রিয়াদুল ইসলাম রিয়াদ, বাঁশখালী»
সবেই শুরু হয়েছে বাংলার ফাল্গুন মাস। বিদায় নিতে শুরু করলো শীতঋতু। শীতের এই বিদায়লগ্নে বসন্তের আগমনে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত বাঁশখালী উপকূলের সমুদ্র সৈকত। এই অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও আগত অতিথি পাখির কিচিরমিচির শব্দ শুনতে বিভিন্ন স্থান থেকে বাঁশখালী উপকূলে ছুটি আসছেন নানা বয়সের দর্শনার্থী।
মুলত বষন্তের এ সময়টাতে মেরু অঞ্চল, ইউরোপ, সাইবেরিয়া, এশিয়ার কিছু অঞ্চল এবং হিমালয়ের আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত বরফ পড়ার কারণে তুলনামূলক কম শীতের বাংলাদেশে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় চলে আসে অতিথি পাখিরা। তাই বাংলাদেশের বিভিন্ন হাওড়-বাওড়, খাল-বিল, চর অঞ্চল ও সমুদ্র সৈকতে ভরে উঠে অতিথি পাখিদের কিচিরমিচির শব্দের কলকাকলি।

তা ছাড়াও পূর্বে সবুজে ঘেরা পাহাড়, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর কূলবর্তী সমুদ্র সৈকত ও নানা রকম প্রকৃতির শ্বাসত অপরূপ-সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও বিনোদনে ভরপুর এই পর্যটনকেন্দ্র গুলোকে দীর্ঘদিন ধরে পর্যটন উপজেলা ঘোষনার জোর দাবি জানিয়ে আসছে এলাকাবাসী।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার সরল, গণ্ডামারা, ছনুয়া, বাহারছড়া, কাথরিয়া, ও খানখানাবাদজুড়ে অবস্থিত বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত অতিথি পাখিদের দখলে। অতিথি পাখিদের কিচিরমিচির ডাকে মুখোরিত বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম এই সমুদ্র সৈকত। এই ছাড়াও আগত পর্যটকরাও মন ভরে উপভোগ করছেন পাখির উড়া-উড়ি, কালকাকলি আর কিচিরমিচির ডাক। দর্শনার্থীদের অনেকে পাখিদের অবাদ বিচরণ আর ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো কিংবা দলবেঁধে পানিতে ভেসে চলার ছবি ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। দর্শনার্থীরা কাছে যেতেই ঝাঁক বেঁধে কিচিরমিচির শব্দে উড়তে শুরু করে আকাশে। তবে ভোর সকাল ও বিকাল বেলায় দেখা মিলে এই সব অতিথি পাখিদের।

জানা যায়, শীত মৌসুমে বঙ্গোপসাগরের কূলঘেষে অবস্থিত চর অঞ্চল ও সমুদ্র সৈকতে ঝাঁকে ঝাঁকে বালিহাঁস সহ নানা রকম অতিথি পাখি এসে পড়ত। দিনভর দলবেঁধে খাদ্য সংগ্রহ করে সন্ধ্যায় চরের প্যারা বাগান ও আশেপাশের গাছপালায় আশ্রয় নিত। চর ও সমুদ্র সৈকতগুলো পাখির অভয়ারণ্য হলেও শিকারিদের কারবারে হারিয়ে বসেছিল অতিথির পাখিদের এই মিলন মেলা। স্থানীয় প্রভাবশালী পাখি শিকারিদের বন্ধুকের নলা ব্যবহার ছিল এক ধরনের বাহাদুরি। বর্তমানে বসন্ত এলে গ্রামের বাড়িগুলোতে এইসব বাহাদুরি রুপ কথার গল্পের মত শোনানো হয় নাতি-নাতনিদের। তবে স্থানীয়দের তৎপরতায় বাঁশখালী উপকূল নতুন করে গড়ে ওঠছে পাখিদের মিলন মেলায়।
সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী সাইয়েদা ফারহানা নিতু জানান, আমরা দীর্ঘদিন পর বাঁশখালী সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে এসেছি। এখানে এত পরিমাণ অতিথি পাখি আগে কখনো দেখিনাই। এইসব অতিথি পাখি দেখে সত্যিই মনটা আনন্দে ভরে গেল। তাছাড়া সন্ধ্যায় রক্তিম সূর্য দেখতে খুব ভালো লেগেছে। তবে আমি মনে করি সামাজিক সংগঠন ও সরকারের পক্ষ থেকে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল সৃষ্টিতে পদক্ষেপ নেওয়া হলে আগামীতে এই এলাকায় পাখিদের আরো বেশি আগমন ঘটবে। সেই সঙ্গে এলাকাটি সুস্থ বিনোদনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলেও জানান তিনি।
কাথরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শাহজাহান চৌধুরী বলেন, আমাদের বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত এমনিতেই সৌন্দর্যে ভরপুর, এখন অতিথি পাখির আগমনে সেটা আরও সৌন্দর্যে রুপ নিল। বিগত কয়েক বছর আগে শীত এলেই আমাদের এই উপকূলীয় চরে প্রচুর পরিমাণ নানা রং-আকৃতির অতিথি পাখিদের কূজনে মুখোরিত থাকতো। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে কমতে শুরু করেছে প্রকৃতির পরিযায়ীদের আগমন। একসময় বালিহাঁস, পানকৌড়ি, ডাহুক, কানা বক, সরালি, মাছরাঙ্গা, গাংচিলসহ অসংখ্য পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটতো।

তিনি আরও বলেন, এই অতিথি পাখিদের বাঁচাতে আমি নানা উদ্যেগ নিয়েছি। পাখি শিকারীদের সর্তক করা হয়েছে। উপকূলীয় বন বিভাগকেও এই সব পাখি রক্ষায় কার্যকর ভুমিকা নিতে অনুরোধ করেছি। এছাড়াও সৌন্দর্যের নানারুপে বর্ণিত বাঁশখালী সমুদ্রকে পর্যটন সুবিধার্থে আমি আমার নিজ উদ্যোগে কটেজ, পর্যটকদের যাতায়াত রাস্তা প্রশস্থ করন, খেলার মাঠ, বিশ্রামাগার, শৌচাগার, ও সুপেয় পানির জন্য গভীর নলকূপ সহ বিভিন্ন স্থাপনার নির্মাণ করেছি।
বাঁশখালী উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ শফিকুল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, ‘এসব অতিথি পাখি প্রকৃতির সৌন্দর্যের অলঙ্কার। এ অলঙ্কার ধ্বংস করা মানে পরিবেশ ধ্বংস করা। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য পাখির বিচরণক্ষেত্র রক্ষা করতে হবে। আমাদের দেশ অতিথি পাখির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সর্বস্তরের মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।’ তাছাড়া বিভিন্ন সময় আমরা পাখি শিকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছি। এখনো আমরা সজাগ রয়েছি। যে কেউ এমন অপরাধের তথ্য প্রদান করলে তাৎক্ষনিক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।












