২৫ মে ২০২৪

বিভক্ত আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারা

মিরসরাই উপজেলা ভোটে সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা

মিরসরাই

দলীয় প্রতীক ছাড়াই হচ্ছে এবারের ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে মিরসরাইয়ে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী হওয়ায় বিভক্ত হয়ে পড়েছেন দলটির নেতাকর্মী। দলীয় প্রতীক না থাকায় আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন উপজেলা নির্বাচনে লড়ছেন। দলীয় নিষেধাজ্ঞা মানছে না প্রার্থীরা। যত ঘনিয়ে আসছে ততই কঠিন বাস্তবতার মুখে পরছে ক্ষমতাশীন দল আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। জেলা ও উপজেলার প্রভাবশালী নেতারা কোথাও প্রকাশ্যে, কোথাও অপ্রকাশ্যে পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে আসছেন। এতে করে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ছড়িয়ে পড়ছে তৃণমূল পর্যায়ে।

প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে মাঠে নেমে পড়েন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। তারা কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। প্রচারণায় পরস্পরকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দেওয়ায় উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। অপরদিকে এই নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থীদের একে অপরের বিগত দিনের মধুর সম্পর্কও এবার চরম বিরোধে রূপ নিয়েছে। এতে দলের নেতাকর্মী ও অনুসারীরাও আছেন বেশ অস্বস্তিতে। বিরোধের কারণে এখন কারো কারোরই মুখ দেখাদেখিও বন্ধ।

এদিকে আভাস পাওয়া গেছে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ও প্রার্থীদের সমর্থন করায় কপাল পুড়তে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার। সাংগঠনিক শাস্তির খড়গ নেমে আসছে তাদের ওপর। কেড়ে নেওয়া হতে পারে দলীয় পদ-পদবি। দলের ২ নম্বর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে খোদ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একজন প্রার্থীর পক্ষে প্রচার-প্রচারণা করছেন। দুই একদিনের মধ্যে সভাপতিও প্রচারণায় নামছেন আরেক প্রার্থীর পক্ষে।

এবারের উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পাঁচটি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সেগুলো হলো—
ক. কোন এমপি কোন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে পারবেন না বা কোন প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারবেন না। খ. আওয়ামী লীগের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক কোন প্রার্থীকে সমর্থন দিতে পারবেন না বা প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। গ. কোন প্রার্থী আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী বা এমপির মনোনীত প্রার্থী ইত্যাদি বলে প্রচারণা করতে পারবেন না। ঘ. একজন প্রার্থী অন্যজন প্রার্থীকে অরাজনৈতিক ভাষায় গালাগালি করা বা যাতে দলের বদনাম হয় এমন কোন কর্মকা- করতে পারবেন না। ঙ. কোন প্রার্থী দলীয় পরিচয় ব্যবহার করতে পারবেন না। অর্থাৎ তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি বা সহ- সভাপতি ইত্যাদি পরিচয় ব্যবহার ছাড়াই তাকে উপজেলা নির্বাচন করতে হবে। এবং উপজেলা নির্বাচনে কেউ যদি সহিংসতা করে তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

নির্বাচনে প্রার্থীদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতা। দলীয় প্রতীক না থাকায় এবং বিএনপিসহ অন্য দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেরাই নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, মিরসরাই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৫ জন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৪ জন ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩ জন প্রতিদ্বন্দিতা করছেন।

এরমধ্যে চেয়ারম্যান পদে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মোহাম্মদ আতাউর রহমান, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এনায়েত হোসেন নয়ন, চট্টগ্রাম উওর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ফেরদৌস হোসেন আরিফ, ইউকে আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ মোস্তফা ভুঁইয়া এবং উত্তম কুমার শর্মা। ভাইস চেয়ারম্যান পদে সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ সেলিম (শেখ সেলিম), সালাহ্ উদ্দিন আহম্মদ, মোহাম্মদ সাইফুল আলম। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান ইসমত আরা ফেন্সি, বিবি কুলছুমা চম্পা, উম্মে কুলসুম কলি।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানান, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা প্রতীক না দিয়ে উন্মুক্ত ঘোষণা করেছেন। অথচ উপজেলাতে চেয়ারম্যান প্রার্থীরা প্রায় সবাই দলের হওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন। তারা বিভক্ত হয়ে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। ফলে ওয়ার্ড-গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিভক্তি ছড়িয়ে পড়েছে। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।

তারা জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং জেলার শীর্ষ নেতারা একেক প্রার্থীর প্রতি মৌন সমর্থন দিয়েছেন। এতে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে, যা দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ নিয়ে দলের কর্মীদের অনেকে অস্বস্তিতে পড়েছেন।

নেতাকর্মীরা আরও জানান, তারা বিভক্ত হয়ে পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। ফলে মাঠ পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা চেয়ারম্যান প্রার্থীদের রোষানলে পড়েছেন। এরই অংশ হিসেবে নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন।

ভোটাররা বলছেন, দলীয় প্রতীক না থাকায় বেশিরভাগ প্রার্থীই পেশিশক্তি ও কালো টাকা ব্যবহার করে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে প্রচারের শেষ পর্যায়ে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে নির্বাচন উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হোক এমন প্রত্যাশা বেশির ভাগ ভোটারের।

উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী বলেন, এখন পর্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশেই মিরসরাই উপজেলায় প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। নির্বাচন ঘিরে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি, শঙ্কাও নেই। কারণ স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে সবার অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। দলও এ ব্যাপারে সজাগ রয়েছে।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, চেয়ারম্যান প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা ও পোস্টার বিগত নির্বাচনগুলোর তুলনায় কম। হাতেগোনা কয়েকটি ইউনিয়নে ছাড়া অধিকাংশ ইউনিয়নে নির্বাচনী ক্যাম্প বা কার্যালয় করেননি প্রার্থীরা।

স্থানীয় একজন মানবাধিকার কর্মী বলেন, নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা ও অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে অনেক আগেই। এ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ না থাকায় কোথাও উৎসবমুখর পরিবেশ নেই। এবারের নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণাও কম। সার্বিক পরিস্থিতিতে ভোটার উপস্থিতি কম হবে বলে তাঁর ধারণা।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এনায়েত হোসেন নয়ন বলেন, ‘উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আমি নির্বাচিত হলে মাহবুব উর রহমান রুহেল এমপির উন্নয়নের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে সততার সঙ্গে সহযোগী হিসেবে সমন্বয় করবো। এমপি মহোদয় মিরসরাইয়ের অর্থনীতি, পর্যটন, পরিবেশ, কৃষি জমির সঠিক ব্যবহার, কর্মসংস্থান, পরিকল্পিত আবাসনের প্রতি গুরুত্ব দিবেন। বৃহৎ পরিসরে মানুষের সেবাই হবে আমার মূল ব্রত।’

মিরসরাই উপজেলা পরিষদ সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও উওর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ফেরদৌস হোসেন আরিফ বলেন, ‘রাজনৈতিক যুদ্ধে দুই সহোদরকে হারিয়েছি। আমার জীবনে হারানোর আর কিছু নেই। যদি আমি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে জয় লাভ করি তাহলে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মহোদয় ও বর্তমান মিরসরাই এমপি মাহবুব রহমান রুহেলের হাতে হাত রেখে মিরসরাই উন্নয়ন কাজ করে যাবো মিরসরাইবাসীর জন্য।’

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান বলেন, ‘তৃণমূল নেতা-কর্মীরা আমার কাছে প্রত্যাশা করে। আমি নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশা পূরণে নির্বাচন করছি।’

চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বাংলাধারা ডটকমকে বলেন, ৮ মে উপজেলা নির্বাচন শতভাগ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সোমবার সার্কিট হাউজে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রার্থীসহ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। নির্বাচনে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ