২৫ এপ্রিল ২০২৪

‘নিন্দুকেরাই আমার কারাতের অনুপ্রেরণা’

২৮ তম ন্যাশনাল কারাতে চ্যাম্পয়নশিপে চট্টগ্রামের ছেলে নাইমুর রহমান একের পর এক প্রতিপক্ষকে হারিয়ে অর্জন করেছেন স্বর্ণপদক। তিনি +৬৭ ওজন ক্যাটাগরি ও উন্মুক্ত ওজন ক্যাটাগরিতে স্বর্ণপদক অর্জন করে উজ্জ্বল করেছেন চট্টগ্রামের নাম। ডবল ক্যাটাগরিতে স্বর্ণ পদক অর্জনের ঘটনা চট্টগ্রামের ইতিহাসে খুবই বিরল। ১৯৮৪ সালের পর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নাইমুর রহমান ডবল ক্যাটাগরিতে স্বর্ণ পদক অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। নাইমুর রহমান তার সফলতার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন বাংলাধারার সাথে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন বাংলাধারার রিপোর্টার হাসান সৈকত…

হাসান সৈকত: আপনি জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন। এই অর্জন নিয়ে আপনার অনুভূতি কী?
নাইমুর রহমান: হ্যাঁ, অবশ্যই স্বর্ণপদক অর্জন আমার জন্য দারুণ এক অনুভূতি। আমি বেশ আনন্দিত৷ তবে আমি শুধু জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতে চাইনা। আমি চাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করতে। দেশকে আরো ভালো কিছু উপহার দিতে চাই।

হাসান সৈকত: আপনি কত বছর কারাতের সাথে সম্পৃক্ত?
নাইমুর রহমান: আমার কারাতের শুরুটা ২০১৬ সাল থেকে। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থায় কারাতেতে ভর্তি হয়ে আমার কোচ তুলু উশ শামসের অধীনে কারাতের প্রশিক্ষণ শুরু করি। এত বছরের কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের পর আজ আমার এই অর্জন। আমার এই অর্জনের পেছনে আমার কারাতে কোচ তুলু উশ শামসের অবদান সবচাইতে বেশি। আমি আমার কোচের কাছে অনেক বেশি কৃতজ্ঞ। উনি না থাকলে হয়তো আমার এই অর্জন কখনোই সম্ভব হতো না।

হাসান সৈকত: বাংলাদেশের মানুষ কারাতে সম্পর্কে খুব বেশি জানেনা। আপনি তো অনেক বছর কারাতের সাথে সম্পৃক্ত। কারাতে নিয়ে কিছু যদি বলতেন যাতে করে মানুষ কারাতে সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা লাভ করতে পারে।
নাইমুর রহমান: একটা সময় ছিল যখন কারাতে বললেই মারামারিকে বুঝতো। তবে কারাতে শুধুই মারামারি নয়, এটি একটি আত্মরক্ষার কৌশল। সময়ের সাথে সাথে এর প্রক্ষাপট অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে কারাতে একটি আন্তর্জাতিক খেলা। বাংলাদেশেও দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে কারাতেকে অলিম্পিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

হাসান সৈকত: আপনি কারাতেতে আসার মূল কারণ কি? ক্রিকেট-ফুটবলসহ আরো তো অনেক খেলাই ছিল, এতসব খেলা বাদ দিয়ে আপনি কারাতেকে কেন বেছে নিয়েছেন?
নাইমুর রহমান: সবার মতো আমার ও প্রথম কারণটা এক। ছোট বেলায় অনেক চাইনিজ সিনেমা দেখেছি আর ওইসব সিনেমা দেখেই কারাতের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। এছাড়াও আরো একটা কারণ হলো নিজের আত্মরক্ষা, যেকোনো পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করতে পারার জন্য কারাতেতে ভর্তি হয়েছিলাম।

হাসান সৈকত: স্বর্ণপদক অজর্নের পেছনে আপনার অনুপ্রেরণা কে?
নাইমুর রহমান: কথাটি শুনতে হাস্যকর মনে হলেও, যারা আমার নিন্দা করে তাদের কাছ থেকেই আমি অনুপ্রেরণা পাই। আমি মনে করি আমার এই অর্জনের পেছনে তাদের অবদান অনেক বেশি। তাদের খোঁচা দেওয়া কথার জন্যই আমি আজ এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি। আমার আশেপাশে এমন অনেকেই আছে যারা সুযোগ পেলেই আমায় খোঁচা দিয়েছে। আমার মনে একটা জেদ ছিল, আমি ভাবতাম একদিন ভালো কিছু করে তাদের দেখিয়ে দিব। তাদের এই খোঁচা দেওয়া কথাই আমাকে কঠোরভাবে পরিশ্রম করতে বাধ্য করেছে। আর আমার পরিশ্রমের ফল আমার এই অর্জন।

হাসান সৈকত: স্বর্ণ পদক অর্জনের পাশাপাশি এতো বছরের কারাতে জীবনে আপনার আর কি কি অর্জন আছে?
নাইমুর রহমান: কারাতের অর্জন নিয়ে কথা বলতে গেলে বলার মতো অতোটা অর্জন নেই আমার। দেশের অভ্যন্তরীন বেশ কিছু টুর্নামেন্টে স্বর্ণপদক আছে। তবে বলার মতো আমার আরেকটি অর্জন হলো ৫ম সাউথ এশিয়ান গেমসে সিলভার মেডেল অর্থাৎ ২য় স্থান অর্জন। তখন কয়েক স্তরের বাছাই পর্বের পর আমি অনুর্ধ ২১ জাতীয় দলে সিলেক্ট হই। সকলের দোয়ায় সাউথ এশিয়ান গেমসে আমি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করি। তারপর তো এবার ২৮ তম ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক অর্জন করলাম।

২৮ তম ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে আমি +৬৭ ওজন ক্যাটাগরিতে স্বর্ণপদক অর্জন করি। এছাড়াও দলগত ফাইটেও আমি স্বর্ণ পদক অর্জন করি। একজন খেলোয়াড়ের দুইটা ক্যাটাগরিতে একসাথে স্বর্ণপদক অর্জন চট্টগ্রামের ইতিহাসে দ্বিতীয় বারের মতো ঘটেছে। ১৯৮৪ সালের পর এখন আবার আমি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।

হাসান সৈকত: এখন পর্যন্ত ছোট বড় সব মিলিয়ে আপনার মেডেলের সংখ্যা কত?
নাইমুর রহমান: কারাতে প্রশিক্ষণ শুরু করার পর থেকে প্রায় অনেক টুর্নামেন্ট খেলা হয়েছে। তবে প্রথম অবস্থায় ভালো কোনো রেজাল্ট আনতে না পারলেও বর্তমানে বেশ কিছু মেডেল জমা হয়েছে। প্রায় ২২ থেকে ২৪টা মেডেল থাকলেও গোল্ড মেডেলের পরিমাণ তার অর্ধেক।

হাসান সৈকত: কারাতে নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
নাইমুর রহমান: আমার পরিশ্রম আমাকে এতটুকু পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। সবে তো ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। তবে আমার লক্ষ্য অনেকদূর পর্যন্ত নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। আমার ইচ্ছা দেশের জন্য কিছু করবো। দেশকে অনেক বড় কিছু উপহার দিতে চাই। স্টেপ বাই স্টেপ, প্রথমে সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন এরপর ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে ভালো রেজাল্ট করে নিজের দেশের নাম উজ্জ্বল করবো।

হাসান সৈকত: একজন কারাতে খেলোয়াড় হিসেবে আপনার পরিবার থেকে কেমন সাপোর্ট পেয়েছেন আপনি?
নাইমুর রহমান: সত্যি বলতে একদমই সাপোর্ট পাইনি। কারণ তারা কারাতে সম্পর্কে বুঝতো না। তারা ভাবতো কারাতে শিখে তাদের ছেলে রাস্তায় গিয়ে মারামারি করবে। আমিতো কারাতেতে ভর্তি হওয়ার পর টানা কয়েক মাস লুকিয়ে লুকিয়ে কারাতে করেছি যাতে আমার পরিবার না জানতে পারে। কারণ তারা জানলে কখনোই আমায় কারাতে করতে দিতো না। তবে বর্তমানে এতোসব অর্জনের পর তাদের ধ্যান-ধারণার অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে।

হাসান সৈকত: বর্তমান প্রেক্ষাপটে কারাতেকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার কোনো সুযোগ আছে কিনা?
নাইমুর রহমান: বলা মুশকিল, সবাই করে উঠতে পারে না। তবে একটু কষ্ট করলে পেশা হিসেবে নেওয়া যাবে। যেমন বর্তমানে আমি বাংলাদেশ আর্মির সাথে এক বছরের কন্ট্রাক্ট সাইন করেছি। আগামী এক বছর তাদের হয়েই সব টুর্নামেন্ট খেলবো। এরপর যদি আমার পারফরম্যান্স ভালো থাকে তবে কন্ট্রাক্টের সময় আরো বাড়তে পারে।

হাসান সৈকত: নাইমুর আমাদেরকে সময় দেওয়ার বাংলাধারার পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।
নাইমুর রহমান: আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন