্ট করার জন্য বারবার আঘাত হানা হলেও বাঙালির উৎসবে মানুষের মহাসম্মিলনকে রুদ্ধ করা যায়নি, যাবেও না।

আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, সব অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে জাগ্রত সংস্কৃতিই আমাদের শক্তি জোগাবে। শত দুর্বিপাকে, শত বিপর্যয়ে মানুষের এই হার না মানা সংগ্রাম বৈশাখেরই রুদ্র চেতনার বহিঃপ্রকাশ যেন। এই চেতনার কাছে তাবৎ উৎপীড়ক, অশুভ শক্তির পরাজয় ঘটবেই। এই পহেলা বৈশাখে মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে আমাদের নতুন শপথে দাঁড়াতে হবে।

আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, সংস্কৃতির শক্তিতে, মানবিকতার শক্তিতে। একটি সুখী, সমৃদ্ধি ও সম্প্রীতিময় সমাজ আমাদের লক্ষ্য। ১৪৩০ বঙ্গাব্দের আজকের এই সূর্যোদয় সব অন্ধকার কেটে আমাদের নিয়ে যাক এমন এক সকালের দিকে যেখানে থাকবে না প্রতিক্রিয়াশীলতার অন্ধকার, অশিক্ষার অন্ধকার, দারিদ্র্য আর অনটনের অন্ধকার। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও বৈশাখের চেতনায় উজ্জীবিত হোক সবাই। নতুন ভবিষ্যত গড়ার প্রত্যয়ে সবাই হোক উদীপ্ত। সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা।

আরও পড়ুন