২০ মার্চ ২০২৬

আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও অবৈধ বালু বাণিজ্য, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

সায়ীদ আলমগীর  »

বালু তোলা বন্ধ রাখতে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও কক্সবাজারের রামুর কচ্ছপিয়ার জাংছড়ি বালু মহাল থেকে দিনে-রাতে নির্বিচারে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। গত কয়েক মাসে জাংছড়ি মহাল থেকে প্রায় ৩ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করে সিন্ডিকেট আয় করেছে ৬০-৭০ লাখ টাকা। কিন্তু এ থেকে সরকার এক টাকাও রাজস্ব পায়নি। কচ্ছপিয়া ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে লোভী একটি চক্র এ বালু উত্তোলন ও বেচাকেনা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

রামু উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রণয় চাকমা ঘটানার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকার পরও একটি প্রভাবশালী চক্র বালু তুলছে। ইতিমধ্যে একাধিক অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনের একাধিক মেশিনসহ বিপুল পরিমান বালু জব্দ করে তা নিলামে বিক্রির টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়। কিন্তু এলাকাটি অতিদুর্গম হওয়ায় ঠিকমত দেখভাল করা সম্ভব হচ্ছেনা।

তিনি আরো বলেন, কারা বালু উত্তোলন করছে তালিকা এসেছে। আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে শীগগিরই।

স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিদিন অন্তত ১০০ ডাম্পার বালু বিক্রি করা হচ্ছে। জাংছড়ির কয়েকটি স্থানে মজুদ আছে অর্ধলাখ ঘনফুট বালু। প্রতি ডাম্পার বালু বিক্রি হচ্ছে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকায়। পাহাড়ি জনপদের বিভিন্ন সড়ক ও স্থাপণা নির্মাণ কাজে এই বালু সরবরাহ হচ্ছে।

সূত্র মতে, দুই বছর আগে জাংছড়ি বালু মহালটি ইজারা পেয়েছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। ইজারার বিপরীতে তিনি সরকারকে বছরে রাজস্ব দিতেন ৩ লাখ টাকার বেশি। মাঝে একবছর অন্যজন ইজারা পান। কিন্তু ১৪২৬ বাংলা সনে আবারও আবদুল্লাহ ইজারা পেলেও বালু মহালের দখলস্বত্ব তাকে বুঝিয়ে দেয়নি প্রশাসন।

শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, অন্যান্য বছরের ন্যায় বাংলা ১৪২৬ সনেও জাংছড়ি বালু মহালের ইজারা পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জেলা প্রশাসন তাকে সেই মহালের জায়গা বুঝিয়ে দিতে পারেননি। এলাকায় কতিপয় প্রভাবশালী তখনও মহাল থেকে বালু উত্তোলন করে চলেছেন। মহালের দখলস্বত্ব বুঝিয়ে দিতে হাইকোর্টে রীট করেন। হাইকোর্ট ১ অক্টোবর পযর্ন্ত (এক বছরের জন্য) বালু উত্তোলন স্থগিত রাখার আদেশ দেন।

তিনি আরো বলেন, গত ১ অক্টোবর ওই এক বছরের মেয়াদ শেষ হলে হাইকোর্ট একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। ১১ আগস্ট জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, যেসকল মামলায় নির্দিষ্ঠ সময়ের জন্য অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, স্থিতাবস্থা, স্থগিতাদেশ প্রদান করা হয়েছে-সে সকল মামলার আদেশের কাযর্কারিতা উচ্চ আদালত পূর্নাঙ্গরূপে খোলার তারিখ পযর্ন্ত বর্ধিত হয়েছে মর্মে গণ্য করা হবে।

আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও স্থানীয় কচ্ছপিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবু ইসমাইল মো. নোমানের নেতৃত্বে প্রভাবশালী মহল আদালতের নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে দৈনিক অন্তত ১০০ ডাম্পার বালু উত্তোলণ করে বেচাবিক্রি করে চলেছেন। এ গ্রুপের অন্যতম হোতা হিসেবে কাজ করছেন চেয়ারম্যানের ডান হাত বলে এলাকায় পরিচিত আবদুল্লাহ আল নোমান বাপ্পি।

আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বালু উত্তোলণ প্রসঙ্গে জানতে কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবু ইসমাইল মো. নোমানের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হয়। রিং হলেও ফোন সিরিভ না করায় ক্ষুদে বার্তা দেয়া হয়। তারও রিপ্লে না আসায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

তবে, চেয়ারম্যানের কাছেরজন আবদুল্লাহ আল নোমান বাপ্পি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কারা বালু তুলছে উপজেলা প্রশাসন জানে। সেখানে আমাদের নাম এসে থাকলে তা শত্রুরতা মুলক কেউ বলে থাকবে। তাছাড়া খালের সবখানে নিষেধাজ্ঞা নেই।

সোমবার ( ২ নভেম্বর) দেখা গেছে, জাংছড়ি খালের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে মেশিনের মাধ্যমে বালু উত্তোলন হচ্ছে। সেই বালু মজুদ হচ্ছে পাশের জমিতে। সেখান থেকে ট্রাক বোঝাই করে সেই বালু কক্সবাজার শহর, ঈদগাঁও, রামু, চকরিয়া উপজেলায় সরবরাহ হচ্ছে। কচ্ছপিয়াসহ আশপাশের ইউনিয়নে চলমান বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন কাজেও দেয়া হচ্ছে এখানকার বালু।

কচ্ছপিয়ার বাসিন্দা জহির আহমদ বলেন, দিন রাত সমানে বালু উত্তোলন করছে শ্রমিকেরা। কেউ বাঁধা দিচ্ছেনা। মাঝে মধ্যে ভুমি অফিসের লোকজন এসে কিছু বালু জব্দ দেখিয়ে চলে যান। রাত দিন ট্রাকে বালু পরিবহণ করায় এলাকায় রাস্তাঘাট ও খালের প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের তোড়ে খালপাড় ভেঙে অসংখ্য ঘরবাড়ি, গাছপালা, ফসলি জমি বিলীন হতে পারে। এনিয়ে এলাকার স্থানীয় দরিদ্র লোকজনের মাঝে আতংক বিরাজ করছে।

মেশিন দিয়ে বালু তোলার শ্রমিক হিসেবে কাজ করা নজরুল ইসলাম বলেন, ইউপি চেয়ারম্যানের হয়ে দৈনিক মজুরীতে তারা বালি তুলছেন। গত কয়েক মাসে খালের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে প্রায় ২-৩ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন ও বিক্রি হয়েছে। কয়েকটি পয়েন্টে মজুদ আছে প্রায় অর্ধলাখ ঘনফুট বালু। প্রতি ঘনফুট বালু বিক্রি হয় ২৫ টাকা দরে। চেয়ারম্যানের সাথে স্থানীয় প্রভাবশালী, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কতিপয় অসাদু কর্মচারীরা মিলেমিশে বালু বাণিজ্যের টাকা বাটোয়ারা করেন।

বাংলাধারা/এফএস/এআর

আরও পড়ুন