২৫ এপ্রিল ২০২৪

চট্টগ্রাম বইমেলা

‘সিআরবি বইমেলা’র নিরাপত্তাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ!

পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের এক মহামিলন মেলায় রূপ নেয় অমর একুশে বইমেলা। এটি শুধু বইমেলা নয়, বাঙালির প্রাণের মেলাও। আত্মার সঙ্গে আত্মার যেমন সম্পর্ক, তেমনি বইয়ের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক। কিন্তু সেই প্রাণের বইমেলা অনিরাপদ হলে আতঙ্ক কাজ করবে পাঠকের মাঝে, এতে মেলাবিমুখ হবে অনেকে। বলছি, চট্টগ্রামের বইমেলার কথা।

গত শনিবার (বইমেলা শুরুর দ্বিতীয় দিন) রাত ৯টার দিকে চট্টগ্রামের সিআরবির শিরীষতলার বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার সময় সালাউদ্দিন নামে পার্ল পাবলিকেশন্সের এক বিক্রয় প্রতিনিধি ছিনতাইয়ের শিকার হন। মেলা চত্বর থেকে কিছুদূর এগোতেই কয়েকজন তার গতিরোধ করে মারধর করে এবং নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এরপর মেলায় যাওয়া বাদ দেন সালাউদ্দিন। পরদিন একই জায়গায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন এক পাঠক। মেলার শুরু থেকে এ পর্যন্ত একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনার শিকার হয়েছেন মেলা সংশ্লিষ্টরা। এসব ঘটনায় ক্রমশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন মেলার সঙ্গে জড়িত লোকজন। বেশকিছু গণমাধ্যমে এ ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে।

অথচ নিরাপত্তা বিষয়ে বইমেলা উদ্বোধনের দিন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় বলেন, ‘বইমেলার সঙ্গে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য জড়িত। বই মেলাকে সফল করতে মেলার নিরাপত্তার জন্য আমরা সচেষ্ট থাকব।’ এর আগে গত ৭ ফেব্রুয়ারি নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেছিলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য চারদিকে টিন দিয়ে ঘিরে দেওয়া হবে। সিসি ক্যামরা ও পুলিশ প্রহরা থাকবে। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব সিকিউরিটিসহ নিরাপত্তা বলয় থাকবে।’

এতো নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়ার পরও কিভাবে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটলো? তবে কি নিরাপত্তার ঘটাতি নাকি অবহেলা?— এমন প্রশ্ন জনমনে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে, ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায়-আতঙ্কে। এ সমাধান অবশ্যই খুঁজতে হবে এবং সংঘটিত এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। বইমেলার এই নতুন ভেন্যুর নিরাপত্তা ও এর প্রতি সবার আস্থা অর্জন করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে। অন্যথায় পাঠক, লেখক, প্রকাশক ও বইপ্রেমীদের হারাবে এই মেলা, প্রাণের এই মেলার প্রতি আমাদের যে টান তা ধীরে ধীরে হারাতে বসবে!

চট্টগ্রামের বইমেলা কি উদ্বাস্তু!
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণজুড়ে এই নির্দিষ্ট জায়গাতেই হচ্ছে বহু বছর ধরে এই অমর একুশের বইমেলা। কিন্তু বন্দরনগরী চট্টগ্রামে অমর একুশের বইমেলা করার জন্য এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। আগে যাও ছিল তাও কেড়ে নেয়া হয়েছে। বইমেলা যেন অনেকটা উদ্বাস্তু হয়ে গেছে চট্টগ্রামে। শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মুসলিম ইনস্টিটিউট চত্বরে। তারপর চট্টগ্রামের আউটার স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়াম সংলগ্ন খোলা চত্বর। কিন্তু এসব জায়গা থেকে উচ্ছেদ হতে হতে এখন বইমেলা নিজেই উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছে। বারবার ভেন্যু পরিবর্তনের ফলে হতাশা প্রকাশ করছেন চট্টগ্রামবাসী।

বইমেলা উদ্বোধেনের আগের দিন ভেন্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অনাগ্রহ ও হাতাশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক ড. আনোয়ারা আলম। তিনি লিখেছেন, ‘সিআরবিতে এবারের চট্টগ্রামের বইমেলা। মন টানছে না। গতবছরেও কতো আনন্দের সাথে বইমেলায় সময় কাটিয়েছি!’

শুধু ড. আনোয়ারা আলমই নন; প্রকাশক, লেখক, সাহিত্যানুরাগী ও সাংবাদিকরাও ভেন্যুকে যথাযথ মনে করেননি। এমনকি প্রকাশকরা বই বিক্রি কম হবে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন।

মূলত চট্টগ্রামে একুশ মেলা পরিষদ নামে একটি সংগঠনের উদ্যোগে আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে এই মেলা শুরু হয়েছিল। তারপর চট্টগ্রামের প্রকাশকদের একত্রিত করে সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী মুসলিম ইনস্টিটিউট চত্বরেই বইমেলা করার দায়িত্ব নিয়ে নেন সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে। সে ধারাবাহিকতাটি চলতে থাকে তারপর থেকেই। এরপর একটি পর্যায়ে মুসলিম ইনস্টিটিউট চত্বর থেকে এম এ আজিজ স্টেডিয়ামসংলগ্ন জিমনেশিয়াম চত্বরের খোলা মাঠটিতে বইমেলা হয়ে আসছিল।

কিন্তু হঠাৎ করে সিজেকেএস (চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা) সেই জায়গায় কোনো মেলা করতে দেয়া হবে না বলে ঘোষণা দেয়ায় বিপাকে পড়ে সৃজনশীল প্রকাশক, পাঠকসহ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এ অবস্থায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় চট্টগ্রামে রেলওয়ের কেন্দ্রীয় ভবনের (সিআরবি) সামনের মাঠে এই বইমেলা অনুষ্ঠানের। কিন্তু সেক্ষেত্রে কিছুদিন পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যদি আবার বাঁধ সাধে তাহলে বইমেলা সেই উদ্বাস্তুই হয়ে পড়বে।

বলাকা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী, লেখক-গবেষক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘বইমেলা মুসলিম ইনস্টিটিউট চত্বর থেকে স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়াম চত্বরে স্থানান্তরিত হলো। এখন আবার সিআরবিতে। সামনে কোথায় হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’

চট্টগ্রাম নগরপিতার কণ্ঠেও হতাশার সুর বইমেলা নিয়ে। বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘এবার মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা করতে পারিনি। খেলার মাঠে শুধু বইমেলা নয়, কোনো মেলা করতে দিবে না। তাহলে করব কোথায়? আছে লালদীঘির মাঠ। সেখানেও ছেলেরা খেলাধুলা করে। তাই বাধ্য হয়ে সিআরবিতে এসেছি। সিআরবি বইমেলার স্থায়ী ভেন্যু হলে ভালো হবে। স্থায়ী স্টেডিয়াম বা মাঠ চসিকের আছে বাকলিয়ায়, কিন্তু সেখানে মেলা জমবে না।’

এই বইমেলা উদ্বাস্তু হোক কিংবা নতুন ভেন্যু হিসেবে অনেকের অপছন্দও হতে পারে— তাই বইপ্রেমীদের সমাগম বাড়ানো কিংবা সবাইকে বইমেলামুখী করার জন্য যা যা প্রয়োজন সবই করা প্রয়োজন। যথাযথ প্রচারণা, ব্যবস্থা, সিআরবি প্রবেশের পথমুখগুলোতে সুসজ্জিত গেট, লাইট, নিরপত্তা থাকা প্রয়োজন। আর এসব করতে না পারার পেছনে- আমি বলবো এটি মেলা কমিটির দুর্বলতা। মেলা কমিটি, প্রশাসন, চসিক, লেখক, শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সমন্বয় প্রয়োজন। এভাবে একটি মেলাকে যেনতেনভাবে চালিয়ে গেলে ভবিষ্যত্বে অস্থিত্ব সংকটে ভুগতে হবে এ মেলাকে। তাই এখনই নির্দিষ্ট ভেন্যু, নিরাপত্তা এসব নিশ্চিত করতে হবে সর্বপ্রথম।

আরও পড়ুন