১৪ মার্চ ২০২৬

অন্ধ তিন বোনের উপাখ্যান

কাউছার আলম »

ওরা চার বোন এক ভাই। জন্মের পর থেকে আলোর মুখ দেখেনি চার বোন। তারপরও তারা সমাজকে আলোকিত করছেন। তিনজনেই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। অন্ধ হয়েও থেমে নেই তাদের জীবন সংগ্রাম। তারা চট্টগ্রামের পটিয়ায় হাজারো শিশুর মাঝে ছড়াচ্ছে শিক্ষার আলো। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এই চার বোনের মধ্যে তিনজন শিক্ষকতার পাশাপাশি রান্নাবান্না, গান, স্ক্রিন টাচ মোবাইল ব্যবহার, কম্পিউটার চালানোসহ প্রায় সব কাজে সমান পারদর্শী। যা বিরল দৃষ্টান্ত।

উম্মে হাবিবা চৌধুরী পটিয়া পৌর সদরের শশাংকমালা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের, উম্মে তাসলিমা চৌধুরী দক্ষিণ গোবিন্দারখীল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এবং উম্মে তানজিলা চৌধুরী মোহছেনা মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ও অপর বোন উম্মে সালিমা চৌধুরী লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রাইভেট টিউশনি করে জীবনযাপন করছেন। ভাই নাঈম উদ্দিন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে বায়িং হাউসে চাকরি করছেন।

তাদের জন্মস্থান পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামে। বাবার নাম নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও মা শামীমা আক্তার চৌধুরী। বাড়ি তাদের পটিয়ায় হলেও বাস করেন চট্টগ্রাম নগরীর হামজারবাগ এলাকায়। তাঁদের চতুর্থ কন্যাসন্তান উম্মে তানজিলা চৌধুরী। জন্ম ১৯৯৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। তাঁরা চার বোন এক ভাই। চার বোনই জন্মান্ধ। তাঁদের বড় ভাই মো. নাইম উদ্দিন অন্ধ নন।

একসময় মেয়েদের নিয়ে নাছির উদ্দিন দিশা হারিয়েছিলেন। তবে তাঁর ইচ্ছাশক্তি ছিল প্রবল। চেয়েছিলেন মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়াক। যাঁর জীবনে আলো নেই, তিনি আলো দিচ্ছেন কোমলমতি শিশুদের—জানতে পেরেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ডেকে নিয়েছিলেন নিজের দপ্তরে। গেল২০১৬ সালের ৯ মার্চ তানজিলাকে পুরস্কৃত করেন প্রধানমন্ত্রী। খুব খুশি হয়েছিলেন তানজিলা। আর সে রেশ না কাটতেই একই বছরে ৩ সেপ্টেম্বর অনন্যা সম্মাননা পেয়ে যান। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সনদ ও ক্রেস্ট পেয়েছেন তানজিলা। আবার অনন্যার পক্ষ থেকেও পেয়েছেন সনদ ও ক্রেস্ট। সঙ্গে কিছু অর্থও পাচ্ছেন তিনি। তবে প্রাপ্ত অর্থ নিজের জন্য রেখে দেবেন না। ব্যয় করবেন শিক্ষার্থীদের কল্যাণে।

মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট তৈরি করতেও জানেন তারা। তাঁদের হাতের রান্না খেয়ে সুখ্যাতি করেন মেহমানরা। চার বোনই পড়েছেন চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। হাবিবা, সালিমা ও তাসলিমা বন গবেষণা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আর তানজিলা রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। আরো পরে হাবিবা ও তানজিলা হাজেরা তজু কলেজ এবং সালিমা ও তাসলিমা সিটি কলেজ থেকে ব্রেইল পদ্ধতিতে এইচএসসি পাস করেন। পরে চারজনই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সুযোগ পান।

হাবিবার জন্ম ১৯৮৩ সালের ১ ডিসেম্বর। তিনি মাস্টার্স শেষে এখন পটিয়া পৌরসভার শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। তাসলিমার জন্ম ১৯৮৯ সালের ৩০ মে। তিনি রাজনীতিবিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছেন। পড়াচ্ছেন দক্ষিণ গোবিন্দারখিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তৃতীয় বোন সালিমা মাস্টার্স শেষে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিসিএস পরীক্ষায় বসার। তানজিলা মাস্টার্স করেছেন সমাজতত্ত্বে। সালিমা ছাড়া তিন বোনের সবাই ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর পটিয়ার তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা পদে যোগ দিয়েছেন। তিনজনই থাকেন পটিয়ায়। একই বাড়িতে।

তারা বলেন, আমরা এখন স্বনির্ভর। কারো করুণার পাত্র নই। দেশসেবার সুযোগ পেয়ে আমরা খুশি। আমি উচ্চাঙ্গ গান গেয়ে সারা দেশে পরিচিত হতে চাই।

সকালে ঘুম থেকে উঠে থালাবাসন পরিষ্কার করেন। জামা-কাপড় কাচেন। রান্নাও সেরে নেন এক ফাঁকে। খেয়েদেয়ে স্কুলে পৌঁছে যান নির্ধারিত সময়ের আগেই। শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে তাঁরা পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। তানজিলা ক্লাস নেন প্রাক প্রাথমিক, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে। মাঝেমধ্যে অন্য শিক্ষকরা ছুটিতে থাকলে পঞ্চম শ্রেণিতেও ক্লাস নেন।

তাঁর স্কুলের শিক্ষিকারা বললেন, সব ক্লাসেই নিজেকে ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারেন তানজিলা। তানজিলার পড়ানোর ধরন ভালো। শিক্ষার্থীরা তাঁকে পছন্দ করেন। তা ছাড়া গান জানেন বলে আলাদা সম্মান পান। অন্য শিক্ষকদের চেয়ে তানজিলা কোনোভাবে কম যান না।’ তানজিলা নিজেও সহকর্মীদের ব্যবহারে সন্তুষ্ট। বললেন, ‘মাস্টার্স শেষে এনজিওতে কাজ করব ভেবেছিলাম। কিন্তু তিন বোন একসঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা পদে নিয়োগ পরীক্ষা দিই। তিনজনই নির্বাচিত হই এবং শিক্ষকতা পেশায় চলে আসি। এখন এই পেশাকে ভালোবেসে ফেলেছি। সহকর্মীদের ভালোবাসার জালে বন্দি হয়ে গেছি। প্রত্যেকেই আন্তরিক।’

তানজিলা শহরে উদীচীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পটিয়ায়ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছেন। নিজের সাংস্কৃতিক কর্মী পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। তাসলিমা চৌধুরী পড়ান দক্ষিণ গোবিন্দারখিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তাসলিমাও ভালো গান করেন। তাঁর সহকর্মী দিলুয়ারা বেগম বলেন, ‘তাসলিমা চোখে দেখে—এমন মানুষের চেয়ে কোনো অংশে কম নন; বরং বেশি উপস্থিত বুদ্ধি রাখেন।’ উম্মে হাবিবাও গান করেন। তিনি চেয়েছিলেন উকিল হতে।

হাবিবা পড়ান শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। হাবিবা বললেন, ‘শিক্ষকতা পেশায় এসে ভালো লাগছে। অন্ধ হয়েও সমাজে শিক্ষার আলো ছড়াতে পারছি। এটাই বড় প্রাপ্তি।’ তাঁর স্কুলের অন্যান্য শিক্ষিকারা ও বললেন, ‘ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষ অনেক দূর যেতে পারে, হাবিবা তাঁর উদাহরণ। তিনি ধৈর্যশীল শিক্ষিকা। জন্মান্ধ চার মেয়েকে নিয়ে একসময় নিজেই অন্ধকার দেখতেন বাবা নাছির উদ্দিন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। স্কুল থেকে নিয়ে গেছেন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। তাঁর চার কন্যা এখন সুকন্যা নামে আদৃত।

তানজিলা বললেন, ‘ঘরে প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে অনেক মা-বাবা কুণ্ঠাবোধ করেন। মেহমান এলে তাদের সামনে যেতে বাধা দেন। কিন্তু আমার মা-বাবা মোটেই এমন নন। তাঁরা সমস্ত বাধা অতিক্রম করে আমাদের এগিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের কারণেই আমরা আজ এত দূর এসেছি। তাঁদের ঋণ শোধ করার নয়। সে চিন্তাও করি না।’

তানজিলা আরো বলেন, ‘ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস থাকলে বাধা পেরোনো যায়।’ তানজিলা কৃতজ্ঞ তাঁদের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সামাদের প্রতিও। তাঁর সহপাঠীরাও অনেক সহযোগিতা করেছেন।

দিন শেষে তিন বোন যখন ফেরেন বাসায়, তখন তাঁরা ক্লান্ত। ক্লান্তি দূর করতে নিজেরাই চা-নাশতা তৈরি করে খান। তারপর মাছ-মাংস ও সবজি কাটেন। উম্মে হাবিবা বলেন, ‘মাছ বেশি বড় হলে কাটতে সমস্যা হয়, এক কেজির কম ওজনের হলে সমস্যা হয় না। ভালো পুডিং ও নুডলস বানাতে পারি।’ সকালের চা তৈরির কাজটি তানজিলাই বেশি দিন করেন। ব্যবসায়ী বাবা নাছির উদ্দিন মেয়েদের উপার্জনের দিকে তাকান না। মেয়েরা শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে দেশে, ভেবে মা-বাবা খুব গর্বিত। মেয়েরা মাঝেমধ্যেই মা-বাবাকে সারপ্রাইজ দিতে চান। মা-বাবার জন্য কিছু না কিছু গিফট কিনে তাঁরা বাসায় পৌঁছান। এতে মা-বাবাও খুশিতে আপ্লুত হন।

পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল হাসান বলেন, তাঁরা তাঁদের দায়িত্বের প্রতি যত্নবান। কখনো অন্যের সহানুভূতি চান না। তাঁরা কেবল অন্ধদের নয়, স্বাভাবিক মানুষের জন্যও অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।

বাংলাধারা/এফএস/টিএম

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ