২৫ এপ্রিল ২০২৪

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে

সম্পাদকীয় »

সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় পালন করা হয় মে দিবস। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষ দিনটি তাঁদের আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে অধিকার অর্জনের অনুপ্রেরণা ও উৎসবের দিন হিসেবে পালন করে থাকেন। দিবসটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃত।

১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকেরা দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে শিল্পাঞ্চল এলাকায় ধর্মঘট করেন। ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানোর প্রতিবাদ করেন। তাঁদের দাবির মধ্যে আরও ছিল শোভন কাজ ও ন্যায্য মজুরি। শিকাগোর হে মার্কেটের শ্রমিকেরা ১ মে থেকেই তাঁদের আন্দোলনকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেন। হে মার্কেটের শ্রমিকদের একঘেয়ে জীবন এবং কলকারখানার দুর্বিষহ পরিবেশে প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টা কাজ করা ছিল অত্যাচারের শামিল। সপ্তাহজুড়ে কাজ করে তাঁদের সামর্থ্য-শরীর ভেঙে পড়েছিল।

স্বল্প বেতনের বিনিময়ে তখনকার মালিক শ্রেণি তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন ও অবসরের সময়টুকুও কেড়ে নিয়েছিল। এ জন্য ‘দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে’ স্লোগান নিয়ে লক্ষাধিক মানুষ একত্র হন। শ্রমিকেরা সংগঠিত হয়ে ১ মে থেকে কাজ বন্ধ করে দেন এবং ঘোষণা করেন, তাঁদের দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে। বহুসংখ্যক শ্রমিক একসঙ্গে কর্মবিরতিতে অংশ নেওয়ায় মালিকেরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। ওই মালিক শ্রেণি শ্রমিকদের দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করিয়ে নিজেরা মুনাফা লাভ করত। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কথা ভাবত না। ৩ মে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সংঘর্ষে ৬ জন শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ৪ মে ওই হত্যাকা-ের প্রতিবাদে শ্রমিক-জনতা একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল করেন।

সেই মিছিল-সমাবেশে ৪ জন শ্রমিক নিহত হন। ওই ঘটনার পর পুলিশ ব্যাপক ধরপাকড় করে, আন্দোলনকারী অনেক শ্রমিকনেতাকে গ্রেপ্তার করে। প্রহসনের বিচারে অনেককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- ও ফাঁসি দেওয়া হয়। ১৮৮৬ সালের মে মাসের শ্রমিক হত্যাকা- এবং তার প্রতিবাদ সমাবেশ, শ্রমিকনেতাদের গ্রেপ্তার, প্রহসনের বিচারের নামে ফাঁসির ঘটনার বিরুদ্ধে পৃথিবীব্যাপী শ্রমিক শ্রেণি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
আন্দোলনকারীরা হত্যা-নির্যাতনের পরও তাঁদের দাবি নিয়ে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন। ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিস দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে পালনের প্রস্তাব করা হয় এবং ১৮৯১ সালের ২য় আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে ওই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।

শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের কাছে দিনটির রয়েছে আলাদা গুরুত্ব। মে দিবস শ্রমিক শ্রেণির ঐক্য এবং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি নিয়ে শ্রমজীবী মানুষকে উজ্জীবিত করার অনুপ্রেরণা জোগায়।

শ্রেণি বৈষম্যের বেড়াজালে যখন শ্রমিকদের জীবন বন্দী ছিল, তখন মে দিবস প্রতিষ্ঠার ফলে খুলে যায় তাঁদের সেই শৃঙ্খল। ঐতিহাসিক মে দিবসে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান আজও শ্রমিক শ্রেণিকে আগলে রেখেছে। যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে মে দিবসের সংগ্রামী চেতনা এখনো শ্রমজীবী মানুষের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

মে দিবস সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক, শ্রমজীবী মেহনতি মানুষই দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্যেই নিহিত দেশের ভবিষ্যৎ ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন। দেশ ও শিল্পের স্বার্থে শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুন