২৬ মার্চ ২০২৬

‘আরসা’র দ্বিতীয় কমান্ডার হাসিমসহ ছয় রোহিঙ্গা নৃশংসভাবে খুন!

সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার»

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মাস্টার মুহিবুল্লাহ ও ক্যাম্পের এক মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকসহ ছয় খুনের কিলিং মিশনে অংশ নেয়াদের প্রশাসনের হাত থেকে লুকাতে এক ভয়ংকর প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে কথিত ও বিতর্কিত সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)। খুনের ঘটনায় অংশ নেয়াদের নীরবে হত্যা করছে সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা।

গত মঙ্গলবার (২ নভেম্বর) গভীর রাতে কথিত আরসার বাংলাদেশের সেকেন্ড ইন কমান্ডার হিসেবে পরিচিত দুর্র্ধর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ হাসিমকে পিটিয়ে ও জবাই করে হত্যা করেছে সংগঠনটির একটি অংশ। টেকনাফের শালবাগান ক্যাম্পের পাহাড়ে তাকে হত্যার পর লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।

যদিও পুলিশ বলছে, হাসিমকে হত্যার বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে শুনলেও এখনো পর্যন্ত তার লাশ খোঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু হাসিম মারা গেছেন এমন খবর ক্যাম্পে ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ রোহিঙ্গাদের মাঝে উল্লাস ভাব দেখা যায় বলে জানিয়েছে ক্যাম্পে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা শৃংখলা বাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তা।

হাসিমকে জবাই করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত একাধিক গ্রুপে শেয়ার করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহের প্রথমদিকে হাসিমকে ধরে নিয়ে যায় তারই সংগঠনের অপর সন্ত্রাসীরা।

সূত্র দাবি করেছে, হাসিম মুহিবুল্লাহ হত্যা ও ছয় খুনের মিশন বাস্তবায়নকারীদের অন্যতম একজন। আরসার আমির আতা উল্লাহ জুনুনির সঙ্গে হাসিমের সারাসরি যোগাযোগ ছিল। তিনি আরসার সকল অপর্কম সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এ কারণে প্রশাসনের হাতে ধরা পড়ার আগে তাকে হত্যা করা হয়েছে। একইভাবে আরও কয়েকজন নেতাকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন আতা উল্লাহ জুননি।

এদিকে, মিয়ানমার ভূখন্ডে চলতি সপ্তাহে আরও ৫ জনকে একই কায়দায় হত্যা করেছে আরসার সন্ত্রাসীরা। নিহতের মাঝে আবদু সালাম, মোহাম্মদ কামাল ও ইদ্রিস নামে তিনজনের নাম পাওয়া গেলেও বাকি দুজনের নাম পাওয়া যায়নি। তবে তাদের পরিবার এখনো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে। নিহত এসব রোহিঙ্গাদের ছবি ও ভিডিও একই ভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের পরিচালিত গ্রুপ গুলোতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর থেকে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি আতংকও ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে রোহিঙ্গারা।

তাদেরকে হত্যার পর এক অডিও বার্তায় কথিত আরসার আমির আতা উল্লাহ জুনুনি কাকে যেন ইঙ্গিত করে বলেন, ডাকাত কি জন্য নামিয়ে দিয়েছ? ডাকাত নামালে, সন্ত্রাস নামালে, ক্যাম্পে ভিডিও করলে (আরসার কার্যক্রম) এভাবে হরিণ মরার মতো মরে। তোদের বুদ্ধি এত কম? আমাদের বিরুদ্ধে পাঠালে পরিস্থিতি এমনই হয়। এখান থেকে তোরা শিক্ষা নে।

সূত্র জানিয়েছে, নিহতরাও এক সময় আরসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু আতা উল্লাহ জুনুনি রোহিঙ্গাদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে একত্রিত করে মিয়ানমার সরকারের পক্ষে কাজ করার বিষয়টি তারা বুঝতে পারে। এরপর আরসার কোন কর্মকান্ডে তারা আর যুক্ত হতো না। সম্প্রতি মুহিবুল্লাহ্ হত্যাকান্ডের পর আরসার অপকর্মের বিষয়টি আরো সামনে এলে তারাও (নিহতরা) সংগঠনটির অপকান্ডের বিষয়ে মুখ খুলেন। আরসার কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে সাধারণ রোহিঙ্গাদের অনুপ্রাণিত করছিলেন তারা। এ কারণেই তাদেরকে কৌশলে মিয়ানমারের আরাকানে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিমত সূত্রের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়কজন রোহিঙ্গা নেতা জানান, মুহিবুল্লাহকে হত্যার পর আরসা সম্পর্কে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ধারণা পাল্টে গেছে। তারা বুঝে গেছে আরসা মিয়ানমারের পক্ষে কাজ করে। তাই তাদের প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা। এ কারণে আরসা এখন মরণ কামড় দিতে চায়। এ কারণে প্রশাসনের কাছে ধরা পড়ার আগে আরসার শীর্ষ কমান্ডার হাসিমসহ আরো ৫জন রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে আরসার সন্ত্রাসীরা।

রোহিঙ্গাদের গ্রুপে আপলোড করা অপর এক অডিওতে আরসার কর্মকান্ড হাসিম সম্পর্কে বলা হয়, মুহিবুল্লাহ ও মাদ্রাসার ছয় ছাত্র-শিক্ষককে খতলে (হত্যা) নেতৃত্ব ও নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাসিম। মাস্টর গফুরের কাছে শুনেছিলাম পুলিশের কাছে ধরা পড়ার আগে হাসিমকে মেরে ফেলা হবে। এপারে (রোহিঙ্গা ক্যাম্পে) সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ছিলো হাসিম। অন্যদের বাঁচতে হলে তাকে খতল (হত্যা) করতে হবে। আমার কাছেও একই ধরণের রিপোর্ট ছিলো বলে, অডিও দাতা দাবি করেন।   

রোহিঙ্গাদের অপর এক সূত্র জানিয়েছে, যেকোন সময় উখিয়া-টেকনাফ রোহিঙ্গা শিবির আরও অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। আরসার সন্ত্রাসীরা খুনাখুনি করে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাতে অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এভাবে ক্যাম্পকে অশান্ত করে মুহিবুল্লাহ ও অন্য হত্যার বিচারের গতি ব্যহত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে তারা। 

ক্যাম্পে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১৬ এপিবিএন’র অধিনায়ক (এসপি) মো. তারিকুল ইসলাম তারিক বলেন, মঙ্গলবার রাত থেকে গণমাধ্যম কর্মীরা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী হাসিমের লাশ উদ্ধার হয়েছে কিনা জানতে চাচ্ছে। তবে এ ধরনের কোনো তথ্য আমরা পায়নি। তারপরও গণমাধ্যম কর্মীদের দেওয়া তথ্যে ক্যাম্প ২১ ও ২২সহ সব স্থানে খবর নিয়েছি। কোনো মৃতদেহ কিংবা ক্যাম্পে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে এমন তথ্য এখনো (বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত) পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম (বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টায়) বলেন, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী হাসিম নিহত হয়েছে বলে প্রচার হলেও এখনো তার লাশ খোঁজে পায়নি পুলিশ। তবে, বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে সম্ভাব্য সকল স্থানে তল্লাশী চালানোর পাশাপাশি বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে কাজ করছে শৃংখলা বাহিনী।

মিয়ানমারে আরো ৫ রোহিঙ্গা হত্যার শিকার হবার বিষয়ে এসপি বলেন, অন্য দেশে কি ঘটেছে তা আমাদের গোচর নয়। তবে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাতে দুর্বৃত্তরা কথিত সংগঠনের নামে যেন কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে সে ব্যাপারে সবাই সতর্কতার সাথে কাজ করছে। উল্লেখ্য, গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে তার কার্যালয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর গত ২৩ অক্টোবর উখিয়ার পালংখালীস্থ ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি মাদ্রাসায় গুলি চালিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় আরো ছয়জনকে। এ দুই হত্যাকান্ডে এপর্যন্ত ২৩জন সন্দেহভাজন আসামী গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের মাঝে মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডে ৩জন এবং ছয় খুনের ঘটনায় একজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

বাংলাধারা/এফএস/এফএস

আরও পড়ুন