২০ মে ২০২৪

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফেলনা সমন্বিত বর্জ্য থেকে উৎপাদন হচ্ছে বিদ্যুৎ

সমন্বিত বর্জ্য ব্যস্থাপনার যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। উৎপাদনে আসার মধ্য দিয়ে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে বিশ্বের তৃতীয় দেশ হিসেবে নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সমন্বিত বর্জ্য ব্যস্থাপনা প্রকল্পে প্রতিদিন সাড়ে ১১ টন বর্জ্য ব্যবহার হচ্ছে। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ৪০-৫০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ। পাশাপাশি পরিশোধিত হচ্ছে ১২শত লিটার ডিস্ট্রিল্ড ওয়াটার এবং ১৫০০ কেজি অ্যাস (ছাই)।

উখিয়া-টেকনাফের ৩৩ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ ধরনের প্রকল্প বাড়লে ক্যাম্প জুড়ে পরিবেশ দূষণ কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে দাবি পরিবেশবাদীদের।

এটি একটি পাইলট প্রকল্প উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী তুষার মোহন সাধু খাঁ বলেন, দেশে প্রথমবারের মতো প্রকল্পটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাস্তাবয়ন করা হচ্ছে। যাত্রার পরপরই সুফল পেয়েছি। দাতা সংস্থা এবং সরকারের উর্ধ্বতন মহলের সিদ্ধান্তে পরবর্তীতে এ প্রকল্প আরো বাড়ানোর প্রচেষ্টা নেয়া হবে।

তথ্য মতে, ২০১৭ সালে মিয়ানমার বাস্তুচ্যুত হয়ে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে প্রাণ রক্ষায় উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয় প্রায় সাড়ে এগারো লাখ রোহিঙ্গা। তাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে ধ্বংস করা হয় প্রায় আট হাজার হেক্টর বনভূমি। বিশাল এ জনগোষ্ঠির পয়: জৈব এবং ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ ও প্রতিবেশ। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশেপাশের এলাকায় পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষা করতে জরুরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (ওমনি প্রসেসর) বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় ২০২১ সালে ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। ২০২৩ সালের ১০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ক্যাম্পে অতিরিক্ত বর্জ্যের কারণে পরিবেশ ও প্রতিবেশ হুমকির মুখে পড়তে পারে এমন আশঙ্কায় ‘ওমনি প্রসেসর’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রস্তাব দেয়া হয়। এটি ছিলো আমার স্বপ্নের প্রকল্প। এখানে ক্যালোরোফিক ভ্যালু ও আর্দ্রতার বিষয়টিও জড়িত থাকায় শুরুতে প্লান্টটির ইনপুট ম্যাটেরিয়াল সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হয়। এই প্লান্টটি সম্পূর্নরূপে চালু রাখতে হলে প্রতিদিন ৬ টন ফেকাল স্লাজ, ৫ টন জৈব বর্জ্য ও ৫০০কেজি সিঙ্গেল লেয়ার প্লাষ্টিক প্রয়োজন। যেহেতু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কিছু বিধি নিষেধ রয়েছে সেহেতু প্রকল্পটিতে মাত্র-১০-১২ ঘন্টা কাজ করা সম্ভব। ৬০-৭০ কিলোওয়ার্ট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও এখন প্রতিদিন ৪০-৫০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ, এক হাজার থেকে ১২শত লিটার পানি এবং ১২শ’ থেকে ১৫শ’ কেজি অ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। যদি প্রকল্পটি পুরপুোরি চালু করা যায়, এখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাইরে সরবরাহ করার পাশাপাশি উৎপাদিত পানি বিক্রি করেই মাসিক ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। একই সাথে পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। বর্তমানে এখানে প্রায় এক লাখ মানুষ সরাসরি সম্পৃৃক্ত থেকে উপকার পাবেন বলে উল্লেখ করেন এ প্রকৌশলী।

ওমনি প্রসেসর প্রকল্পের প্লান্ট ইনচার্জ মোহাম্মদ আলীউল হক বলেন, এটি এমন একটি প্রযুক্তি- যেখানে মানুষের পয়:বর্জ্য এবং পচনশীল ও অপচনশীন ময়লা আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ, ডিসট্রিল্ড ওয়াটার এবং এ্যাশ উৎপাদন করা হয়। প্লাস্টিকের ক্ষতিকারক কার্বন ও গ্যাস পরিবেশসহ আমাদের সবার জন্য হুমকি। কিন্তু অমনি প্রসেসরের মাধ্যমে প্লাটিক থেকেই বিদ্যুত উৎপাদন হচ্ছে। তাও সম্পুর্ণ পরিবেশ বান্ধব প্রক্রিয়ায়।

তিনি বলেন, সেনেগাল এবং ভারতের পর তৃতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশে স্থাপন করা হয়েছে প্রকল্পটি। এই প্লান্টটি সম্পুর্ণ অটোমেটিক হওয়ায় ম্যান পাওয়ার খুবই কম লাগে। এছাড়া এই প্লান্টটি চালাতে বাহিরের কোনো বিদ্যুৎ লাগে না। উৎপাদিত বিদ্যুৎ থেকেই এটি চালানো হয়। এটিকে বানিজ্যিক ভাবেও ব্যবহার করা গেলে আয় করা সম্ভব বলে দাবি করেন তিনি।

কক্সবাজারের পরিবেশকর্মী ওয়াহিদ রুবেল বলেন, বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির ব্যবহৃত প্লাস্টিক থেকে শুরু করে জৈব, অজৈব, পয়: বর্জ্য পরিবেশ ও প্রতিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ প্রকল্পে প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য ব্যবহার হয় তা পরিবেশের ক্ষতি কিছুটা কমিয়ে আনা যাবে। তবে তাও যথেষ্ট নয়। এ ধরনের প্রকল্প আরও বাড়ানো যায় কিনা তা ভেবে দেখা দরকার।

প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম মুক্তাদির বলেন, উন্নয়ন সহযোগি সংস্থা এডিবির সহযোগিতায় জরুরি সহযোগিতা প্রকল্পের আওতায় ‘ওমনি প্রসেসর’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি সরাসরি পরিবেশ বান্ধব প্রকল্প। অন্য প্রকল্পে যে পরিমাণ জমির প্রয়োজন হয় ‘ওমনি প্রসেসর’ প্রয়োজনের চেয়ে ৭৫-৮০ শতাংশ কম জমিতে বাস্তাবায়ন করা সম্ভব। এখান থেকে যা নির্গত হবে তার প্রতিটি জিনিসই পরিবেশ বান্ধব। সমসাময়িক যতগুলো পদ্ধতি রয়েছে এটি একটি অগ্রসর পদ্ধতি। তবে চ্যালেঞ্জ হলো প্রকল্পটি অপারেশনের জন্য দক্ষ লোকবল। তারপরও আমরা এর ফলাফল দেখছি। এর আউটপুট, ইনপুট কি হচ্ছে, কি পরিমাণ পরিবেশে প্রভাব ফেলছে তা টেস্ট করা হচ্ছে। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে পরবর্তী প্রকল্পের জন্য প্রস্তাব করা হবে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ