২২ মে ২০২৪

পবিত্র মিরাজুন্নবী (দ.) ও সালানা ওরছে গাউছুল আজম মাহফিলে লাখো মুসল্লির ঢল

গাউছুল আজম

‘প্রিয় রাসুল (দ.) এর হুবহু পদাঙ্ক অনুকরণ ও অনুসরণ করে যে সকল মনীষীগণ ইতিহাসে সমুজ্জ্বল তাদের মধ্যে খলিফায়ে রাসুল (দ.) হযরত গাউছুল আজম (রা.) চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আজীবন যিনি শরীয়তের উপর অটল-অবিচল ছিলেন, সুন্নাতে রাসুলের উপর সমস্ত কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। দু’চোখের অশ্রু ছিলো যাঁর জীবনের অলঙ্কার। আমানতদারীতায় এমন উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব ছিলেন শুধু মুসলিমরাই নয় অমুসলিমরাও আস্থা ও ভরসার প্রতীক হিসেবে উনার কাছে আসতেন। এবাদত ও রিয়াজতে ছিলেন অনন্য, প্রিয় রাসুল (দ.) ছিলেন উনার ধ্যানে জ্ঞানে সর্বত্র। নবীজিকে অনুসরণ ও ভালোবাসায় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছেন যে প্রিয় রাসুল (দ.) উনাকে ডেকে নিয়ে অলৌকিকভাবে বায়াতে রাসুল (দ.) প্রদান করে খলিফায়ে রাসুল (দ.) এর অনন্য মর্যাদা দান করেছেন। আল্লাহ ও রাসুলের প্রেমে এমন মহান জীবন গড়ে তোলেছেন বেছাল শরীফের সময় নবীজির হাত ধরে উনি হেসে হেসে গিয়েছেন আর কাঁদিয়ে গিয়েছেন সারা দুনিয়াকে। গরীব-দুঃখী বিপদগ্রস্থ যেকোন কারো জন্য তিনি ছিলেন ভালোবাসা ও মমতার পরম আশ্রয়স্থল। যাঁকে দেখলে মানুষ পেতো এবাদতের স্পৃহা, আল্লাহ ও নবীজির প্রতি গভীর অনুরাগ, হারাম-হালাল পৃথক করে চলার অনুপ্রেরণা, সর্বোপরি আখিরাতের ভাবনায় পথ চলার নিবিড় উপলব্ধি। এ মহান মনীষী পবিত্র মি’রাজুন্নবী (দ.) এর বরকতময় সময়ে নবীজির হাত ধরে মহান আল্লাহর সাক্ষাতে গিয়েছেন। উনার স্মরণে আয়োজিত ওরছে পাক এমনভাবে উদযাপিত হয় যেখানে শরীয়তের বিন্দুমাত্র লঙ্ঘন নেই, গতানুগতিক ওরছের আদলে কোনকিছু এখানে নেই। এখানে নেই গরু-মহিষ-ছাগল, টাকা-পয়সা, নজর-নেওয়াজ কোন কিছু আনার সংস্কৃতি। খতমে কুরআন, খতমে তাহলিল, খতমে বুখারী, নফল রোজা, নফল নামাজ, ফয়েজে কুরআন, মোরাকাবা, জিকিরে গাউছুল আজম মুর্শেদী, তাহাজ্জুদ, মিলাদ-কিয়াম আদায়ের কর্মসূচিতে এখলাসের সাথে উদযাপিত হয় সালানা ওরছে হযরত গাউছুল আজম (রা.)। যার ফলশ্রুতিতে বারবার এ মহান ওরছে পাক কবুলিয়্যতের অসংখ্য নজির দৃশ্যমান হয়েছে, মাশাআল্লাহ।’

বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) দিন-রাতব্যাপী চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদের গাউছুল আজম সিটিতে অনুষ্ঠিত কাগতিয়া দরবারের প্রতিষ্ঠাতা খলিলুল্লাহ, আওলাদে মোস্তফা, খলিফায়ে রাসূল, হযরত শায়খ ছৈয়্যদ গাউছুল আজম রাদ্বিয়াল্লাহু আন্হুর স্মরণে ৭১তম পবিত্র মিরাজুন্নবী (দঃ) উদযাপন ও সালানা ওরছে হযরত গাউছুল আজম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ঈছালে ছাওয়াব মাহফিলে এ মহামনীষীর একমাত্র খলিফা, হযরতুলহাজ্ব আল্লামা অধ্যক্ষ শায়খ ছৈয়্যদ মাননীয় মোর্শেদে আজম মাদ্দাজিল্লুহুল আলী প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।

পবিত্র মি’রাজুন্নবী (দ.) ও সালানা ওরছে হযরত গাউছুল আজম (রা.) উপলক্ষ্যে ঈছালে ছাওয়াব মাহফিল এর জন্য বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত ক্রোড়পত্রে বাণী প্রদান করেছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সালানা ওরছে হযরত গাউছুল আজম (রা.) এ সহযোগিতা করার জন্য সরকারের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহ দেশ জাতির উন্নতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য মোনাজাত করা হয়।

দিন-রাতব্যাপী গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে ছিল-বাদে নামাজে ফজর খতম শরীফ আদায় ও ঈছালে ছাওয়াব, মোরাকাবা ও খলিলুল্লাহ, আওলাদে মোস্তফা, খলিফায়ে রাসূল (দ.) হযরত শায়খ ছৈয়্যদ গাউছুল আজম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর এর ঈছালে ছাওয়াবের উদ্দেশ্যে ফাতেহা শরীফ পাঠ, মিলাদ-কিয়াম, মুনাজাত, খতমে কুরআন শরীফ, খতমে বুখারী শরীফ ও খতমে তাহলিল শরীফ। বাদে নামাজে জোহর পবিত্র মি’রাজুন্নবী (দ.) এর তাৎপর্য ও খলিলুল্লাহ, আওলাদে মোস্তফা, খলিফায়ে রাসূল (দ.) হযরত শায়খ ছৈয়্যদ গাউছুল আজম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর এর জীবনী শীর্ষক আলোচনা। বাদে নামাজে আসর তরিক্বতের বিশেষ পদ্ধতিতে ফয়েজে কুরআন প্রদানের মাধ্যমে নূরে কুরআন বিতরণ। বাদে নামাজে মাগরিব ফাতেহা শরীফ আদায় ও ঈছালে ছাওয়াব, মোরাকাবা, সিনা-ব-সিনা তাওয়াজ্জুহ এর মাধ্যমে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাতেনি নূর বিতরণ। কাবলে নামাজে এশা জিকিরে গাউছুল আজম মোর্শেদী। বাদে নামাজে এশা মাননীয় মোর্শেদে আজম মাদ্দাজিল্লুহুল আলী ছাহেব এর নূরানি তাক্বরির মোবারক, মিলাদ-কিয়াম, মুনাজাত ও তরিক্বতের নির্দিষ্ট তারতীবে দরূদে মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদায় ও তাবাররুক বিতরণ । আখিরুল লাইল-নামাজে তাহাজ্জুদ, জিকরে জলী, দরূদ শরীফ ও মুনাজাত। (২৭ রজব, শুক্রবার) বাদে নামাজে ফজর মিলাদ-কিয়াম, আখেরী মুনাজাত, ফজরের খতম শরীফ আদায়, ঈছালে ছাওয়াব ও মোরাকাবা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও সিনেট সদস্য এবং সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবুল মনছুর এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সালানা ওরছে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংগঠনের মহাসচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ ফোরকান মিয়া, প্রফেসর ড. জালাল আহমদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব সরোয়ার কামাল, বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। সালানা ওরছে বক্তব্য রাখেন মাওলানা মুহাম্মদ শফিউল আলম, মাওলানা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন প্রমুখ।

এদিন ফজরের নামাজের পর খতম শরীফ, মোরাকাবা, ঈছালে ছাওয়াব, মিলাদ-কিয়াম ও মুনাজাতের পর খতমে কুরআন অদায়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ওরছের কর্মসূচি। পূর্ব ষোষিত তারিখ থেকে মহিলা, প্রবাসী, তরিক্বতপন্থী ও উপস্থিত মুসলিম জনতা সর্বমোট ২৪,৭৮৪ টি খতমে কোরআন ৮২১ টি খতমে তাহলীল এবং ১২৪ টি খতমে ইউনুচ আদায় করেন। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও কাগতিয়া দরবার থেকে পূর্বেই ঘোষতি হয়েছিল-ওরছে কারোর কাছ থেকে গরু-মহিষ-ছাগল, টাকা-পয়সা, নজর-নেওয়াজ ইত্যাদি নেওয়া হবে না, চলবে না শরীয়ত পরিপন্থী কোনো কার্যকলাপ, শুধু কোরআন-সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণে পালিত হবে এ মহামনীষীর সালানা ওরছ। অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে সুমধুর সুরে কুরআন তিলাওয়াত, তাহলিল ও নিম্নস্বরে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ জিকির এবং নবী (দ.)-এর শানে দরূদ পাঠ। এ যেন এক অভূতপূর্ব দৃশ্য, প্রশান্তিময় পরিবেশ। শুধু দেশের নয়, সপ্তাহজুড়ে বাংলাদেশে আসা বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশ-মধ্যপ্রাচ্য, সৌদিআরব, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী কাগতিয়া দরবারের শত শত অনুসারী এতে অংশ নেয়। বিদেশে অবস্থানরত এ মনীষীর অনুসারীরাও বাদ পড়েননি, তারাও এদিন স্বস্ব স্থানে বসে আর মহিলারা নিজেদের ঘরে বসে কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকেন।

সালানা ওরছে যোগদানের উদ্দেশ্যে সকাল থেকেই চট্টগ্রামের আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, সীতাকু-, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, পটিয়া ছাড়াও রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, মহেশখালী থেকে গাড়িযোগে কাগতিয়া দরবারের অসংখ্য অনুসারী, ভক্ত ও সাধারণ মুসলমানেরা সালানা ওরছে আসতে থাকে। চট্টগ্রাম ছাড়া ফেনী, কুমিল্লা, বি.বাড়িয়া, চাঁদপুর ও ঢাকা থেকেও কাগতিয়া দরবারের হাজার হাজার অনুসারী ও মুসলমানেরা উপস্থিত হন। সালানা ওরছে যোগদানের জন্য শুধু দেশের নয়, বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সৌদিআরবসহ ওমান, কাতার, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবী, শারজাহ্ হতেও কাগতিয়া দরবারের অনুসারীরা সপ্তাহখানেক পূর্ব থেকে বাংলাদেশে আসেতে থাকেন। সালানা ওরছ উপলক্ষ্যে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আলোকসজ্জিত করা হয় । মাগরিবের আগেই গাউছুল আজম কমপ্লেক্সের বিশাল ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে জনসমুদ্রে রূপ নেয়।

পরিশেষে মিলাদ কিয়াম, প্রিয় রাসুল (দ.) ও খলিফায়ে রাসুল হযরত শায়খ ছৈয়্যদ গাউছুল আজম (রা.)-এর খুলছিয়তের ওসিলায় দেশ জাতির কল্যাণ, উন্নয়ন, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি এবং হযরত গাউছুল আজম (রা.)-এর ফুয়ুজাত কামনা করে মোনাজাতের মাধ্যমে এখলাসময় এবাদতের মহাকর্মযজ্ঞ সমাপ্ত হয়।

আরও পড়ুন