বাংলাধারা প্রতিবেদক»
আজ ১২ নভেম্বর বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই নিউমোনিয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।
বছরে এখনো বাংলাদেশে ২৪ হাজার ৩শ’ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এবং ৫০ হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়। যাদের বয়স ৫ বছরের নিচে। কয়েক বছর আগেও এ সংখ্যা তিনগুণ বেশি ছিল। তবে সুখবর হচ্ছে গত তিন বছরের তুলোনায় এ রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশু মুত্যৃর হার অনেকটা কমেছে। বাংলাদেশে ৫ বছর বয়সী শিশুমৃত্যুর হার জন্মের পর প্রতি হাজারে ২৪.৭৩ জন। যারমধ্যে ২৮ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হয় নিউমোনিয়ায় হয়ে। তবে বিগত তিন দশকে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ৫ বছর বয়সের কম বয়সীদের মৃত্যুহার কমিয়ে। যা ১৯৯০ সালে ১৪৩ দশমিক ৮ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৮ হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে অভিভাবকদের সচেতনতার কারণে। তারা শিশুদের নিউমোকক্কাস ভ্যাকসিন (পিসিভি) প্রয়োগ করছে। এতে শিশুদের নিউমোনিয়ায় সংক্রমণ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। এই ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৩৭ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশে নেমেছে। তবে বর্তমান করোনা পরিস্থিতির মধ্যে নিউমোনিয়া মোকাবিলায় আরও পদক্ষেপ নেয়া না হলে আগামী দশকে বাংলাদেশে ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হতে পারে বলে জানায় শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বাসনা মুহুরী।

সহকারি পরিচালক (মেডিকেল বিষয়) এবং কনসালটেন্ট পেডিয়াট্রিক আইসিইউ মা ও শিশু হাসপাতাল ডা. ফাহিম হাসান রেজা বলেন, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। নিউমোনিয়ার কারণে শিশুর ফুসফুসের মূল অংশে পানি জমে যায়। ফলে ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং কার্যক্ষতা কমে যায়। নিউমোনিয়ার প্রভাবে সর্দি, জ্বর, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। গত এক মাসে নগরীর মা ও শিশু হাসপাতালে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৩শ’ শিশু। এরমধ্যে আইসিইউ’তে ১১০ জন শিশু ভর্তি হয়। এ শিশুদের মধ্যে আবার ৬১ জন শিশু গুরুত্বর অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন ও মারা গেছে মাত্র একজন শিশু।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে বছরে ৯৩ লাখ ৫০ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়। দিনে গড়ে প্রায় আড়াই হাজার শিশুর মৃত্যু হয়। নিউমোনিয়ার ঝুঁকিতে থাকা দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম ও এশিয়া মহাদেশের মধ্যে ২য়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় দুই লাখ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউমোনিয়ায় শিশু আক্রান্ত হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য জন্মের পর ছয়মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশে রাখতে হবে। পাশাপাশি মা ও পরিবারের সবার স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এতে করে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পাবে। এরোগ প্রতিরোধ করতে হলে শিশুকে ছয়মাস পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ পান, অপুষ্টিরোধ, টীকাদান ও প্রাথমিক অবস্থায় রোগের লক্ষন দেখার সাথে সাথে চিকিৎসা সেবাগ্রহন করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই ২০৩০ সালের মধ্যেই প্রতিরোধ এবং প্রতিকারযোগ্য নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যুহার কমানোর সম্ভব হবে।
ইউনিসেফে তথ্যমতে, সংক্রমন রোগ সমূহের মধ্যে নিউমোনিয়া সবচেয়ে বেশি শিশুর মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালে বিশ্বে এ রোগ সংক্রমনের জন্য ২.৫ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে ৬ লাখ ৭২ হাজার জন শিশু। কোভিডকালীন সময়ে স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কিছুটা হেরফের ঘটায় আরও ১.৯ মিলিয়ন মৃত্যু যুক্ত হতে পারে।
নিউমোনিয়া আক্রান্ত এ শিশুর মা রোকসানা আক্তার বলেন, আমি আমার শিশুকে নিয়ে অনেক কষ্টের মধ্যে আছি। জন্মের ছয়মাস বয়সে হঠাৎ একদিন আমার ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখনি তাকে একটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করি কিন্তু সেখানে সে আরো অসুস্থ হয়ে পড়ে। সেখান থেকে তারা আমার ছেলেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে পাঠায়। এখানে টানা এক মাস থাকার পরে বাচ্চা কিছুটা সুস্থ হয়। তারা আমাকে কিছু ওষুধ লিখে দেয় যাতে বাচ্চাকে খাওয়াই। আমরা বাড়ি চলে আসি। কিন্তু গ্রামের একজন হোমিয় ডাক্তারের কথা আমি এটি বন্ধ করে এখন খুব বিপদে আছি। কিছু দিন যেতে না যেতেই আমার ছেলে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এখন আমি ভয়ে বাচ্চাকে নিয়ে আবার চকবাজার মেডিকেলে যেতে পাচ্ছি না। এসব মূলতো একটা নিউমোনিয়া সর্ম্পকে না জানার কারণে হয়েছে। তাই এ বিষয় আরো সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন সাধারণ মানুষের মধ্যে।
আজ বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘স্টপ নিউমোনিয়া এভরি ব্রেথ কাউন্ট্রস’। এ প্রতিপাদ্য নিয়ে সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও সরকারি বেসরকারিভাবে পালিত হচ্ছে দিবসটি।
বাংলাধারা/এফএস/এফএস












