২৩ অক্টোবর ২০২৬

ঈদের আগে মসলার বাজারে মন্দা, দুশ্চিন্তায় ব্যবসায়ীরা

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গরম মসলার বাজার জমে উঠলেও স্বস্তিতে নেই ব্যবসায়ীরা। বাজারে পর্যাপ্ত পণ্যের মজুত থাকলেও প্রত্যাশিত ক্রেতা না থাকায় বিক্রি কমে গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চোরাচালান, দামের অস্বাভাবিক ওঠানামা এবং আমদানিনির্ভরতার চাপ। ফলে ঈদ মৌসুমেও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে মসলা ব্যবসায়ীদের।

দেখা গেছে, এলাচ, জিরা, দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, জায়ফল, জৈত্রিক ও শুকনা মরিচে বাজার ভরপুর। তবে অন্যান্য বছরের মতো এবার পাইকারি বাজারে ক্রেতাদের ভিড় নেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এসে পাইকারিতে মসলা কিনে নিয়ে যেতেন। এবার সেই চিত্র অনেকটাই ফিকে।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী জুলফিকার আলী বলেন, ‌‘এই বছরের মতো মন্দা আগে দেখিনি। ঈদের সময়েও বিক্রি কম। খরচ বাড়ছে, কিন্তু ক্রেতা নেই। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১০ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিপুল পরিমাণ মসলা আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা ও গোলমরিচের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ আদা ও রসুনও এসেছে দেশে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারি আমদানির পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে চোরাই মসলাও ঢুকছে বাজারে। এতে বৈধ আমদানিকারকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, গত এক সপ্তাহে বেশিরভাগ মসলার দাম কমেছে। ইন্ডিয়ান জিরা কেজিতে ৫৫০ টাকা থেকে কমে ৫৩০ টাকায় নেমেছে। একইভাবে দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ ও জায়ফলের দামও কমেছে। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকলেও চাহিদা না বাড়ায় দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি অমর কান্তি দাশ বলেন, ‘আমরা এলসি খুলে, শুল্ক-কর পরিশোধ করে পণ্য আমদানি করি। অথচ চোরাই পথে আসা মসলা কম দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এতে বৈধ ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।’

বর্তমানে পাইকারি বাজারে ছোট এলাচ ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৯০০ টাকা, বড় এলাচ ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৪০০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ২৬০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা এবং চিকন জিরা ৫২৫ থেকে ৫৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

খুচরা বাজারেও মসলার দামে ভিন্নতা দেখা গেছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে শুকনা মরিচের বাজার। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দুই-তিন মাস আগে ভারতের শুকনা মরিচ ৩৬০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৪২৫ টাকায় উঠেছে। হাটহাজারীর স্থানীয় মরিচও বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়।

এদিকে মসলায় ভেজাল নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। সম্প্রতি ভোক্তা অধিকারের অভিযানে জিরার সঙ্গে ক্যারাওয়ে বীজ মেশানোর ঘটনা ধরা পড়েছে। ফলে এখন অনেক পরিবার গোটা মসলা কিনে বাসায় শুকিয়ে কলঘরে গুঁড়ো করার দিকে ঝুঁকছে।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, ছোট পরিবারে প্যাকেটজাত মসলার ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বাজারে নজরদারির ঘাটতি বৈধ ব্যবসাকে আরও চাপে ফেলছে। তাদের মতে, ঈদের আগে বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে চোরাচালান রোধ, বৈধ আমদানিতে সহায়তা এবং নিয়মিত বাজার তদারকি বাড়ানো জরুরি।

খাতুনগঞ্জের মেসার্স ইসহাক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সেকান্দার হোসেন বলেন, ‘একদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, অন্যদিকে বড় পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার হওয়ায় প্যাকেটজাত মসলার ব্যবহারও বেড়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত চোরাচালান ও বাজারে নজরদারির ঘাটতি বৈধ ব্যবসাকে আরও চাপে ফেলছে। তাই ঈদের আগে বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে চোরাচালান রোধ, বৈধ আমদানিতে সহায়তা এবং পাইকারি বাজারে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোর বিকল্প নেই।’

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, ‘দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে মসলা মজুত আছে। বাজারের বর্তমান অবস্থা, আমদানির প্রক্রিয়া এবং আমদানির অনুমোদন সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি স্থিতিশীল অবস্থায় আছে।’

আরও পড়ুন