কক্সবাজার প্রতিনিধি »
নিজদেশে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয়ার দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ (২৫ আগস্ট)। নিপীড়িত রোহিঙ্গার স্রোত স্থল ও জল সীমান্ত অতিক্রম করে এ দিনে বাংলাদেশে প্রবেশ শুরু করে। চরম অসহায়ত্বের আবরণে আসা রোহিঙ্গা ‘আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা’ বর্ণনাতীত ভাবে মানবিক সহায়তা পেয়েছিল সেদিন। স্থানীয় পর্যায়ে শুরু হওয়া সহযোগিতা এখন আন্তর্জাতিকতায় ঠেকে পাল্টে গেছে রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের চিত্র। বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিকতায় দেশী-বিদেশী সংস্থার অর্থায়নে রাখাইনের দুর্বিসহ জীবন-যন্ত্রণা অনেকটা ভুলে গেছে রোহিঙ্গারা। নিজেদের দেশের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা নিয়ে আশ্রিত দেশে অবাধে বিচরণ করছে তারা।
কিন্তু সেই মানবিক সহায়তার বদলে চরম উগ্রতার বহি:প্রকাশ ঘটাচ্ছে রোহিঙ্গা দুর্বৃত্তরা। টেকনাফ-উখিয়ার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে বেশ কয়েকটি অপরাধি দল গঠন করে শিবিরের অভ্যন্তরে অপরিকল্পিতভাবে দোকানপাট ও মাদক বিক্রির আখড়া তৈরি, মানবপাচার, অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়, ডাকাতি ও মাদকের টাকায় আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহসহ নানা অপরাধকর্ম করছে। তারা আক্রমণ করে হত্যা করছে স্থানীয়দেরও। গত বৃহস্পতিবার রাতেই টেকনাফের হ্নীলা জাদিমুরা এলাকায় স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুককে গুলি করে হত্যা করেছে রোহিঙ্গা সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। এর আগে, ২০১৬ সালের ১৩ মে টেকনাফের মুছনী রোহিঙ্গা শিবিরের পাশে শালবন আনসার ক্যাম্পে হামলা চালায় রোহিঙ্গা ডাকাত হাকিম বাহিনী। এ সময় আনসার কমান্ডার আলী হোসেন তাদের গুলিতে নিহত হন। তারা লুট করেছিল আনসারের ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৭ শতাধিক গুলিও।
পুলিশের তথ্যমতে, চলতি (২০১৯) বছরের জানুযারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন প্রায় ৪৬ জন রোহিঙ্গা। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৬, মার্চে ১০, এপ্রিলে ৪, মে মাসে ৫ জন, জুনে ৭জন, জুলাইয়ে একজন ও ২৪ আগস্ট পর্যন্ত ৫ রোহিঙ্গা। পুলিশের ভাষ্য, ৪৫ রোহিঙ্গার মধ্যে পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ৩২ জন। নিহতদের অধিকাংশ ইয়াবা কারবারি, মানব পাচারকারী ও সশ্রস্ত্র ডাকাত।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, মানবিক আশ্রয়কে রোহিঙ্গারা অপব্যবহার করছে। বেঁচে থাকতে সরকারের সামগ্রিক সহযোগিতা পেয়েও নানা অপরাধে জড়াচ্ছে তারা। এরা আমাদের জন্য ‘বিষঁফোড়া’ হয়ে গজাচ্ছে। তাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি জটিল হবে।
আবু মোরশেদ চৌধুরীর কথাই সত্যি হয়ে ধরা দিচ্ছে। আশ্রিত জীবনে নিজ দেশের চেয়ে শতগুণ স্বাধীন ভাবে চলাফেরা ও সামগ্রিক সুযোগ সুবিধা পাওয়ায় নিজদেশে প্রত্যাবাসিত হতে নানা তালবাহানা করছে রোহিঙ্গারা। আগে কোন ধরণের সুযোগ-সুবিধা না পেলেও এখন জীবন ধারণের নানা অনুসঙ্গ দিতে মিয়ানমার ঘোষণা করলেও নিজ দেশে ফিরতে চাচ্ছে না রোহিঙ্গারা। নাগরিকত্বসহ নানা দাবির দোহাই দিয়ে পরপর দুইবার প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্তকে তারা জলাঞ্জলী দিয়েছে। এতে হতাশ আশ্রয় দেয়া বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক মহল।
এদিকে, রোহিঙ্গাদের প্রথম আশ্রয় দেয়া স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত দুই বছর আগে আসা অসহায় রোহিঙ্গাটি নেই তারা। আচার-আচরণ পাল্টে তারা ক্রমে উগ্র হয়ে উঠছে। কথায় কথায় স্থানীয়দের সাথে ঝগড়া-বিবাদে জড়াচ্ছে, বুক কাঁপছে না খুন করতেও। তাদের বীরদর্পে ঘুরে বেড়ানো দেখলে আশ্রিত বলে মনেই হয় না।
অনিশ্চয়তার মাঝে দেশ ছাড়া রোহিঙ্গারা ভিন দেশের মাটিতে ঘর করে থাকার সুযোগ পেয়েছে। জীবন ধারণের নানা অনুসঙ্গ নিয়ে এ ঘরেই তাদের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। দু’বছরে দু’বার প্রত্যাবাসনের দিনক্ষণ ঠিক হলেও প্রত্যাবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কিছু কিছু এনজিও এবং মিয়ানমার সরকারের ‘চর’ হয়ে কাজ করা কিছু রোহিঙ্গাদের অপচেষ্ঠায় প্রত্যাবাসন বার বার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠছে। এদেরই শেখানো বুলিতে সাধারণ রোহিঙ্গারা বলছেন, নিরাপদ আশ্রয়, নিজের ভিটেসহ সম্পদ, নাগরিকত্ব এবং নিপীড়নের বিচার নিশ্চিতসহ নানা দাবি পূর্ণ না হলে তারা ফিরে যাবে না।
গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার অযুহাতে রোহিঙ্গাদের উপর নিপীড়ন শুরু হয়। ঘরবাড়ি জ্বালানো, ধর্ষণ, হত্যাসহ নানা সহিংসতায় প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গারদল। এসময় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা আসে বাংলাদেশে। এরাসহ পূর্বে আসা রোহিঙ্গা মিলিয়ে নিবন্ধনের আওতায় এসেছে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৪১৭জন। এরা উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থান করছে।
গত দুই বছরে বিশ্বের নানা সরকার প্রধান থেকে শুরু করে ইউরোপিয়ন ইউনিয়ন, মিয়ানমারের প্রতিনিধিদল, আসিয়ান, ওআইসি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদল একাধিকবার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। একইভাবে পরিদর্শনে আসেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এবং বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। সর্বশেষ পরিদর্শনে আসেন মিয়ানমার সরকার কর্তৃক গঠিত স্বাধীন তদন্ত কমিশন। কিন্তু, বিশ্ব নেতাদের এত পরিদর্শনের পরও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
শনিবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে বালুখালি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা আমির হামজা (৪৮) বলেন, বাপ-দাতার দেশ মিয়ানমার। সেখানেই জন্ম এবং বেড়ে উঠা। কিন্তু লজ্জাজনক ভাবে আমরা বিতাড়িত হয়েছি। তাই নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ নিশ্চিত না হলে মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে কি করব? এর চেয়ে এখানে (বাংলাদেশে) মরে যাওয়াই ভাল।
কুতুপালং ৪ নম্বর ক্যাম্পের সালামত খান (২৮) বলেন, রেডিওসহ নানা খবরে শুনি আমাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিবে। আমরাও চাই নিজ দেশে ফিরে যায়। কিন্তু কেন তা বিলম্ব হয় এর সঠিক কেউ বলতে পারে না।
কুতুপালং ক্যাম্পের এ-২ ব্লকের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, বলতে গেলে মিয়ানমারের চেয়ে আমরা এখানে ভাল আছি। সামরিকজান্তাদের (মিয়ানমারের) কথার বিশ্বাস নেই। আন্তর্জাতিক মহলের চাপে পড়ে তারা আমাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা বললেও সেখানে নিয়ে ভিন্ন আচরণ করবে। নাগরিকত্ব না দিয়ে উল্টো ক্যাম্পেই বন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য করাতে তারা।
কুতুপালং তিন নম্বর ক্যাম্পের মাবিয়া খাতুন (৬৫) বলেন, কয়েক প্রজন্ম পার করেছি রাখাইনে, কিন্তু ২০১৭ সালের মতো ভয়াবহতার মুখোমুখী হয়নি। যে স্মৃতি নিয়ে এসেছি, বাকি সময়টা এই ঝুপড়ি ঘরে (বাংলাদেশে) কাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। নাগরিকত্ব ও নিরাপদ পরিবেশ পেলে ফিরেও যেতে চাই, কারণ স্বামী ও স্বজনদের কবরের পাশে শেষ যাত্রাটা পাব।
কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম বলেন, আমরা মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিলাম। এখন প্রত্যাবাসনের চেষ্টা অব্যহত রয়েছে। জোর করে ফেরাতে চাচ্ছিনা বলেই প্রত্যাবাসনে দেয়া দু’বারের সময় ভেস্তে গেছে। এরপরও রোহিঙ্গাদের কাছে মিয়ানমারের দেয়া ঘোষণা তুলে ধরে তাদের সাথে মতবিনিময় চালিয়ে যাচ্ছি। হয়তো একদিন রোহিঙ্গারা বিষয়টি বুঝে স্বেচ্ছায় চলে যাবে।
বাংলাধারা/এফএস/এমআর/টিএম












