৩০ মার্চ ২০২৬

‘এইট’ সিন্ডিকেটের কবলে দেশীয় লবণ শিল্প : ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ চাষিরা

সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার »

বিক্রয় মূল্যে উৎপাদন ব্যয় উঠে না আসায় লবণের মাঠ ছাড়ছেন কক্সবাজারের লবণ চাষিরা। ক্যামিকেল আইটেমের নামে ‘এইট সিন্ডিকেট’ গোপনে সোডিয়াম ক্লোরাইড (খাবার লবণ) আমদানি করায় চাষের লবণের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করেছেন লবণ সংশ্লিষ্টরা। এতে দিন দিন লবণ উৎপাদন উৎসাহ হারাচ্ছেন চাষীরা। এতে স্বয়ংসম্পন্ন দেশিয় লবণ শিল্পে অশনি সংকেত দেখা দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তারা।

জানাগেছে, বাজারে আয়োডাইজ লবণ কেজি প্রতি ৩০-৪০ টাকায় বিক্রয় হয়। অথচ মাঠ পর্যায়ে ১ কেজি লবণের দাম মাত্র ৪ টাকার মতো। সিন্ডিকেটের পকেটে লাভ ঢুকলেও বঞ্চিত হচ্ছে চাষিরা। উৎপাদন খরচের অর্ধেকও দাম পাচ্ছে না তারা। মাঠ থেকে এক কেজি লবণ উৎপাদন খরচ পড়ছে সাড়ে ৬ টাকা। ২০১৭ সালে ‘বাফার স্টক’ গড়ে তোলার জন্য সরকার জাতীয় লবণনীতি-২০১৬ এর আলোকে পদক্ষেপ নেবার ঘোষণা দিলেও তা এখনো কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। তাই এ পরিস্থিতি বলে মন্তব্য করেন লবণ সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজার সদরের গোমাতলীর লবণ চাষি রিদুয়ানুল হক বাংলাধারাকে বলেন, অন্য বছর এ সময়ে লবণ চাষে ব্যস্ত সময় পার করতেন চাষিরা। কিন্তু এখন লবণ মাঠে চাষিরা উদাসিন সময় পার করেন। আশা নিয়ে মাঠে নামা অনেক চাষি মাঠ ছেড়ে উঠে আসছেন। সবার একই কথা, ব্যয়ের সাথে বিক্রয় মূল্যের সামঞ্জস্য নেই। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে চাষে থেকে দেনা বাড়িয়ে লাভ কি? অথচ পরিবারের ভরণ-পোষণ ও সন্তানদের পড়ালেখার খরচ যোগাতে গ্রীষ্মে লবণ ও বর্ষায় চিংড়ি চাষই একমাত্র ভরসা এখানকার অধিবাসীদের।

মহেশখালীর নলবিলার বাসিন্দা আবদুল হক বলেন, বিগত তিনযুগ ধরে লবণ চাষ ও ব্যবসার সাথে জড়িত। ঢাকা এবং চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি শিল্প কারখানায় চাহিদা অনুযায়ী তিনি লবণ জোগান দিয়ে এসেছেন। কিন্তু গত ৩-৪ বছর ধরে ঐসব কারখানা মালিক তার কাছ থেকে লবণ নেন না। এখন তারা আমদানীকারকদের কাছ থেকেই লবণ কিনছে।

ইসলামপুরের লবণ ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, ২৫ বছর ধরে নারায়নগঞ্জের একটি পোষাক কারখানায় প্রতি সপ্তাহে দু-ট্রাক করে লবণ বিক্রি করা হতো। গত কয়েক বছর থেকে ঐ পোশাক কারখানা কর্তৃপক্ষ এখন বিদেশ থেকে আমদানীকৃত লবণ ব্যবহার করছে কারখানায়।

মাতারবাড়ীর এক লবণ কারখানার মালিক বখতেয়ার আলম জানান, লবণের মওসুম শুরু হলেই চট্টগ্রাম, নরায়নগঞ্জ, ঝালাকাটি, খুলনার বড় বড় মিল মালিকদের মধ্যে কক্সবাজারের লবণ কিনতে ধুম পড়ে যেতো। প্রতিদিন শতশত কার্গোবোট ভর্তি লবণ সমুদ্র পথে চলে যেতো ঐসব মোকামে। কিন্তু এখন সেদিন আর নেই। এখন ঐসব মিলাররা বিদেশ থেকে আমদানীকৃত লবণ বাজারজাত করছেন।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কক্সবাজার লবণ প্রকল্প কার্যালয় সুত্র মতে, ২০১৯-২০ মৌসুমে লবণের চাহিদা ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ৪৯ হাজার মে.টন। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার মে.টন। কক্সবাজার জেলায় উৎপাদনযোগ্য লবণ জমির পরিমাণ ৬০ হাজার ৫৯৬ একর। জেলায় লবণমিলের সংখ্যা প্রায় ৮০টি। প্রতি মণ লবণের দাম বাজারমূল্য ১৯২ টাকা। যা কেজিতে পড়েছে প্রায় ৪ টাকা। উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় সাড়ে ৬ টাকা।

কক্সবাজার লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি রইচ উদ্দিন বলেন, মোল্লা, এসিআই, ফ্রেশ, তীর, খ্রিস্টাল, পুবালী, কনফিডেন্স ও মধুমতি’ এ ৮ সিন্ডিকেট ফ্রি ট্যাক্সে ‘ফিনিশ লবণ’ আমদানি করে তারা কম দামে বাজারে ছাড়ছে। সিন্ডিকেট বন্ডেড ওয়্যার হাউজ’র আওতায় ব্যাক টু ব্যাক এলসি এবং ট্যাক্স ফাঁকির মাধ্যমে ক্যামিকেল আইটেমের আড়ালে সোডিয়াম সালফেটের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড (খাবার লবণ) আমদানী করছে। এই বড় শিল্পগ্রুপগুলোর সাথে পেরে উঠছে না দেশী লবণশিল্প। ফলে মার খাচ্ছে স্থানীয় লবণ। অন্যদিকে বিভিন্ন পন্থায় অবৈধভাবে লবণ আমদানী করায় সরকারও হারাচ্ছে রাজস্ব।

রইচ উদ্দিনের মতে, জনস্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর সোডিয়াম সালফেট আমদানি নিষিদ্ধ করতে হবে। যদি নেহায়েতই অন্য শিল্পের জন্য প্রয়োজন হয়, তাহলে তার উপর ২০০ শতাংশ করারোপ করা দরকার। সোডিয়াম সালফেটের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি যেন না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কক্সবাজারেই স্থাপন করতে হবে ‘লবণ বোর্ড’ এর অফিস। আর মাঠ থেকে ন্যায্যমূল্যে অন্তত ২ লাখ মেট্রিকটন লবণ ক্রয় করে সরকারীভাবে আপদকালীন মজুদ গড়ে তুলতে হবে।

বিসিক কক্সবাজারের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. হাফিজুর রহমান বাংলাধারাকে বলেন, লবণশিল্প বাঁচাতে অনেক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। চৌফলদন্ডিতে পাইলট প্রকল্প চলছে। চাষিদের মাঠে রাখতে মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম অব্যাহত আছে। প্রান্তিক চাষিদের প্রণোদনামূলক ক্ষুদ্রঋণ দিতে এনজিওগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। শীগগিরই একটা ভাল ফলাফল আসবে বলে মনে করছেন বিসিকের এই কর্মকর্তা।

অপরদিকে, দেশীয় স্বয়ংসম্পন্ন লবণ শিল্প বাঁচাতে বেশ কয়েকটি প্রস্তাবনা দিয়েছে লবণ মিল মালিক সমিতি।

নেতৃবৃন্দের মতে, মন্ত্রণালয় বা অন্য সরকারী সংস্থার আওতায় নিবন্ধিত করে মধ্যস্বত্তভোগীদের কমিশন নির্দিষ্ট করে দেয়া দরকার। মৌসুমের শুরুতে লবণ চাষীদেরকে সরকারীভাবে পলিথিন সরবরাহ করা হোক। লবণ মৌসুমের শুরুতে বিশেষ উৎসাহ-সহায়তা হিসেবে চাউল বরাদ্দ করতে হবে। যাতে অভাবের তাড়নায় মধ্যসত্বভোগীদের কবল মুক্ত হয় তারা।

তাদের মতে, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনে প্রচুর জমি অধিগ্রহণ করায় লবণ চাষের মূল জমির পরিমাণ কমে এসেছে। বেকার হয়ে গেছে চাষিরা। বিভিন্ন উপকূল সংলগ্ন নতুন করে জেগে ওঠা চরের জমি সত্যিকার লবণ মিলার ও লবণ চাষীদেরকে সহজ শর্তে বন্দোবস্তীর ব্যবস্থা করলে উক্ত জমিগুলো লবণ চাষের উপযোগী করে লবণ চাষের আওতা বৃদ্ধি করা যায়।

বাংলাধারা/এফএস/টিএম

আরও পড়ুন