২০ মে ২০২৪

বঙ্গবন্ধু : একজন গণমানুষের নেতা

আলমগীর মোহাম্মদ »

বাঙালি জাতির জনক ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি গণমানুষের নেতা। তিনি গণমানুষের মনোভাব বুঝতে পারতেন এবং স্বাধীনতাকামী বাঙালির স্পন্দন ধরতে পেরেছিলেন। মুক্তিকামী মানুষের আবেগ তিনি রপ্ত করতে পেরেছিলেন তাঁর সহজাত বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতায়। ছাত্রজীবন থেকেই নেতৃত্বের সহজাত বিকাশ ঘটে তাঁর ব্যক্তিত্বে।

স্বাধীনতার গুরুত্ব বুঝতে হলে বাংলাদেশের ইতিহাস পাঠ জরুরি। ১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে আমরা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আটকা পড়ি। দীর্ঘ ৫৬২ আমরা শাসিত হই ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, তুরস্ক ও আরব থেকে আসা মুসলমানদের হাতে। ১৭৫৭ সালে নবাব আলীবর্দি খানের দৌহিত্র সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতা চলে যায় ব্রিটিশ বেনিয়াদের হাতে। শংকর সাম্রাজ্যবাদী এক শক্তির হাত থেকে মুক্ত হয়ে আমরা আটকে পড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতে যারা সুকৌশলে শিক্ষা ও সভ্যতার প্রসারের নামে দুনিয়াজুড়ে সাম্রাজ্য স্থাপন করে চলেছিল শত শত বছর ধরে। প্রায় ১৯২ বছর ব্রিটিশ শাসনের পর দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে আমরা নামে মাত্র স্বাধীন হলেও আবারো তীব্রতর শোষণের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ি। ১২০৪, ১৭৫৭ ও ১৯৪৭ এই তিনটা অধ্যায় আমাদের বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তানি শাসকদের মনোভাব বুঝতে সময় লাগেনি বঙ্গবন্ধুর। ১৯৭২ সালে এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্ত হলো। সেইদিন বুঝতে বাকি রইলো না যে, বাংলাদেশকে উপনিবেশ করার জন্য, বাংলার মানুষকে শোষণ করে গোলামে পরিণত করার জন্য তথাকথিত স্বাধীনতা এসেছে। আমি প্রথম স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখি ৪৭-৪৮ সালে।’

‘বাঙালিত্ব’, ‘বাংলাভাষা’ আর বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু এক করে দেখতেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে বারবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার তিক্ত ইতিহাস মাথায় রেখে বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন সামনে এগোতে হলে এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে একাত্মতা প্রতিষ্ঠিত করা অপরিহার্য। সেই অপরিহার্যতা বিবেচনা করে তিনি বলেছিলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময়ও আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’

১৯৪৮ সালে পাকিস্তানিরা বাংলা ভাষার উপর আঘাত হানলে বাঙালি জাতি মুক্তি আন্দোলনের উজ্জীবিত হয়। ভাষার উপর আঘাতের প্রতিবাদে ১১ই মার্চ ১৯৫২ থেকে আন্দোলন ও প্রতিবাদ শুরু হয়। ১৯৫২ সালের আন্দোলন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস আমাদের জানা দরকার। আমি তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজে বন্দি অবস্থায় চিকিৎসাধীন। সেখানেই আমরা স্থির করি করি যে, আমাদের মাতৃভাষার ওপর ও আমাদের দেশের উপর যে আঘাত হয়েছে ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে তা মোকাবিলা করতে হবে। সেখানে গোপন বৈঠকে সব স্থির হয়।…কথা হয় ১৬ই ফেব্রুয়ারি আমি জেলের মধ্যে অনশন ধর্মঘট করব, আর ২১ তারিখে আন্দোলন শুরু হবে।’

এভাবে ধীরে ধীরে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের অগ্রনায়ক হয়ে উঠেন শেখ মুজিবুর রহমান। ৫৪এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৫৮’র সামরিক আইন মোকাবিলা, ’৬৬ এর ছয় দফা দাবি উত্থাপন এবং ’৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেন বাঙালি জাতির আবেগ ও উদ্যমে শাণ দেওয়ার অন্যতম হাতিয়ার। ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানে কার্যকর ভূমিকা পালন করায় ২৩ শে ফেব্রুয়ারি তাঁকে বাংগালীর অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে ‘বঙ্গবন্ধু’ আখ্যা দিয়ে বরণ করা হয়।

এ প্রসঙ্গে লণ্ডন অবজার্ভারের সাংবাদিক Cyril Dunn মন্তব্য করেনঃ
“In the thousand year history of Bengal, Sheikh Mujib is her only leader who has, in terms of blood, race, language, culture and birth, been a full blooded Bengali. His physical stature was immense. His voice was redolent of thunder. His charisma worked magic on people. The courage and charm that flowed from his tongue made him a unique superman in these times.”

সাইরিল ডান যথাযথ মন্তব্য করেছেন তিনি আমাদের সুপারম্যান। অস্তিত্ববাদী দার্শনিক ফ্রেডরিখ নীতসের কথিত সেই সুপারম্যান যার আবির্ভাব হয়েছিল মুক্তিকামী অথচ মাঝিবিহীন একটা জাতিকে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ায় উদ্বুদ্ধ করতে এবং নেতৃত্ব দিতে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংগালি জাতির ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। ২৫ শে মার্চ কালরাত্রিতে আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানিদের অতর্কিতে হামলায় জাতি যখন দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল তখন তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিকামী জনতাকে সঠিক পথের দিশা দিতে পেরেছিলেন। ১৭৮৯ সালে সংঘটিত ফরাসী বিপ্লবের মূলমন্ত্র ছিল Liberty, Equality and Fraternity. ১৭৭৬ সালে ঘোষিত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার মূল মন্ত্র ছিল Life, Liberty and the Pursuit of happiness. বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার।

স্বাধীনতা পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের ১০ তারিখ দেশে ফিরে দেশ গঠনের কাজে মনোযোগী হন তিনি । গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চারটি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে জাতিকে উপহার দেন একটি সুগঠিত সংবিধান। ১৯৭৫ সালের আজকের দিনে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি এ জাতির ভাগ্য উন্নয়নে নিরলস কাজ করে গেছিলেন।

বাঙালি জাতির শিল্পসাহিত্য, ইতিহাস জুড়ে বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। বাংলাদেশের সাহিত্যে বঙ্গবন্ধু অন্যতম এক অনুষঙ্গ। প্রায় ৫০ টির বেশি ছোটগল্প, অসংখ্য কবিতা, নাটক ও প্রবন্ধে তিনি মূল থিম হিসেবে স্থান পেয়েছেন। বাংলাদেশের প্রায় সকল খ্যাতিমান সাহিত্যিক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে, তাঁর নিঃস্বার্থ ত্যাগ নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক আহমদ ছফা বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ পরস্পর জমজ উপাদান । শারীরীক মৃত্যু তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে কখনো মুছে দিতে পারে না।’

বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক ও খ্যাতিমান গবেষক শামসুজ্জামান খান বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি ও স্থপতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সরদার ফজলুল করিম তাঁর বঙ্গবন্ধু প্রবন্ধে শেখ মুজিবের ভূয়সী প্রশংসা করেন তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও জনমুখীতার জন্যে।

১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পত্রিকা নিউজ উইক বঙ্গবন্ধুকে পোয়েট অব পলিটিক্স আখ্যায়িত করে লিখেছিল. “Mujib can attract a crowd of million people to his rallies and hold them spellbound with his great rolling waves of emotional rhetoric. He is a poet of politics. So his style may be just what was needed to unite all the classes and ideologies of the region.”

রেনেসা যুগের ইংরেজ লেখক ট্মাস ম্যুর তাঁর বিখ্যাত বই ইউটোপিয়া গ্রন্থে এমন একটি আদর্শ রাষ্ট্রের কথা তুলেছেন যা প্রতিষ্ঠিত করতে দুইটা শর্ত পূরণ জরুরি।

প্রথমত, কান্ডজ্ঞান। দ্বিতীয়, সাধারণ ন্যায় বিচার। বঙ্গবন্ধুও চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে থমাস ম্যুর এর কথিত ইউটোপিয়া হিসেবে গড়তে যার ভিত্তি হবে সাম্য, সামাজিক সুবিচার ও মানবিক মর্যাদা। তাঁর সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে আমাদের উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই তিন ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হওয়া।

জয় বাংলা।

লেখক : প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও শিক্ষক।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ