২০ মে ২০২৪

সপরিবারে জাতিরজনক হত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থতায় পুরস্কৃত প্রধান সেনাপতি

এ বি এম ফয়েজ উল্যাহ »

১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্টে, সপরিবারে জাতিরজনক হত্যা প্রতিরোধে অসফল, নির্বিকার সেনা প্রধানকে কোন বিচারের সম্মুখিন হতে হয়নি। অপরাধীর কাঠগড়ায়ও দাঁড়াতে হয়নি। উপরন্তু বিশ্বের ইতিহাসে অনন্য নজির সৃষ্টি করে নানাস্তরে তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন।

যেমন, তাঁর- (১) বীরোত্তম উপাধি বহাল, (২) নানান দেশে রাষ্ট্রদূতের চাকুরী?, (৩) সেক্টর কমান্ডার ফোরাম-প্রধান হওয়ার গৌরব অর্জন?, (৪) আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হওয়ার গৌরব? কি বিচিত্র এ’ বাংলাদেশ! সেলুকাশ!

১৫ই আগস্টে স্বাধীন সার্বভৌম আংলাদেশের প্রেসিডেন্টকে হত্যা বিশ্বের ইতিহাসে নির্দয়, নিষ্ঠুর, জগন্য ও ক্রুরতম ঘটনা। এ হত্যা শুধু দেশের প্রেসিডেন্ট নয়, তাঁর পরিবার, আত্মীয়বর্গকে এবং মুৃক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যা করেছে।

প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান শপথ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। তো সে দেশের প্রতিষ্ঠাতা, স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, প্রথম প্রেসিডেন্ট ও জাতিরজনকের প্রাণরক্ষার দায়িত্ব তো প্রতিরক্ষা তথা সেনাবাহিনীরই। সেনাবাহিনীর সেনাপতির উপরই বর্তায় এর প্রধানতম সব দায়িত্ব ও কর্তব্য। সেনাবাহিনীর গৌরব, ব্যর্থতার সুফল কুফলের পুরস্কার-তিরস্কার, জয়তিলক-কোর্টমার্শাল-মৃত্যুদণ্ড ভোগ করতে হয় তাই সেনাপ্রধানকেই। যুদ্ধে পরাজয়, ব্যর্থতার দায়বার নিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অনেক সেনানায়ক আত্মহত্যা করার নজির রয়েছে।

বাংলাদেশে হয়ে গেলো এক্কেবারে উল্টোটা। জাতিরজনকের জীবনরক্ষায় ব্যর্থতার দায়ভার থেকে তৎকালিন সেনাপ্রধান জেনারেল সফি উল্লাহ শুধু মুক্তিই পেলেন না, পুরস্কৃতও হলেন।

এই সে’ সেনাপ্রধান, যার কাছে জাতিরজনক শেখ মুজিবুর রহমান আকুতি জানিয়ে সাহায্য চেয়ে বলেছিলেন, ‌সফি উল্লাহ! তোমার ফোর্স আমার বাড়ি আক্রমণ করেছে। শেখ কামালকে হয়তো মেরেই ফেলেছে। তুমি তাড়াতাড়ি ফোর্স পাঠাও।

তখন বাংলাদেশের মহাসেনাপতির উত্তর ছিল, ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌স্যার, আপনি পিছন দিয়ে পালিয়ে যান/যাওয়ার চেষ্টা করুন।

জাতিরজনকের আবেদন, আকুতির পরও তৎকালীন সেনাপতি কি সৈন্য-সামন্ত নিয়ে বাংলাদেশের স্থপতিকে রক্ষা করতে ছুটে গিয়েছিলেন?

না, যান নি। ড্রেস পরে তিনি নিজ অফিসে এসে ঝাকিয়ে বসেছিলেন মাত্র। জাতিরজনক ও তাঁর পরিবারবর্গের রক্ষার্থে এক পাও অগ্রসর হননি। ওই চরমমুহূর্তে কর্তব্য ঠিক করার জন্য তিনি মিটিং ডেকেছিলেন। ততক্ষণে জাতিরজনকে সপরিবার হত্যা করে খুনিরা আনন্দ-উল্লাসে মেতেছে।

ডিভিশন ডিভিশন সৈন্য যার, শতাধিক সেনা অফিসার যার আজ্ঞাবহ, সেই তিনি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট তথা জাতির জনকের প্রাণরক্ষায় কিছুই করলেন না। সামান্যতম পদক্ষেপও নিলেন না।

এই ইচ্ছাকৃত নিষ্কৃয়তা, এই অবহেলা, জাতিরজন এবং তাঁর পরিবারের জীবন রক্ষাকরার ব্যর্থতার এই চরম অপরাধের দায়ভার তো সেনা প্রধানকেই বহন করতে হবে।

না। জাতিরজনকের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশের তৎকালীন সেনা প্রধানকে কোন দায় দায়-দায়িত্বে বহন করতে হয়নি। তিনি রাষ্ট্র, জনগণ আর জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর রক্তের সাথে চরম বেঈমানি করেছেন। খুনি-মোশতাকের হাতে বায়েত হয়ে তার আনুগত্য স্বীকার করেছেন। পুরস্কারস্বরূপ সেই থেকে ২২ বছর সন্মানের সহিত ৪/৫ সরকারের রাষ্ট্রদূত থেকেছেন।

তিনি বলে থাকেন, তাঁকে মোশতাক পদচ্যুত করেছেন। এটি ডাহা মিথ্যা। তাঁকে পদচ্যুত করা হয়নি। রাষ্টের এই চরম ক্রান্তিলগ্নে নীরব, নির্লিপ্ত থেকে হত্যাকারীদেরকে সহযোগিতার জন্য তাঁকে পুরস্কার স্বরূপ তাঁর সার্ভিস প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ট্রান্সফার করা হয়েছিল। সাথে সাথে রাষ্টদূত নিয়োগ করে বিদেশে পাঠানো হয়েছিলো। দীর্ঘকাল রাষ্ট্রদূতের কাজ শেষে দেশে এসে তিনি আওয়ামী লীগ আমলে ‘সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম’র সর্বোচ্চ পদ লাভ করেছেন।

অথচ রাষ্ট্রপ্রধান ও তাঁর পরিবারবর্গের জীবনরক্ষায় ব্যর্থতার জন্য এই সেনাপ্রধানের কোর্টমার্শালে মৃত্যুদণ্ড হওয়ার কথা ছিল। যদিও তিনি জাতিরজনক হত্যার বিষয়ে আগাম কিছু জানতেন না বলে টকশোতে এসে বহুবার বক্তব্য রেখেছেন। কখনও স্বীকার করেননি তাঁর দায়িত্বে অবহেলা ও নিষ্কৃয়তার কথা।

জেনারেল শফি উল্লাহ সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে স্থল, নৌ, বিমান, বিডিআর, পুলিশ, আনসার সব বাহিনীরই প্রধান ছিলেন। তাঁর নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা ছিল। এরা সবাই তাঁর কাছে দায়বদ্ধ। অথচ কোন গোয়েন্দাবাহিনী যদি হত্যার আগাম খবর না জানতেন, তাহলে সে জন্যও তিনি দায় এড়াতে পারেন না। তাহলে তিনি অথর্ব ও মেরুদণ্ডহীন হয়ে সেনাপ্রধানের পদ আঁকড়িয়ে থাকলেন কেন?

তিনি বারবার টিভি শোতে বলে যাচ্ছেন, কোন গোয়েন্দা রিপোর্ট তিনি পাননি। ঘটনা তা নয়। জাতিরজনকের অনুমতি নিয়ে তিনি নিজস্ব গোয়েন্দাবাহিনীও গঠন করেছিলেন। তাই তাঁর গোয়েন্দা বাহিনীও এই চক্রাস্তের খবর জানতেন না বলা তো চরম মিথ্যাচার! পুরা সেনাদল যা জানতেন, তা তাঁর গোয়েন্দাবাহিনীর না জানা, তাঁর না জানা ত্যের অপলাপ মাত্র। তখন প্রশ্ন আসবে, সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর এ না জানার মত কর্তব্যে চরম অবহেলার দায় কার? অবশ্যই সেনাবাহিনী প্রধানের।

তবে জাতি বিশ্বাস করে, জাতিরজনক হত্যা এক মিল-মিলাপ চক্রান্ত। সেনাপ্রধানের অধীনস্থ কর্মচারীরদের অনেকের শাস্তি হলেও সেনাপ্রধান কি এক যাদুর খেলায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেলেন। কোন আমলে না হোক, আওয়ামী লীগের শাসনামলে তার বিচার হওয়ার কথা ছিল। হয়নি।

আর তাঁর কথা যদি সত্যিও হয়, তাহলে তার দায়ভার নিয়ে তিনি (সেনাপ্রধান) তখন কি করতে পারতেন?

(১) প্রেসিডেন্টের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে মার্শার ল জারি করে ক্ষমতা হাতে নিতে পারতেন। তাহলে খুনি মোশতাকেরা ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারতো না।

(২) পারতেন নিজের কানপট্টিতে রিভলবার ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করতে। যেমন করে থাকে জাহাজের নাবিকেরা। পরাজিত সেনানায়কেরা।

(৩) তা না পারলে অন্তত, অপারগতার দায়মুক্তির জন্য সাথে সাথে পদত্যাগ করতে পারতেন। তিনি পদলোভে তাও করেন নি।

হায় বাংলাদেশ! খুনি মোশতাক কি বঙ্গবন্ধুকে নিজহাতে খুন করেছিলেন? করেননি। কিন্তু খুনিদের সাথে ষড়যন্ত্র করায়, সত্যকে চাপা দিয়ে, তাদের নিয়োজিত প্রেসিডেন্ট হওয়ায় আজ সেও খুনি, বেঈমান উপাধিত ধিকৃত। বেঁচে থাকলে তাঁর মৃত্যুড়ণ্ড হতো।

উপ-সেনা প্রধান জিয়াউর রহমানের চক্রান্তের কথা বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। বেঁচে থাকলে তাঁরও বিচার হতো। কিন্তু কি এক অজ্ঞাত কারণে সর্ব দায়িত্বে থাকা প্রধান সেনাপকি ধরাছোঁয়ার একদম বাইরে রয়ে গেলেন।

সেনাপ্রধান হিসেবে খুনিদের বিরুদ্ধে কোন শাস্তির ব্যবস্থা না করে, খুনি মোশতাকের আনুগত্য প্রকাশ করে ইনিও তো খুনির মিছিলে সামিল হলেন। বেঈমানের পদলেহি হলেন। অথচ পদ-পদবি-বীরোত্তোম উপাধি বহন করে আজও ইনি বহাল তবিয়তে আছেন।

সরকারীদলের সমর্থন, আনুকুল্য পাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের টিকেটে সাংসদও হয়েছেন। মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর সভায়, জাতীয় দিবসের সভায় পায়ের উপর পা তুলে প্রথম শারিতে বসছেন। টিভিতে এসে সিনা ঠুঁকে ঝাড়ি মেরে বলছেন, আমি মারা গেলে কি বঙ্গবন্ধু ফিরে আসতেন!

না, জাতিরজনক ফিরে আসতেন না। তবে সূর্যসেন, খুদিরাম, ভগত সিং, মির মদন, মোহনলালদের মত জাতীয়বীর হয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতেন। বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজের পরাজয় আর মৃত্যুদৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা মীরজাফরের মত বিশ্বাসঘাতক নামে ধিকৃত হতেন না।

হা, হতোষ্মি! হায় বাংলাদেশ! কখনো কি এই বিশ্বাসঘাতকতার বিচার হবে না? কি এক অজ্ঞাত কারণে আওয়ামী লীগ সরকার, এর নেতৃবৃন্দ, কথিত সুশীল বুদ্ধিজীবী সমাজ, ডান বাম দলের নেতারা নিঃচুপ। তৎকালীন সেনাপ্রধানকে বিচারের সমুক্ষিণ করা দরকার। এতে ষড়যন্ত্রের পুরা ইতিহাসে আসবে॥ জাতি এ বিচার দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ