১৭ অক্টোবর ২০২৬

১২৫ গোল, ২০৭ ম্যাচ, পাঁচটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা— কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় যে গল্প, তার নাম লিওনেল মেসি

একদিন থামতেই হয়— মেসিও থামলেন

কিছু মানুষ বিদায় নেন। কিছু মানুষ চলে যান। আর কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও থেকে যান— অদৃশ্য কোনো আলোর মতো, পুরোনো কোনো গানের সুরের মতো, শৈশবের কোনো বিকেলের মতো। লিওনেল মেসি সেই তৃতীয় ধরনের মানুষ।

৩১ আগস্ট ২০২৬। ফুটবল পৃথিবীর ক্যালেন্ডারে দিনটি হয়তো একটি সাধারণ দিন। কিন্তু যাঁরা মেসির সঙ্গে দুই দশক হেঁটেছেন, তাঁদের কাছে এটি একটি যুগের শেষ বিকেল। আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি খুলে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল, ৬৮ অ্যাসিস্ট— একটি জাতীয় দলের ইতিহাসে এত দীর্ঘ, এত উজ্জ্বল, এত নাটকীয় কোনো অধ্যায় লেখা খুব সহজ নয়।

শেষ ম্যাচটিও যেন মেসির গল্পের মতোই। বিশ্বকাপের ফাইনাল। প্রতিপক্ষ স্পেন। আর শেষে হার—অতিরিক্ত সময়ে ১-০।

কত অদ্ভুত! যে মানুষটি ২০২২ সালে বিশ্বকাপ হাতে তুলে নিয়ে নিজের গল্পের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাকে পূর্ণ করেছিলেন, চার বছর পর সেই বিশ্বকাপের ফাইনালেই শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সি পরে মাঠ ছাড়লেন। তবে, মেসির গল্পকে শেষ ম্যাচ দিয়ে বিচার করা অন্যায়। কারণ মেসি কখনো শুধু একটি ম্যাচের ফুটবলার ছিলেন না। তিনি ছিলেন ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার মানুষ। একটি ম্যাচ যখন আটকে গেছে, বল যখন প্রতিপক্ষের পায়ের কাছে বন্দি, গ্যালারির শব্দ যখন ধীরে ধীরে নিস্তেজ—তখন কোথা থেকে যেন বেরিয়ে এসেছে বাঁ পায়ের একটি স্পর্শ। একটি পাস। একটি ড্রিবল। একটি গোল। তারপর বদলে গেছে ম্যাচ। বদলে গেছে মানুষের মুখ। বদলে গেছে ইতিহাসের বাক্য।

মেসির সবচেয়ে বড় জাদু গোল করা নয়; গোল হওয়ার আগেই গোলের জন্ম দেখতে পাওয়া। তিনি এমন জায়গায় বল পাঠিয়েছেন, যেখানে সতীর্থ তখনও পৌঁছাননি। এমন দুই-তিনজনকে কাটিয়েছেন, যেখানে একজন মানুষকে থামাতে সাধারণত দু’জন ডিফেন্ডার যথেষ্ট মনে হয়। এমন ম্যাচে গোল করেছেন, যেখানে আর্জেন্টিনার জার্সির ওপর চাপটা ছিল পাহাড়ের মতো। তাই ১২৫ গোলের হিসাবটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সেটি মেসির পুরো পরিচয় নয়।

তবু সংখ্যাগুলোই যদি বলতে হয়—আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ, সবচেয়ে বেশি গোল। ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল। প্রতি ম্যাচে প্রায় ০.৬০ গোল। ছয়টি বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপে ২১ গোল। আর বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১২টি অ্যাসিস্ট নিয়ে সর্বোচ্চ সহায়তাকারীও তিনি।

কিন্তু সংখ্যারও একটি কবিতা আছে। ২০১৪। রিও ডি জেনেইরোর মারাকানা। বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই রাত—অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির কাছে হেরে মেসির সামনে থেকে সরে গেল স্বপ্নের বিশ্বকাপ। তারপর ২০১৫। কোপা আমেরিকার ফাইনাল। ২০১৬। আবার কোপা আমেরিকার ফাইনাল। দুইবারই শিরোপা অন্যের হাতে।

যে মেসি বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক ট্রফি জিতছেন, তার দেশ তাকে যেন বারবার ফিরিয়ে দিচ্ছে শূন্য হাতে। সমালোচনা তখন নির্মম। ‘ক্লাবের মেসি’ আর ‘আর্জেন্টিনার মেসি’—দুটি আলাদা মানুষ যেন।

একসময় ক্লান্ত মেসি বলে ফেলেছিলেন, আর নয়। কিন্তু কিংবদন্তিরা কখনো কখনো নিজেদের গল্পের শেষ বাক্য নিজেরা লিখতে পারেন না। মেসিও পারেননি। তিনি ফিরে এলেন। তারপর শুরু হলো অন্য এক মেসি। ২০২১ কোপা আমেরিকা। ব্রাজিলের মাটিতে ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার শিরোপা। মেসির চোখে জল। সেই জল-ই যেন বছরের পর বছর জমে থাকা অভিমান ধুয়ে দিল।

তারপর ২০২২। কাতার। ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনাল। ৩-৩। পেনাল্টি শুটআউট। তারপর সেই মুহূর্ত—মেসির দুই হাত ওপরে। বিশ্বকাপ তাঁর হাতে। যে ট্রফিটি নিয়ে এত বছর প্রশ্ন ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত তার মুঠোয়। সেই বিশ্বকাপে তিনি শুধু চ্যাম্পিয়ন হননি; জিতেছিলেন গোল্ডেন বল, অর্থাৎ টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও।

কিন্তু তাঁর আন্তর্জাতিক মুকুট তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। ২০২৪ কোপা আমেরিকা। আর্জেন্টিনা আবার চ্যাম্পিয়ন। মেসির হাতে আবার ট্রফি। এর আগে ২০০৮ অলিম্পিক স্বর্ণপদক এবং ২০২২ ফিনালিসিমা-ও যোগ হয়েছে তাঁর আন্তর্জাতিক সাফল্যের তালিকায়। অর্থাৎ আর্জেন্টিনার হয়ে বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর অর্জন কেবল বিশ্বকাপেই থেমে নেই। তাঁর আটটি ব্যালন ডি’অর—ফুটবল ইতিহাসে ব্যক্তিগত সাফল্যের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। এ সংখ্যাটিও যেন এক ধরনের উত্তর। যারা একসময় প্রশ্ন করেছিল, ‘মেসি কি সত্যিই সর্বকালের সেরা?’—তাদের সামনে কোনো বক্তৃতা দেননি তিনি। শুধু মাঠে নেমেছেন। বল পেয়েছেন। আর ফুটবলকে নিজের ভাষায় কথা বলতে দিয়েছেন।

লিওনেল মেসির আসল পুরস্কার হয়তো কোনো ব্যালন ডি’অর নয়। কোনো গোল্ডেন বল নয়। কোনো বিশ্বকাপও নয়। তাঁর আসল পুরস্কার হলো—একটি জাতির কোটি কোটি মানুষের মুখে হাসি এনে দেওয়া। মেসি যখন গোল করেছেন, আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আয়ার্সের রাত ভেসেছে উল্লাসে। আর তার জন্মশহর রোসারিওতে মানুষ ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমেছে, আকাশি-সাদা পতাকা উড়িয়েছে, প্রিয় ছেলের গোলের আনন্দে মেতেছে। বাংলাদেশেরও কোনো ছোট্ট ঘরে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা কিশোর চিৎকার করে উঠেছে। ঢাকার কোনো ছাদে আকাশি-সাদা পতাকা উড়েছে। চট্টগ্রামের কোনো গলিতে রাতভর ফুটবল নিয়ে তর্ক হয়েছে। মেসির গোল তাই শুধু গোল ছিল না। তা ছিল দূরত্ব অতিক্রম করা এক আবেগ।

মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে ১২৫ বার গোল করেছেন। কিন্তু এমন অসংখ্য মুহূর্ত তৈরি করেছেন, যেগুলোর পাশে কোনো সংখ্যা বসানো যায় না। কোনো কোনো রাতে তিনি গোল করেননি। তবু ম্যাচ জিতেছে আর্জেন্টিনা। কারণ তিনি ডিফেন্স ভেঙেছেন। সতীর্থকে গোলের সামনে দাঁড় করিয়েছেন। খেলার গতি বদলেছেন। প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা বদলে দিয়েছেন। এমনকি তার উপস্থিতিই কখনো কখনো দুজন ডিফেন্ডারকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে অন্যদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে। এটাই মেসির জাদু—তিনি শুধু গোল করেননি; গোল হওয়ার পথ তৈরি করেছেন। আর এই কারণেই ১২৫ গোলের পাশে ৬৮ অ্যাসিস্টের সংখ্যাটিও গুরুত্বপূর্ণ। মেসির গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি হয়তো এখানেই।

লিওনেল মেসি একসময় আর্জেন্টিনার জন্য ‘অপূর্ণতা’ ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই মেসি-ই হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার ‘পূর্ণতা’। ম্যারাডোনার উত্তরাধিকার নিয়ে যে ছেলেটি একদিন জাতীয় দলের জার্সি পরেছিল, একসময় সেই ছেলেকেই নিজের উত্তরাধিকার তৈরি করতে হয়েছে।

এখন আর প্রশ্নটি মেসি ম্যারাডোনার চেয়ে বড় কি না—এটি নয়। প্রশ্নটিই অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনার এক মহাকাব্য। মেসি আরেক মহাকাব্য। দুটি মহাকাব্যের সৌন্দর্য তুলনায় নয়, স্মৃতিতে। আর আজ মেসি সেই স্মৃতির ভেতর ঢুকে গেলেন। ৩৯ বছর বয়সে। বাবা হোর্হে মেসিকে হারানোর শোকের মধ্য দিয়ে। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের পর দীর্ঘ ভাবনার শেষে।

মেসি বলেছেন, সিদ্ধান্তটি তাঁকে কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু সময় এসেছে—এবং নতুন প্রজন্মের জন্য জায়গা করে দেওয়াও জরুরি। কী আশ্চর্য এক বাক্য— ‘সময় এসেছে।’ ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম সত্য এটাই। সময় কাউকে ছাড়ে না। যে পা একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির ডিফেন্ডারকে পেছনে ফেলে যেত, সেই পায়েরও একদিন ক্লান্তি আসে। যে চোখ এক মুহূর্তে মাঠের ১০ জন খেলোয়াড়ের ভেতর দিয়ে পাসের রাস্তা দেখতে পেত, সেই চোখও একদিন বলে—এবার থামো।

কিন্তু থামা মানেই শেষ নয়। মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ফুটবল থেকে নয়। ইন্টার মায়ামির হয়ে তিনি এখনও মাঠে থাকবেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি আর তার শরীরের সঙ্গে থাকবে না। এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় শূন্যতা। আগামি কোনো এক রাতে আর্জেন্টিনা খেলবে। ১০ নম্বর জার্সি পরে নতুন কোনো তরুণ মাঠে নামবে। গ্যালারি চিৎকার করবে। হয়তো সে গোলও করবে। কিন্তু পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ অজান্তেই খুঁজবে একজনকে—বাঁ পায়ে বল। চোখ সামান্য নিচু। শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। চারদিকে তিনজন ডিফেন্ডার। তারপর— একটি ছোট্ট স্পর্শ। একটি শরীরী ভঙ্গি। একটি দৌড়। আর পৃথিবীর কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে যাওয়া। সেই মানুষটি আকাশি-সাদা জার্সিতে মাঠে আর ফিরবেন না। কারণ মেসির আন্তর্জাতিক অধ্যায় সত্যিই শেষ। কিন্তু কিছু খেলোয়াড় জার্সি খুলে রাখলেও ইতিহাস তাঁদের জার্সি খুলতে পারে না। কিছু গোল জালের ভেতর গিয়ে থেমে যায়। কিছু গোল মানুষের স্মৃতিতে গিয়ে বেঁচে থাকে। মেসির গোলগুলো সেই দ্বিতীয় ধরনের। তাই আজ তাঁকে বিদায় জানাতে গিয়ে মনে হয়— এটি একজন ফুটবলারের বিদায় নয়। এটি সেই ছেলেটির বিদায়, যে ফুটবলকে আবার কবিতা বানিয়েছিল।

একটি বল।
একটি বাঁ পা।
একটি আকাশি-সাদা জার্সি।
আর তার ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া এক মহাকাব্য।

মেসি বিদায় নিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে। কিন্তু ফুটবল মাঠে এখন থেকে যখনই কোনো অসম্ভব পাস দেখা যাবে, কোনো ডিফেন্ডারকে একা দাঁড়িয়ে অসহায় মনে হবে, কোনো ছোট্ট বাঁ পায়ের জাদুতে ম্যাচের ভাগ্য বদলে যাবে— কেউ না কেউ নিশ্চয়ই বলবে, ‘মেসির মতো!’ সেখানেই তো কিংবদন্তিরা বেঁচে থাকেন। ভালোবাসার আলিঙ্গন লিও। তোমার জার্সি তুলে রাখা হলো। কিন্তু তোমার গল্প নয়। তোমার গল্প এখন থেকে ফুটবলের-ই ইতিহাস।

আরও পড়ুন