২৫ এপ্রিল ২০২৪

‘স্কাউটিং ব্যক্তি জীবনকে আরও সহজ করে তোলে’

১৯০৭ সালে রবার্ট স্টিফেনসন স্মিথ লর্ড বেডেন পাওয়েল অব গিলওয়েল স্কাউটিং কার্যক্রমের সূচনা করেন। সূচনার পর থেকেই যুব সম্প্রদায়কে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্নিক শিক্ষা দিয়ে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যক্তিগতভাবে সৎ, সুন্দর, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে স্কাউটিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ২২ লাখ ছেলে-মেয়ে স্কাউটিং কার্যক্রমের সাথে জড়িত। আর এই ছেলে-মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিতে রয়েছেন বেশ কিছু নেতা। এমনই একজন নেতা আশরাফুল আলম। তিনি ১৯৯২ সাল থেকে স্কাউটিং কার্যক্রমের সাথে জড়িত। দীর্ঘ ৩১ বছরের স্কাউটিং জীবনে ঘটেছে অনেক মজার অভিজ্ঞতা ও স্মরণীয় স্মৃতি। আজ বাংলাধারার একান্ত সাক্ষাৎকারে আমরা এ স্কাউট নেতার কাছ থেকে জানব তার স্কাউটিং জীবনের সূচনা, অভিজ্ঞতা ও মজার কিছু স্মৃতি। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন বাংলাধারার রিপোর্টার হাসান সৈকত…

বাংলাধারা প্রতিবেদক: স্যার কেমন আছেন আপনি?
আশরাফুল আলম: আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো আছি।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: স্কাউটিং জীবনের সূচনা, অভিজ্ঞতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আপনার সাথে আজ আলাপ করতে চাই।
আশরাফুল আলম: অবশ্যই। কেন নয়। স্কাউট আমার আবেগ। স্কাউট বিষয়ে বলতেও আমার ভালো লাগবে।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: প্রথমেই আমরা জানতে চাই স্কাউটিং কী এবং কারা স্কাউটিংয়ের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারবে?
আশরাফুল আলম: স্কাউটিং হলো একটি সেচ্ছাসেবী সংগঠন। স্কাউটিং তারাই করবে, যারা সেচ্ছায় এবং নিজের ইচ্ছায় দেশকে কিছু দিতে পারবে। দেশের সেবা যারা করতে পারবে তারাই স্কাউটিংয়ে আসবে। যারা স্কাউটিং করে তারা এটা থেকে কোন সুবিধা পাওয়ার আশায় স্কাউটিং করে না। বরং স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে সমাজ, দেশ ও গোষ্ঠীকে কিছু দেওয়ার মন-মানসিকতা নিয়েই স্কাউটিংয়ে আসেন তারা। যারা স্কাউটিং করবে তাদের মধ্যে অবশ্যই এই ধরনের মন মানসিকতা থাকতে হবে। তার পরেই তারা স্কাউটিং কার্যক্রমের সাথে সংযুক্ত হতে পারবে।

স্কাউটিংয়ের ভাষায় ছয় থেকে পঁচিশ বছর বয়সী সবাই হচ্ছে যুবা। এইখানেও তিনটি ভাগ আছে। তবে এই যুব বয়সীদের জন্যই হচ্ছে স্কাউটিং এবং এই যুবকদের স্কাউটিং কার্যক্রমের প্রশিক্ষণ দিতে রয়েছে কিছু প্রাপ্ত বয়স্ক লিডার।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: আপনি কখন থেকে স্কাউটিং কার্যক্রমের সাথে সংযুক্ত হয়েছেন?
আশরাফুল আলম: আমি স্কাউটিং শুরু করেছি যখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি তখন থেকে। তখন আমি টাইগার পাস স্কুলে পড়ালেখা করতাম। ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত স্কাউটিং এর যে শাখাটি আছে তাকে কাবিং বলা হয়। যে সকল বাচ্চারা কাবিং এর সাথে সম্পৃক্ত তাদের বলা হয় কাব স্কাউট। তখন আমি আমার স্কুলের ট্রুপ লিডার ছিলাম। মূলত তখন থেকেই আমার স্কাউটিংয়ের সূচনা। এরপর স্কুল কলেজের পাঠ চুকিয়ে যোগ দিলাম স্কাউটিংয়ের লিডারশীপের দিকে।

প্রথমে তো স্কাউটিং কি- তা আমি জানতাম না। আমি আমার স্যারদের সান্নিধ্যে থেকে স্কাউটিং সম্পর্কে বেশ ভালোভাবে জানতে এবং বুঝতে পারলাম। তখন আমি যে জিনিস গুলো পেলাম, বিভিন্ন প্রোগ্রামগুলোতে অংশগ্রহণ করার অবাধ সুযোগ, সমাজকে দেওয়ার যে সুযোগ তা আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। তখন টাইগার পাসে দুটো রেলপথের মাঝে একটা বিল ছিল, সেখানে এখন ধান চাষ হয়। মাওলানা নুরুল ইসলাম স্যারের নেতৃত্বে আমরা তখন ওই বিলটা পরিষ্কার করি। তখনতো ছোট ছিলাম, অতো কিছু বুঝতাম না, তবে এই সকল ব্যপার গুলো আমাকে স্কাউটিংয়ের প্রতি গভীর ভাবে আকৃষ্ট করেছে। স্কাউটিং শিশু কিশোরদের নেতৃত্ব দিতে শেখায়। স্কাউটিং করার মাধ্যমে স্কাউটরা নেতৃত্ব কি জিনিস তা বুঝতে শিখে।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: কত বছর যাবৎ স্কাউটিং এর সাথে সম্পৃক্ত আছেন আপনি?
আশরাফুল আলম: আমি ১৯৯২ সাল থেকে লিডার হিসেবে স্কাউটিং কার্যক্রমের সাথে জড়িত। তার আগে ক্লাস থ্রি থেকে স্কাউট হিসেবে সম্পৃক্ত ছিলাম।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: এত বছরের স্কাউটিং অভিজ্ঞতায় আপনার অর্জনগুলো নিয়ে যদি কিছু বলতেন।
আশরাফুল আলম: আমি যখন স্কাউটিং করি তখন আমাদের হাতে কলমে শেখার কিছু জায়গা ছিল। যেমন পানির কল মেরামত, সাইকেলের চাকা মেরামত, রং করা, আর্ট করা এইসব কিছু আমি স্কাউটিং থেকে শিখেছি। আমি যদি উদাহরণ দেই যে নেম প্লেট তৈরি করা, আমি যখন টিচার হিসেবে স্কুলে জয়েন করি তখন ওই স্কুলের ২৫০ জন ছাত্র-ছাত্রী ছিল। ওই ২৫০ জনের নেম প্লেট আমি নিজের হাতে তৈরি করেছি। আমি আমার স্কুলে প্রথম বারের মতো নেম প্লেটের প্রবর্তন করি। এসব কিছু শেখা কিন্তু আমার স্কাউটিং থেকে। স্কাউটিং আমায় শিখিয়েছে কিভাবে নিজের কাজ নিজেকে করতে হয়। স্কাউটিং শিশুকিশোরদের সৃজনশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। আরো বিভিন্ন জিনিস আছে যেমন ইলেকট্রিকের কাজ, সেটাও কিন্তু শেখা আমার স্কাউটিংয়ের মাধ্যমেই। কিছু দিন আগেই আমি একটা পড়ার টেবিল তৈরি করেছি। এইটা আমি কখনোই পারতাম না যদি না আমি স্কাউটিং করতাম। স্কাউটিং আমাকে সৃজনশীল হতে শিখিয়েছে।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: বুঝলাম যে স্কাউটিং করলে আমরা অনেক কিছু জানবো, শিখবো বা করতে পারবো বা স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে। এতো কিছুর পর শুধুই যে শেখার আগ্রহ নিয়ে আছেন বা এখনো স্কাউটিংয়ের সাথে লেগে আছেন এর কারণটা কী?
আশরাফুল আলম: আসলে শেখার তো কোনো শেষ নাই, কেউ যদি বলে যে তার শেখা শেষ, তবে সে ভুল করবে। আমার স্কাউটিং এর সাথে লেগে থাকার অনেকগুলো উদ্দেশ্যের মধ্যে একটা উদ্দেশ্য হলো, আমি এর শেষটা কোথায় তা দেখতে চাচ্ছিলাম।

আমি যখন ১৯৯৪ সালে স্কাউট বেসিক কোর্স করি তখন আমাদের কোর্সে যে সকল স্যাররা ছিলেন তাদের কাছে লাল সবুজের একটা স্কার্ফ ছিল। কোর্সে বসেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম ওদের কাছে লাল সবুজে স্কার্ফ, আমাকেও একদিন এই লাল সবুজ স্কার্ফ অর্জন করতে হবে। আমার মনে হয়না স্কাউটিংকে আমার যে সেবাটা দেওয়া উচিত তার কোনো অংশে আমি কম দিয়েছি। সেটা দলীয়, জেলা, অঞ্চল অথবা জাতীয় পর্যায়েই স্কাউটিংকে যে সময়টা দেওয়া উচিত তার কোনো অংশে কম দিইনি আমি। আর আল্লাহ সব সময় আমার সহায় ছিলেন এবং সকলের দোয়ায় আজ আমি একজন লিডার ট্রেইনার। এখন আমার গলায়ও কিন্তু লাল সবুজের ওই স্কার্ফ। স্কাউটিংয়ের সর্বোচ্চ হচ্ছেন লিডার ট্রেনার, যদি এর উপরে ও কিছু থাকতো তবে আমি তার জন্যেও চেষ্টা করতাম। এইটা এখন পর্যন্ত আমার সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: এতো বছরের স্কাউটিং জীবনে কি কি করেছেন আপনি? উল্লেখযোগ্য কিছু যদি বলতেন আমাদের।
আশরাফুল আলম: স্কাউটিংয়ে তো আমি অনেক কিছু করেছি, প্রথমেই যদি বলতে হয় আমি একজন ইউনিট লিডার ছিলাম। আমি সবসময় দল নিয়ে মাঠে ছিলাম।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: আপনি তো বর্তমানে একজন জেলা সম্পাদক। একজন জেলা সম্পাদক হিসেবে আপনি আপনার জেলার জন্য কি কি করেছেন?
আশরাফুল আলম: জেলা সম্পাদক হিসেবে জেলার যে দায়িত্ব গুলো আছে আমি আমার পক্ষ থেকে তার শতভাগ করার চেষ্টা করেছি। আমি সব সময় চেষ্টা করেছি সকলের সাথে সমন্বয় করে কাজ করতে। এই ক্ষেত্রে আমার জেলার যারা কর্মকর্তা আছেন তারা সকলে খুবই আন্তরিক, যা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: এই যে স্কাউটিং করছেন, এই ব্যপারটা আপনার ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনে কেমন প্রভাব ফেলছে বলে আপনি মনে করেন।
আশরাফুল আলম: স্কাউটিং নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে আরো সহজ করে তোলে। আমি তো আগেই বলেছি স্কাউটিং একটা মানুষকে নিজের কাজ নিজে করতে শেখায়। স্কাউটিং সৃজনশীল হতে শিক্ষা দেয়। স্কাউটিং সব সময় নিজেকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। যে মানুষটা নিজের মন থেকে স্কাউটিং করেছে, স্কাউটিংয়ের পেছনে সময় ব্যয় করেছে তার এই সময়টা কখনো বৃথা যাবে না।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: আমরা যতটুকু জানি আপনি এই জেলায় প্রায় দশ বছর যাবত জেলা সম্পাদক পদে নিয়োজিত আছেন। দশ বছর আগের চিত্র এবং দশ বছর পরে এসে কি মনে হয়? নিজের জেলাকে আপনি কতটুকু এগিয়ে নিতে পেরেছেন?
আশরাফুল আলম: দশ বছর পরে এসে যদি আমি আগের সাথে তুলনা করতে চাই, তবে অবশ্যই বলতে হবে আমি সফল। আমরা দলীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা পর্যন্ত প্রায় সকলের সহযোগিতা পাই। ২০১৫ সালে ঘূর্ণিঝড় নোরার আঘাতে আমাদের এই জেলা ভবনটা ভেঙে পড়ে। তারপর এতো বছরের চেষ্টার পর ২০২২ সালে এসে আমরা আমাদের জেলা ভবনটা আবার নতুন করে তৈরি করতে পেরেছি।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম জেলায় আনুমানিক কতজন ছেলে-মেয়ে স্কাউটিং কার্যক্রমের সাথে জড়িত আছে?
আশরাফুল আলম: আমার জেলায় আটটা স্কাউট গ্রুপ আছে, চারটা গার্ল্স ইন স্কাউট গ্রুপ আছে, আটটা কাব দল আছে এবং আটটা গার্ল্স ইন কাব দল আছে। এছাড়াও চারটা মুক্ত দল আছে আমার জেলায়। সব মিলিয়ে আনুমানিক ৪৫০ থেকে ৫০০ ছেলেমেয়ে আমার জেলায় স্কাউটিং করে।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: স্কাউটিং জীবনে আপনি কি কি এওয়ার্ড অর্জন করেছেন?
আশরাফুল আলম: স্কাউটিংয়ের প্রায় সবগুলো এওয়ার্ডই পেয়েছি আমি। আমি লংসার্ভিস ডেকোরেশন পেয়েছি, আমি সভাপতি এওয়ার্ড পেয়েছি, এছাড়াও আমি মোটামুটি অনেক এওয়ার্ডই পেয়েছি। এখন আমি রৌপ্য ইলিশের জন্য অপেক্ষা করছি। যদি কপালে থাকে তবে রৌপ্য ইলিশটাও পাবো ইনশাআল্লাহ। যদি বাংলাদেশ স্কাউটস মনে করে আমি রৌপ্য ইলিশ পাওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করেছি, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই তারা আমাকে এ ওয়ার্ডটা প্রদান করবে।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: স্কাউটিং নিয়ে মজার কোনো স্মৃতি যদি আপনার থেকে থাকে এবং যদি আপনি আমাদের সাথে শেয়ার করতেন।
আশরাফুল আলম: স্কাউটিংয়ের সুবাদে আমার মোটামুটি পুরো বাংলাদেশ ঘোরা হয়েছে গেছে। আমি আমার এতো বছরের স্কাউটিং জীবনে অনেক ক্যাম্প করেছি। প্রতিটা ক্যম্পেই নতুন নতুন স্মৃতি তৈরি হয়। নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। নতুন সংস্কৃতিকে জানা এবং বোঝার একটা সুযোগ তৈরি হয়।

এমনি একটা মজার স্মৃতির কথা মনে পড়ে গেলো। সালটা খুব সম্ভবত ২০১৭ কিংবা ১৮ হবে। চাঁদপুরের হাইম চর নামক একটা জায়গায় ক্যাম্পে গিয়েছিলাম। ওই সময়টাতে এই এলাকায় কাল বৈশাখি ঝড় হচ্ছিল। আর সে সময় টাতে ঝড় শুরু হয়েছে ওই সময়টায় আমরা একটা তাবুর ভেতরে ছিলাম। আমরা চারজন ছিলাম তাবুতে। এরকম কঠিন ঘূর্ণিঝড়তো জীবনে কখনো সামনে থেকে মোকাবেলা করিনি। ওই সময় বাতাসের তীব্রতা এতো বেশি ছিল তাবু যাতে উড়ে না যায় সে জন্য আমরা চারজন তাবুর চারটা কোণ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমাদের তাবু ছাড়া আশেপাশের প্রায় সব তাবু বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। গল্প গুলো এখন বলতে গেলে খুবই হাসি পায় তবে ওই সময় টায় ব্যপারটা আমাদের জন্য খুবই ভয়ানক ছিলো। যদি কিছু হয়ে যায়, কারণ আমাদের জন্য জায়গাটা সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। এইটা আমাদের জন্য প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করার নতুন এক অভিজ্ঞতা।

বাংলাধারা প্রতিবেদক: এতক্ষণ আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার জীবনের এতোসব মজার অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
আশরাফুল আলম: আপনাকে এবং বাংলাধারাকেও অনেক ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন