২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এমপির শোডাউনে ভুয়া রোগী: সাংবাদিকদের ‘ব্লেড মারার’ হুমকি

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরিদর্শনের সময় অনিয়ম ও দুর্ভোগের সংবাদ প্রকাশ করায় দুই সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক সাবেক ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে।

আনোয়ারা উপজেলার সাবেক ছাত্রদল নেতা অহিদুল ইসলাম চৌধুরী (অহিদ) গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার দিকে একুশে পত্রিকার আনোয়ারা-কর্ণফুলী প্রতিনিধি জিন্নাত আয়ুবকে ফোন করে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। এ সময় তিনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘পোনচাই ব্লেট মাইরজ্জুম’ বলে ব্লেড দিয়ে আঘাত করার হুমকি দেন।

ফোন কলে অহিদ বলেন, ‘মেডিকেল অফিসারকে কোনো রোগী কোনো অভিযোগ দেয় নাই, শুধুমাত্র তুই সাংবাদিকের কাছে গিয়েছে।’ এরপর তিনি দম্ভের সাথে কলটি রেকর্ড করতে বলে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় হুমকি দিয়ে বলেন, ‘নেক্সট বারোত সরওয়ার নিজামউর বিরুদ্ধে উল্টঅ পোল্টঅ নিউজ গরিলি পোনচাই ব্লেট মাইরজ্জুম। রেকর্ডিং গর, আঁর নাম অহিদ, আঁরো বাড়ি চাতরী চৌমুহনী।’

সত্য তুলে ধরার এই সাহসী পদক্ষেপের জেরে ‘সি-প্লাস’র আনোয়ারা প্রতিনিধি মোহাম্মদ রেজাউল করিম সাজ্জাদকেও একইভাবে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন ওই সাবেক ছাত্রনেতা।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার। চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম সেদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে যান। তাঁর সঙ্গে থাকা শত শত নেতা-কর্মীর বিশাল বহরে হাসপাতালটি যেন মুহূর্তেই রাজনৈতিক জনসভায় পরিণত হয়। প্রটোকলের এই ভিড়ে সাধারণ রোগীদের চরম দুর্ভোগের বিষয়টি প্রথম একুশে পত্রিকায় তুলে ধরেন সাংবাদিক জিন্নাত আয়ুব। সংবাদটি জনসমক্ষে আসার পর থেকেই তাঁকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ ও হুমকি দেওয়া শুরু হয়।

পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন গণমাধ্যমকে পরিদর্শনের আড়ালে ঘটে যাওয়া আরেক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পায়। এমপির আসার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সকালে সেখানে চিকিৎসা নিতে ২৩ জন ভুয়া ‘রোগী’ ভর্তি হন, যারা এমপি চলে যাওয়ার পরপরই হাসপাতাল ছাড়েন। আনোয়ারার মাজারগেট এলাকার মো. আলমগীর ও পীরখাইন এলাকার মোহাম্মদ হোসেন সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ করেন, তাঁদের নির্ধারিত শয্যা থেকে সরিয়ে নতুন ওই ব্যক্তিদের তোলা হয়েছিল এবং এমপি চলে যাওয়ার পর তাঁরা নিজেদের শয্যা ফিরে পান।

সাংবাদিক জিন্নাত আয়ুব বলেন, ‘আমি একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে সবসময় সত্য ও জনস্বার্থের বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করি। আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরিদর্শনের সময় সাধারণ রোগীদের দুর্ভোগ ও অনিয়মের বিষয়টি সরেজমিনে দেখে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করেছি। এখানে আমার ব্যক্তিগত কোনো উদ্দেশ্য ছিল না; কেবল দায়িত্ববোধ থেকেই কাজটি করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংবাদ প্রকাশের পর আমাকে ফোন করে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও ব্লেড দিয়ে আঘাত করার হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা শুধু আমাকে নয়— সাংবাদিকতা পেশাকেই হুমকির মুখে ফেলেছে। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি গভীরভাবে মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন।’

এ বিষয়ে আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. মাহাতাব উদ্দীন চৌধুরী নিয়মিত রোগীদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, কিছু রোগী ফলোআপের জন্য ভর্তি হয়েছিলেন।

তবে এর আগে হাসপাতালে নেতা-কর্মীদের ভিড় ও রোগীদের দুর্ভোগ প্রসঙ্গে তিনি একপ্রকার অসহায়ত্ব প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, এমপি স্থানীয় হওয়ায় সামান্য অসুবিধা হলেও বিষয়টি মেনে নেওয়া ছাড়া তাঁর কিছু করার নেই।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগীর স্বজন জগদীশ দে তখন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, নিরিবিলি হাসপাতালটি সেদিন রাজনৈতিক সমাবেশের রূপ নিয়েছিল।

এদিকে ভুয়া রোগীর খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দেয়। ঘটনাটি ভাইরাল হওয়ার পর চাপে পড়ে সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম সিপ্লাস-এর অফিসে গিয়ে ঘটনার ব্যাখ্যা দেন।

তবে সাবেক ছাত্রদল নেতা অহিদের সাংবাদিককে হুমকির বিষয়টি একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে সংসদ সদস্যকে জানানো হলে তিনি এই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সাংবাদিকদের সহযোগিতা চান।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ