২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

একজন শহীদ কর্নেল লুৎফুর এবং আমি

জীবনে চলার পথে অনেক মানুষের সাথেই পরিচয় হয়। কেউ থাকে হৃদয়ের মণিকোঠায়, আবার কেউ হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতল গহ্বরে।

আজ থেকে প্রায় ২২ বছর পূর্বে, এক পৌষের শীতের সন্ধ্যায় আমার সাথে পরিচয় হয় কর্নেল লুৎফুর সাহেবের। প্রথম দর্শনেই অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কারণে উনার প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করি। বাংলাদেশ বীর সেনাবাহিনীর কর্নেল পদমর্যাদার একজন সম্মানিত অফিসার হয়েও উনার মধ্যে বিন্দুমাত্র অহংবোধের লেশমাত্র ছিল না। উপরন্তু, প্রথম দর্শনেই উনি আমাকে “Young man, how are you..?” সম্বোধন করে আমাকে আরও বিমোহিত করে তোলেন।

কালের পরিক্রমায় সেই সম্পর্ক দু’জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পারিবারিক পরিমণ্ডলেও প্রবেশ করে, যা পরবর্তীতে দৃঢ় পারিবারিক বন্ধনে পরিণত হয়। উনাকে আমি ‘আঙ্কেল’ সম্বোধন করতাম। আমাদের শ্রদ্ধেয় পিতার সাথেও উনার গড়ে ওঠে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক।

কিছু মানুষরূপী দানবের অযাচিত কর্মকাণ্ডে জীবন যখন বিষাদময় হয়ে উঠেছিল (না পারছিলাম কাউকে বলতে), ঠিক তখনই সেই বিখ্যাত ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের মতো আলোকবর্তিকা নিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কর্নেল লুৎফুর সাহেব। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতিকে সুদক্ষভাবে মোকাবিলা করে আমাকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সার্বিক সহায়তা করেছিলেন।

পেশাগত কারণে চট্টগ্রাম থেকে চলে গেলেও প্রায় নিয়মিতই উনার সাথে যোগাযোগ হতো। এরই মাঝে কুখ্যাত ওয়ান-ইলেভেনে আমার পরিবারের উপর বয়ে যাওয়া অযাচিত ঝড়ঝাপটার কথা লোকমারফত জানতে পেরে উনি আমার পরিবারের পাশে দাঁড়ান এবং যথার্থ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

তখন ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। উনি যশোর ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন (যদি আমার স্মৃতিশক্তি আমার সাথে প্রতারণা না করে থাকে)। আমার সাথে উনার শেষ কথা হয়েছিল ২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। উনি বলেছিলেন,
“আমি ঢাকায় এসেছি। তোমার বাবার সাথে ঢাকায় আমার দেখা হবে (আমার শ্রদ্ধেয় পিতাও তখন ঢাকায় ছিলেন)। তুমি কখন আসবে ঢাকায়…? তোমাকে অনেকদিন দেখিনি… আসলে অবশ্যই দেখা করবে। ভালো থেকো।”

না, সে দেখা আর কখনো হয়নি কর্নেল লুৎফুর সাহেবের সাথে।

২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে দশটায় যখন জানতে পারলাম কুখ্যাত “বিডিআর বিদ্রোহ” সংঘটিত হয়েছে এবং সবকিছুই কতিপয় বিপথগামীদের নিয়ন্ত্রণে, অজানা আশঙ্কায় মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। টিভি চ্যানেলগুলোতে যখন একের পর এক সংবাদ ও সংবাদচিত্র আসছিল, আমার মন ততই অশান্ত হয়ে উঠছিল।

দুপুর তিনটার দিকে উনার মোবাইলে কল দিলে মোবাইল বন্ধ পাই। তখনও আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল খারাপ কিছু ঘটেনি। ঢাকায় অবস্থানরত আমার পিতাও উনার জন্য ভীষণ টেনশনে ছিলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আমাদের পরিচিত চ্যানেলগুলোতেও আমার পিতা খোঁজ নিয়েও কোনো সংবাদ পেতে ব্যর্থ হন।

এরপর ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পরও যখন উনার মোবাইল বন্ধ পেলাম, তখন সত্যিই নিজের মনে ব্যাপকভাবে খারাপ অনুভূতির সঞ্চার হতে লাগল। পরদিন সন্ধ্যায়, অর্থাৎ ২৬ ফেব্রুয়ারি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জনাব আজিজুল ইসলাম সাহেবের নিকট জানতে পারলাম সেই ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদটি।

দুঃসংবাদটি শোনার পর সেই মুহূর্তের অনুভূতিটুকু আমার মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত মনে থাকবে। ঢাকায় অবস্থানরত আমার শ্রদ্ধেয় বড় বোন এবং আমার মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। আমার কথা আর নাই-বা বললাম……

যে মানুষটির স্নেহাশীষ ছায়ায় দেখানো পথে জীবনের বাঁক পরিবর্তিত করে অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে হাঁটি হাঁটি পা করে আজ এই পর্যায়ে এসেছি, সে মানুষটির শূন্যতা এবং উনার জন্য হাহাকার অনুভব করি প্রতিনিয়তই (বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসে)। এখন আর কেউ আমাকে বলে না………

“Get up, stand up: stand up for your rights!
Get up, stand up: stand up for your rights!
Get up, stand up: stand up for your rights!
Get up, stand up: don’t give up the fight!”

সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তাআলার কাছে এই প্রার্থনা করি তিনি যেন জাতির এই সূর্যসন্তানকে জান্নাতবাসী করেন।

Salute Colonel Late Martyr Mr. Lutfur
Salute Bangladesh Army

লেখক: তানভীর আহমেদ
(গণমাধ্যম কর্মী)

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ