টানা চার দিনের অতি ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম অঞ্চল ভয়াবহ দুর্যোগের মুখে পড়েছে। পাহাড়ধস, দেয়ালচাপা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে গত তিন দিনে অন্তত ২২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। মৃতদের মধ্যে সাতজনই শিশু। একই সঙ্গে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো জলমগ্ন হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা। রেললাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে পাহাড়ি ঢলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সাজেকে আটকা পড়েছেন প্রায় ৪৫০ পর্যটক।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় থাকায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে টানা বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী আরও দুই দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
টানা বর্ষণে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে। ৫ নম্বর আশ্রয়শিবিরের একটি মহিলা হেফজখানার ওপর পাহাড়ের পাশের দেয়াল ও মাটি ধসে পড়ে পাঁচ মাদ্রাসাছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও তিন শিশু, যাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর আগে একই দুর্যোগে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরসি) এবং অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিকেলে দুর্ঘটনাস্থল থেকে ৩০ শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনজনকে কুতুপালং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পাহাড়ের খাদে নির্মিত দেয়াল মাদ্রাসার ওপর ধসে পড়লে এ ঘটনা ঘটে।’
চট্টগ্রাম নগরীতেও পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড়ধসে ১০ মাস বয়সী আশরাফুল ইসলাম নিহত হয়। একই ঘটনায় তার মা আহত হন। নগরের চশমা হিল এলাকার মেয়র গলিতে পাহাড়ধসে প্রাণ হারায় ১৩ বছর বয়সী সামিয়া ইসলাম।
অবিরাম বৃষ্টিতে দ্বিতীয় দিনের মতো চট্টগ্রাম নগরীর কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ, পাঁচলাইশ, কাপাসগোলা, হালিশহর, চান্দগাঁও, রামপুরা, বাদুড়তলাসহ বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত পানি জমে থাকায় ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ে। দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণি কার্যক্রম ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
ভারী বর্ষণে নগরের সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে শমসেরপাড়া পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় আট থেকে নয় হাজার যাত্রী এ পথে যাতায়াত করলেও বর্তমানে তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। কবে নাগাদ ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সময় জানাতে পারেনি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) আনিসুর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পথে প্রতিদিন চার জোড়া ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে করে প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। কবে নাগাদ ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হবে তা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।’
এদিকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক সড়কের বিভিন্ন অংশ ডুবে যাওয়ায় সাজেকে অবস্থানরত প্রায় ৪৫০ পর্যটক আটকা পড়েছেন। পরিস্থিতির অবনতির কারণে প্রশাসন নতুন পর্যটকদের সাজেকে প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ছাড়াও কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী এলাকায় অন্তত ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢল ও জলাবদ্ধতায় বহু সড়ক ডুবে গেছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং ফসলি জমি ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ বলেন, ‘পর্যটকদের সাজেক ভ্যালিতে বুধবার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করার অনুরোধ করা হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে এবং যাতায়াতের পরিবেশ তৈরি হলে বিকেলে সেনাবাহিনীর সহায়তায় খাগড়াছড়ি সদরে ফিরিয়ে আনা হতে পারে।’














