২৫ এপ্রিল ২০২৪

সাইনবোর্ড ছাড়াই জনপ্রিয় ভাবির হোটেল

ভাবির হোটেল

চট্টগ্রামে চুঁইঝালে মুখরোচক গরুর মাংস রান্নায় প্রসিদ্ধ এক নাম ‘ ভাবির হোটেল ’। চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরের সীতাকুণ্ড উপজেলার টেকনো ফিলিং স্টেশনের বিপরীতে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাদদেশে অবস্থান বিখ্যাত ‘ ভাবির হোটেলের ‘। শহর থেকে লোকাল বাস কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ি যোগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সীতাকুন্ডের মনোরম পাহাড়ি দৃশ্য দেখতে দেখতে ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটেই দেখা মিলবে ভাবীর হোটেলের।

বিখ্যাত ভাবির হোটেলের জশ খ্যাতি চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লেও এ হোটেলটির নেই কোন সাইনবোর্ড। তবে হোটেলটির কোনো নামফলক না থাকলেও ভোজনরসিকরা মহাসড়কের পাশে পার্কিং করে রাখা কার, বাইকের সারি দেখে ঠিকই খুঁজে নেন ভাবির হোটেল।

সরেজমিনে সেই বিখ্যাত ভাবির হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, ভাবীর হোটেলে ভাবির জাদুকরী হাতে রান্না চুঁইঝাল মাংস দিয়ে ভাত খেতে ভোজন রসিকদের উপচে পড়া ভিড়৷ জরাজীর্ণ ছোট্ট হোটেলটিতে মানুষের এ ভীড় শুধু সপ্তাহের বিশেষ দিনে নয় বরং প্রতিদিনের চিত্র এটি। বসে খাওয়ার জায়গা না থাকায় কেউ দাঁড়িয়ে খাচ্ছেন আবার কেউবা অপেক্ষা করছেন বসে খাওয়ার জন্য। তবে দুপুরে ও রাতে ছাড়া অন্য সময়ে ভীড় তুলনামূলক কম থাকে বলে জানা গেছে।

হোটেলে ঢুকতেই দেখা মিললো ভাবির হোটেলের সেই বিখ্যাত ভাবির। হোটেলের সাথে সংযুক্ত রান্নাঘরে মাটির চুলায় নানা মসলায় কষিয়ে কষিয়ে ২০ কেজি গরুর মাংস রান্না করছেন তিনি। যে হাতের রান্না খেতে মানুষ বিভিন্ন জেলা- উপজেলা ও শহর থেকে ছুটে আসে সে ভাবিকে একনজর দেখার জন্য ভীড় জমাচ্ছেন উৎসুক জনতা। কেউ কেউ আবার ব্যস্ত ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণে।

কথা হয় ভাবী শরীফা বেগমের সাথে। রসিকতা করে বললেন দেবর আপ্যায়ন করাই আমার কাজ। এখানে সবাই এসে আগে আমাকে খোঁজ করে। আমার হাতের রান্না খেয়ে কেউ খারাপ বলেনা। এখানে এসে কেউ যদি খাবার না খেয়ে চলে যেতে হয় তখন আমার খারাপ লাগে৷

শরীফা বেগম বলেন, প্রতিদিন ২ মণের বেশি গরু মাংস রান্না হয়। পাশাপাশি খাসী ও মুরগী রান্না করেন তিনি। তবে গরুর চুঁইঝালের চাহিদাই বেশি। আমাদের দোকান ৬ বছর সুনামের সাথে চলতেছে। কোনো পোস্টার না সাইনবোর্ড লাগে না। এমনিতেই আমাদের দোকানে সবসময় ভীড় থাকে।

ক্যাশ কাউন্টারে তাকাতেই দেখা মিললো ভাবীর স্বামী ও হোটেলের স্বত্বাধিকারী প্রশান্ত কুমার ঘোষের। একদিকে ভোজন রসিকদের খাবার খাওয়ার পর বিল বুঝে নিচ্ছেন অন্যদিকে পাকা টমেটো সরিষার তেল দিয়ে মাখিয়ে সালাদ তৈরি করছেন।

প্রশান্ত কুমার ঘোষ বলেন, ২৪ ঘন্টাই আমাদের হোটেল খোলা থাকে। ঢাকা কুমিল্লা, ফেনী, থেকেও মানুষ এখানে খাবার খেতে আসে। প্রতিদিন সকালে ১০টা বাজলেই মাংস রান্না শুরু হয়ে যায়। এর আগে সকাল থেকেই চলে রান্নার প্রয়োজনীয় সকল প্রস্তুতি। ৮০-৮৫ কেজি মাংস ২০ কেজি করে কয়েক ধাপে রান্না হয়। মাংস শেষ না হওয়া পর্যন্ত হোটেল খোলা থাকে। প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ টাকা আমাদের বেচা-বিক্রি হয়।

জানা গেছে, ২০ বছর ধরে সংসার করছে সাতক্ষীরার ভাবী শরীফা বেগম ও প্রশান্ত কুমার ঘোষ। দুজন দুই ধর্মের হলেও প্রেম করে বিয়ে করেছেন ২০ বছর আগে। দুজন দুই ধর্ম মেনে সংসার করছেন তারা। পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের এই ব্যবসা।

প্রশান্ত কুমার ঘোষ বলেন, বিয়ের পর থেকেই সাতক্ষীরায় হোটেল ব্যবসা শুরু করি আমরা। সে পারদর্শী রান্নায়। আমি আগে চট্টগ্রাম ছিলাম পরে চিন্তা করলাম এখানে এই ব্যবসা কিভাবে শুরু করা যায়৷ অনেক খারাপ সময় গেছে। এখন আমাদের ব্যবসা ভালো চলছে।

কথা হয় ২ বছর ধরে হোটেলে খেতে আসা ভোজন রসিকদের খাবার পরিবেশনকারী মো.রাকিব হোসেনের সাথে। ১৮ হাজার টাকা বেতনে এই কাজ করছেন তিনি।

রাকিব হোসেন বলেন, শুধু মাংস না, এখানে প্রশান্ত বাবুর ভাইয়ের হাতে বানানো দইও খেতে আসে মানুষ। সারা রাতই খোলা থাকে এই দোকান। ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে খুব সহজেই এই দোকানে এক বেলা খাবার খেতে পারে ভোজনরসিকরা।

চট্টগ্রাম শহর থেকে বন্ধুদের নিয়ে খাবার খেতে আসা তরুণ ইমন বলেন, অনেক নাম শুনেছি। আজকে বাস্তবে খেতে আসলাম। মাটির চুলার রান্নার এমনিতেই আলাদা একটা স্বাদ আছে । সেইসাথে চুঁইঝাল দিয়ে গরুর মাংস গরম গরম ভালো ছিল।

আগে সাতক্ষীরায় দোকান থাকলেও এখন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ভাবির হোটেল নামে হোটেলটি চলছে ৬ বছর ধরে। বর্তমানে হোটেলটিতে অন্তত ১৫-১৬ জন কর্মচারী কাজ করছেন। ২০-২৫ জন ধারণক্ষমতার হোটেলটিতে প্রতিদিন হাজার হাজার ভোজনরসিকদের সমাগম এটিকে আরো জনপ্রিয় করে তুলছে।

আরও পড়ুন