২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

নামি-দামি সব ব্র্যান্ডেই ভেজাল, মানুষ খাবে কী?

তারেক মাহমুদ »

বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় নিম্নমানের প্রমাণিত হওয়ায় দেশের ছোট-বড় ব্র্যান্ডের ৫২ টি পণ্য নিষিদ্ধ করেছে দেশের হাইকোর্ট। পণ্য নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় জনমনে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। রমজানের শুরু থেকেই একের পর এক ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বেরিয়ে আসছে আরও শত শত ভেজাল পণ্যের কাহিনী। জনমনে প্রশ্ন জেগেছে, সব পণ্যই যদি ভেজাল হয়, তাহলে মানুষ খাবে কী?

নগরীর বড় সব ব্র্যান্ডের খাদ্য-পণ্যের দোকানে অস্তিত্ব মিলছে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর পণ্যের। গত ১৫ দিনে ওয়েল ফুড, মিঠাই, বনফুল, ফ্লেভারস, ফুলকলি, মধুবন, জামান রেস্টুরেন্ট, আফগান রেস্টুরেন্ট, বাসমতি রেস্টুরেন্টের মত বড় বড় সব ব্র্যান্ডের পণ্যে মিলেছে ভেজালের অস্তিত্ব।

বৃহস্পতিবার (৯ মে) চাক্তাই এলাকার মোল্লা অ্যান্ড কোম্পানির কারখানায় অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় নিম্নমানের ক্যারাওয়ে বীজ জিরার সঙ্গে মিশিয়ে প্যাকেটিং করার দায়ে কারখানা মালিককে ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা জরিমানা ও কারখানা সিলগালা করা হয়।

শনিবার (১১ মে) নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য তৈরি এবং পচা সিরকায় মিষ্টি সংরক্ষণের দায়ে বনফুলকে চার লাখ টাকা জরিমানা করেছে এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র‌্যাব) ভ্রাম্যমাণ আদালত।

শনিবার (১১ মে) নগরীর হামজারমাগ এলাকায় মধুবনের কেক-বিস্কুট তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র‌্যাব) ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় পচা ডিম ও বাসি পামওয়েল দিয়ে কেক ও বিস্কুট তৈরির প্রমাণ পাওয়ায় কারখানা মালিককে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

রবিবার (১২ মে) নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য তৈরি এবং সংরক্ষণ করার কারণে নগরীর রাহাত্তারপুল এলাকার ফুলকলি কারখানায় অভিযান চালিয়ে ফুলকলি ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ৭ লাখ টাকা জরিমানা করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ভ্রাম্যমাণ আদালত।

রবিবার (১২ মে) হাইড্রোজ ব্যবহার করে জিলাপি তৈরির অপরাধে নগরের চকবাজারের ফ্লেভারস প্রিমিয়াম সুইটস অ্যান্ড বেকার্সকে ১ লাখ টাকা জ‌রিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

সোমবার (১৩ মে) অস্বাস্থ্যকর উপায়ে ইফতার তৈরি, ছাপানো নিউজপ্রিন্টে খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ বিস্কুট সংরক্ষণের জন্য নগরের ২ নম্বর গেট এলাকার আফগান রেস্টুরেন্টকে ৮০ হাজার টাকা জ‌রিমানা ক‌রেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

বুধবার (১৫ মে) হাই‌ড্রোজ ব্যবহার করে জিলাপি তৈরি, ছাপানো নিউজপ্রিন্টের ওপর ইফতারি রাখা, পোকাসহ বেগুনি তৈ‌রির অপরা‌ধে বহাদ্দারহাট এলাকার হো‌টেল জামান অ্যান্ড বিরিয়ানি হাউস‌কে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

সোমবার (২০ মে) ঈদ উপলক্ষে নিম্নমানের কারখানায় নোংরা পরিবেশে তৈরি সেমাই নিজেদের মোড়কে বাজারজাত করার চেষ্টা করছে ফুলকলি। চাক্তাই খালের পাড়ে তাহের সেমাই ফ্যাক্টরী নামে একটি সেমাই তৈরির কারখানায় জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালালে ফুলকলির এমন জালিয়াতি ধরা পড়ে। এ অপরাধে ফুলকলিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

বৃহস্পতিবার (৯ মে) হাটহাজারীর বুড়িশ্চর এলাকায় ৩ রুমের ছোট একটি কারখানায় লাল সার, ডালডা, পামওয়েল, ফ্লেভার, ক্ষতিকর রংসহ নানা উপকরণ দিয়ে ভেজাল ঘি তৈরি করছিলেন কারিগর আব্দুল আওয়াল। এসব ঘি পাইকারি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বাঘা বাড়িসহ ১০টি ব্রান্ডের স্টিকার লাগিয়ে বাজারে সরবরাহ করেন তিনি। এ অপরাধে কারখানা মালিককে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করে উপজেলা প্রশাসন।

শুক্রবার (১০ মে) হাটহাজারীতে কাপড়ের রং দিয়ে জিলাপি, বেগুনি ও পেঁয়াজু তৈরির সময় এক বিক্রেতাকে হাতেনাতে ধরা হয়। এ অপরাধে দোকানীকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

শুক্রবার (১৭ মে) হাটহাজারীর জগন্নাথ বাড়ি এলাকার একটি কারখানা থেকে প্রায় ১০০ কেজি ভেজাল ও নিম্নমানের চা-মসলা জব্দ করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। সিলন চা, মির্জাপুর চা, রাঁধুনি সরিষার তেল, রাঁধুনি হালিম মিক্সড, রাঁধুনি পায়েস মিক্সড, বিদেশি ব্ল্যাক টাইগারসহ অন্তত ২০টি ব্রান্ডের নকল পণ্য বানানো হচ্ছিলো এ কারখানায়।

এছাড়াও, প্রতি লিটার দুধে ৭০০ গ্রাম পানি, বাকি ৩০০ গ্রাম চক পাউডার আর ময়দা ব্যবহার করা হচ্ছে। ফিটকিরি, চিনি, বার্নিশ কালার, ময়দা আর রঙ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে আখের গুড়। পুরনো রক্ত মিশিয়ে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ মাংস। রাইফেন-১৫ দিয়ে পাকানো হচ্ছে পেঁপে, কলাসহ নানা মৌসুমী ফল।

রাসায়নিকে প্রক্রিয়াজাত চাল দিয়েই ভাজা হচ্ছে মুড়ি। চিড়াকে সাদা আর রঙিন করতে ব্যবহৃত হচ্ছে ক্ষতিকর রঙ আর কেমিক্যাল। ইফতারসামগ্রী বানানো হচ্ছে পোড়া মবিলে। নকল বাটার দিয়ে তৈরি হয় ফুলকলির পণ্য। পচা ডিম দিয়ে কেক-বিস্কুট তৈরি হয় মধুবনে। পরোটা, বেগুনি ফোলাতে ব্যবহৃত হচ্ছে ক্ষতিকর এমোনিয়া। মুরগিকে খাওয়ানো হচ্ছে এন্টিবায়োটিক। তাই মানুষের শরীরে ওষুধ আর কাজ করছে না। মেয়াদোত্তীর্ণ তেল নিয়ে নতুন বোতলে ঢোকায় পুষ্টি।

খাবারের স্বাদ বাড়াতে যে মসলা ব্যবহৃত হয় তা এখন স্বাদবর্ধকের পরিবর্তে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিক মুনাফার জন্য এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী মসলায় কাপড়ের বিষাক্ত রং, দুর্গন্ধযুক্ত পটকা মরিচের গুঁড়া (নিম্নমানের মরিচ), ধানের তুষ, ইট ও কাঠের গুঁড়া, মোটর ডাল ও সুজি মেশাচ্ছেন। পচাঁ দুধ, পাম অয়েল, সয়াবিন, প্রাণীজ চর্বি, আলুর মন্ড, ইত্যাদির সাথে কৃত্রিম রং ও গন্ধ মিশিয়ে ভেজাল ঘি তৈরি করা হয়।

নামি-দামি দেশি-বিদেশী ব্র্যান্ডের মোড়কে ভেজাল খাদ্য প্যাকেটজাত করে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। আর ক্রেতারা এসব ভেজালপণ্য কিনে শুধু ঠকছেনই না, গুরুতর অসুস্থও হয়ে পড়ছেন। কিন্তু খাদ্যপণ্যে ভেজালের মহোৎসব কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না।

বিএসটিআই সম্প্রতি ২৭ ধরনের ৪০৬টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৩১৩টি পণ্যের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৫২টি নিম্নমানের ও ভেজাল পণ্য রয়েছে। প্রাণ, ড্যানিশ, পুষ্টি, ফ্রেশ, ওয়েল ফুড, মিঠাই, বনলতা, মধুবন, এসিআই, বাঘাবাড়ীর স্পেশাল ঘি, ডলফিন, মোল্লা, দাদা‘র মত নামকরা সব ব্র্যান্ডের পণ্যের মধ্যেই পাওয়া গেছে ভেজাল।

বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ভেজাল মসলায় মেশানো ক্ষতিকর খাদ্যদ্রব্য ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী।

কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, দেশের ভোক্তারা এখন অনেক বেশি সচেতন ও সোচ্চার। এ ধারাকে আরো জোরদার করার জন্য সর্বস্তরের ভোক্তাদের আরো বেশি সংগঠিত করতে হবে। যে কোনো পণ্য ও সেবা নেয়ার আগে দাম ও মান সম্পর্কে যাচাই করে কিনতে হবে। একতরফাভাবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা পরিহার করে ভোক্তা সংগঠনগুলোর প্রতি দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাধারা/এফএস/এমআর/টিএম/বি

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ