১৪ জুন ২০২৪

হৃদরোগের যেসব ঝুঁকি আমাদের একেবারেই অজানা

হৃদরোগের মূল ঝুঁকিগুলো হলো উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ও দেহের অতিরিক্ত ওজন- একথা বেশিরভাগ মানুষেরই জানা। তবুও এমন অনেক লোকের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে যাদের মধ্যে এসব পরিচিত সমস্যাগুলোর কোনোটিই ছিল না।

গবেষণা থেকে এখন জানা যাচ্ছে, গাউট বা গেঁটে-বাত, সোরিয়াসিস, অন্ত্রের প্রদাহ ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো অবস্থাগুলোও হৃদরোগের ঝুঁকির কিছু কারণ। আর এসব সমস্যার মধ্যে প্রধান মিলটি হলো দেহে দীর্ঘস্থায়ী ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ।

ইদানীং কিছু গবেষক কার্ডিওভাসকুলার রোগকে ধমনীর দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগের সারিতে ফেলছেন। বিজ্ঞানীরা কখনো কখনো একে ‘এথেরোস্ক্লেরোটিক কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ’ বা এএসসিভিডির প্রদাহজনক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।

যে প্রক্রিয়ায় প্রদাহ ঘটে
এথেরোস্ক্লেরোসিস ঘটে যখন আমাদের ধমনীর দেয়ালে চর্বির স্তর জমতে শুরু করে। এতে ধমনী শক্ত হয়ে যায়।

হৃৎপিণ্ডে অক্সিজেনসহ রক্ত সরবরাহকারী ধমনীতে যখন এ ব্যাপার ঘটে তখন তাকে বলা হয় করোনারি আর্টারি ডিজিজ।

এএসসিভিডি হার্ট অ্যাটাক ঘটাতে পারে, যখন হৃদপিণ্ডে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ করা হয় না।

এটি ইস্কেমিক স্ট্রোকও ঘটাতে পারে, যেখানে পর্যাপ্ত রক্ত মস্তিষ্কে গিয়ে পৌঁছায় না।

কেন এএসসিভিডি একটি ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহজনক সমস্যা তা বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে কিভাবে এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়।

এথেরোস্ক্লেরোসিস হওয়ার প্রথম পর্যায়টিতে কোষের একটি স্তর যা ধমনীর দেয়াল হিসেবে কাজ করে সেই এন্ডোথেলিয়ামে কোনো ক্ষত তৈরি হয়।

যাকে ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ বলা হয়, সেই উচ্চ মাত্রার লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা এলডিএল কোলেস্টেরলের কারণে এটি ঘটতে পারে।

সিগারেটের ধোঁয়ার বিষাক্ত পদার্থ ধমনীর আস্তরণে চুলকানি তৈরি করতে পারে, যার ফলে ধমনীর দেয়ালে ক্ষত তৈরি হয়।

এন্ডোথেলিয়াল কোষগুলো যখন আহত হয় তখন তারা রাসায়নিক বার্তা পাঠিয়ে রক্তের শ্বেত রক্তকণিকাকে ডেকে আনে।

এই শ্বেত কণিকা আমাদের দেহের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

এসব শ্বেত রক্তকণিকা ধমনীর দেয়ালের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং ধমনীতে প্রদাহ তৈরি করে।

একই সাথে শ্বেত রক্তকণিকা ধমনীর দেয়ালের লেগে থাকা কোলেস্টেরলও খেয়ে ফেলে, যার মাধ্যমে ধমনীর দেয়ালে ‘ফ্যাটি স্ট্রিক’ বা চর্বির দাগ তৈরি শুরু হয়।

এথেরোস্ক্লেরোসিসের প্রথম দৃশ্যমান লক্ষণগুলোর মধ্যে এটি একটি।

ধমনীতে ফ্যাটি স্ট্রিক তৈরি হতে শুরু করে অল্প বয়স থেকেই। আমাদের বয়স যখন ২০-এর কোঠায় পৌঁছায়, তখন বেশিরভাগের ধমনীতেই ফ্যাটি স্ট্রিকের কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়।

ধমনীর এন্ডোথেলিয়াল কোষের ক্ষতি, সেখানে শ্বেত রক্তকণিকার অনুপ্রবেশ এবং প্রদাহের এই প্রক্রিয়াটি বছরের পর বছর ধরে সংগোপনে ঘটতে পারে, যার ফলে শেষপর্যন্ত ধমনীতে প্লেক তৈরি শুরু হয়।

এর মাধ্যমেই ব্যাখ্যা করা যায়, যেসব লোকের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনক অবস্থা রয়েছে তারা কেন কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকিতে পড়ে।

হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ অবশেষে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের দিকে চলে যায়।

নীরব প্রদাহ
হার্ট অ্যাটাক ঘটে যখন হৃৎপিণ্ডের সরবরাহকারী ধমনীতে কোনো একটি প্লেকের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যায়। এর কারণে প্লেকটি ফেটে যেতে পারে।

ফলে ধমনীতে রক্ত বা অন্য কোনো বস্তু জমাট বাঁধতে পারে এবং হৃৎপিণ্ডের পেশীতে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয়।

যাদের হার্ট অ্যাটাক হয়, প্রায়ই ঘটনার দিন কিংবা তার আগের সপ্তাহগুলোতে তাদের ধমনীতে প্রদাহ এবং প্লেকের অস্থিরতার মাত্রা বেড়ে যায়।

চূড়ান্ত ‘হার্ট অ্যাটাক’ এবং এর ফলে হৃদপিণ্ডের পেশীর ক্ষতি হওয়ার কারণ হলো এই অস্থির প্রদাহজনক প্রক্রিয়াটি তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

এই দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনক প্রক্রিয়াটি কোনো লক্ষণ ছাড়াই ঘটতে পারে।

যেসব রোগীর মধ্যে হৃদরোগের পরিচিত ঝুঁকি নেই, তারা বুঝতেই পারবে না যে তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে গেছে।

প্রদাহ যেভাবে পরিমাপ করা যায়
সুসংবাদ হলো, শরীরে প্রদাহ পরিমাপ করার একটি উপায় আছে।

সেটি হলো উচ্চ-সংবেদনশীলতার সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন (এইচএস-সিআরপি) নামক রক্ত পরীক্ষা।

উঁচু মাত্রার এইচএস-সিআরপি স্তরের লোকদের হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি।

উঁচু মাত্রার এলডিএল কোলেস্টেরলও এএসসিভিডির ঝুঁকির কারণ।

নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, যেসব লোকের মধ্যে উচ্চ মাত্রার এলডিএল কোলেস্টেরল এবং এইচএসএস-সিআরপি রয়েছে তাদের কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হয়।

প্রদাহ কমাতে নানা গবেষণা
ক্যান্টোস নামের একটি বড় ধরনের ক্লিনিকাল ট্রায়ালে উঁচু মাত্রার এইচএস-সিআরপি রয়েছে এমন রোগীদের হার্ট অ্যাটাকের পর তাদের ওপর ক্যানাকিনুম্যাব নামের একটি প্রদাহ-বিরোধী ওষুধ প্রয়োগ করা হয়।

এতে দেখা যায়, ওই অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগের ব্যবহারের ফলে এইচএস-সিআরপির মাত্রা কমে গেছে এবং রোগীদের হার্ট অ্যাটাকের সংখ্যাও ছোট কিন্তু পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।

তবে ওই ওষুধ যারা ব্যবহার করেছে, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকিও দৃশ্যত বেড়েছে বলে গবেষণা থেকে জানা যায়।

এই ঝুঁকি ও পাশাপাশি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে আমরা যে খুব শিগগিরই এএসসিডির চিকিৎসার জন্য ক্যানাকিনুম্যাব ব্যবহার শুরু করতে পারব এমন কোনো সম্ভাবনা নেই।

গবেষণাটি যুগান্তকারী হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কারণ এর মাধ্যমেই প্রমাণ পাওয়া গেছে যে এএসসিভিডিতে প্রদাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং ওই প্রদাহকে কমিয়ে আনতে পারলে তা কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

এএসসিভিডির ঝুঁকির কারণগুরো সম্পর্কে আমরা যেভাবে চিন্তা করি তাতে পরিবর্তন ঘটাতে পারলে যারা হার্ট অ্যাটাক কিংবা স্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছে, আমরা ওই সব রোগীকে আরো ভালোভাবে সনাক্ত করতে পারব।

পাশাপাশি, এর মাধ্যমে কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি কমাতে আমরা প্রদাহের চিকিৎসার দিকে আরো বেশি করে নজর দিতে পারব।

ইতোমধ্যে বেশ কিছু গবেষণায় প্রদাহ কমাতে এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগের বৃদ্ধি রোধ করতে কোলচিসিন ও মেথোট্রেক্সেটের মতো সস্তা প্রদাহ-বিরোধী ওষুধের ব্যবহারের দিকে নজর দেয়া হচ্ছে।

প্রদাহ কমাতে জীবনধারায় পরিবর্তন
খুশির বিষয় হলো ওষুধের ওপর নির্ভর না করেই আমাদের শরীরে প্রদাহ কমানো সম্ভব।

জীবনে আমরা যা কিছু করি তাকে আমরা প্রদাহ-পন্থী বা প্রদাহ-বিরোধী বলে ভাগ করে নিতে পারি।

ধূমপান প্রদাহজনক। কারণ সিগারেটের টক্সিন শরীরে জ্বালা বাড়ায়।

রক্তে উঁচু মাত্রার কোলেস্টেরল ও প্রক্রিয়াজাত খাবার আমাদের ধমনীতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণ হতে পারে।

অন্যদিকে, ফল, শাকসবজি, দানাদার শস্য ও তৈলাক্ত মাছ প্রদাহ-বিরোধী বলে মনে করা হয়।

নিয়মিত ব্যায়াম শরীরে প্রদাহের মাত্রাও কামিয়ে আনতে সাহায্য করে।

স্থূলতা, বিশেষ করে কোমরের চারপাশে অতিরিক্ত ওজন, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণ বলে মনে হয়। ভুঁড়ি কমাতে পারলে প্রদাহও কমে যাবে।

স্ট্রেস বা মানসিক চাপ শরীরে দীর্ঘস্থায়ী ও নিচু মাত্রার প্রদাহ তৈরি করতে পারে এবং স্ট্রেস কমানোর চেষ্টা আমাদের জন্য জরুরি।

রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখা, কোলেস্টেরল ও বডি মাস ইনডেক্স ঠিক রাখাও আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

প্রদাহ-বিরোধী বিকল্প পথগুলো বেছে নেয়ার মাধ্যমে ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে আমরা সকলেই হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারি এবং আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারি। সূত্র : বিবিসি

আরও পড়ুন