মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»
কক্সবাজারের উশু একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে ৮ হাজার জঙ্গী মাঠে কাজ করছে এমন তথ্য ২০১৫ সালের শুরুতে। ছয় বছর পার হলেও এদের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ দেশব্যাপী প্রশিক্ষনের টার্গেট নিয়ে বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত আছে এসব জঙ্গীদের। এ সংগঠনের মুষ্টেমেয় জঙ্গী ধরা পড়লেও ধরা ছোয়ার বাইরে রয়ে গেছে বিশাল অংশ। ২০১৫ সালে মাত্র তিন মাসের জন্য কক্সবাজারে থাকা উশু একাডেমী নামের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ঠিকানা ব্যবহার করে জঙ্গী সংগঠনটি পরিচালিত হচ্ছে এখন ঠিকানাবিহীন।
অভিযোগ রয়েছে, কক্সবাজার থেকে ২০১৪-১৫ সালে তিনমাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে পালানো জঙ্গীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গী হামলার নীলনক্সা তৈরি করেছে কিনা তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। তবে এরপর আর এদের বিষয়টি খতিয়ে দেখেনি বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তদন্তকারী সংস্থাগুলো। চরম দায়িত্বহীনতার মধ্যে দেশের তদন্তসংস্থা গুলো কাজ করায় ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজানে নির্মম জঙ্গী হামলার ঘটনা যেমন ঘটেছে তেমনি এরমাত্র ৫দিনের ব্যবধানে ঈদের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গী হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন অপরাধ বিশেজ্ঞরা।

কক্সবাজারের এই প্রশিক্ষণ একাডেমিতে আট হাজার সদস্যের প্রশিক্ষিত এসব জঙ্গীর মধ্যে রয়েছে মধ্য ও কম বয়সী তরুণীরাও। যারা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণীদের টার্গেট করেছে। ফলে জঙ্গীদের মধ্যে এখন মহিলা জঙ্গীর অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। বিপুল সংখ্যক এই জঙ্গী সদস্যদের প্রশিক্ষণের পর সনদও দেয়া হয় কিন্তু কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনও এদের খুঁজে না পাওয়ার কারনটি প্রশ্নবিদ্ধ।
আরো প্রশ্ন উঠেছে, ঐসময়কার কক্সবাজার জেলা পুলিশ, ডিএসবি, জেলা ডিবি ও সরকারী অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের দায়ীত্বহীনতা নিয়ে। তবে ঐ একাডেমী থেকে প্রশিক্ষিত হয়েছে প্রায় ৮ হাজার এমন তথ্য মিলেছে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারীতে হালিশহরের বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বিএসভবনে র্যাব সেভেনের অভিযানে। এ ধরনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তুলেছে জঙ্গীরা এমন তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। তবে এসব জঙ্গীদের রয়েছে নিজস্ব নেটওয়ার্ক। ঐ ঘটনার পর কক্সবাজারে উক্ত একাডেমির কোন হদিস মেলেনি র্যাবের অনুসন্ধানে। তবে র্যাবের ধারণা ছিল ঠিকানা গোপন রেখে জঙ্গীদের প্রশিক্ষণের এ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।
২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রামের হালিশহরের বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বিএস ভবন থেকে র্যাব সেভেনের সদস্যরা ৪ জঙ্গীকে গ্রেফতারের পর কক্সবাজারের উশু একাডেমীর বিষয়টি উঠে আসে। ৬ তলা আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়ে মাত্র দু’মাসে শক্তিশালী তাজা বোমা তৈরিসহ নানা ধরনের জঙ্গী হামলার প্রশিক্ষণ শুরু করে জঙ্গীরা। তখন জঙ্গীদের গ্রেফতারের ঘটনার পর র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ ঢাকা থেকে ছুটে এসে চট্টগ্রামে প্রেস ব্রিফিংও করেন। ঘটনাস্থলে তিনি এক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে জঙ্গীদের আটক, বোমা উদ্ধার এবং বোমা বানানো সম্পর্কে মিডিয়াকে জঙ্গীদের তৎপরতা অবহিত করেন। এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখা এবং যারা জড়িত তাদের সকলকে আইনের আওতায় আনার কথা বলা হলেও তা আর হয়নি। এরপর দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর পার হয়েছে উশু একাডেমির আর কারও অস্তি¡ত্ত পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জঙ্গী হামলার নীলনক্সা তৈরি করেছিল গ্রেফতারকৃত জঙ্গীরা । এর আগের দিন ১৯ ফেব্রুয়ারি হাটহাজারী থেকে গ্রেফতার হওয়া ১২ জঙ্গীর তথ্য মতে বাঁশখালির লটমনি পাহাড় থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্রসহ ৫ জঙ্গীকে গ্রেফতারের ঘটনার মধ্য দিয়ে হালিশহরের ঐ বাড়ির সন্ধান পেয়েছিল র্যাব।

অভিযানে র্যাব সদস্যরা ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল পর্যন্ত হালিশহর থানাধীন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ১৮ নং সড়কের বিএস ভবনের দিকে কড়া নজরদারি দেয়ার পর এক মহিলাসহ ৩ জঙ্গীকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা ছিল- কক্সবাজারের মগনামার পেকুয়া এলাকার মাওলানা আবুল কালামের ছেলে ফয়জুল হক ও মেয়ে রহিমা আক্তার, বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জের আবদুর রাজ্জাকের পুত্র আবদুল হাই ও জাহেদুল আলম জাহেদ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ৭৬টি তাজা বোমা, ৩০ প্রকারের বোমা তৈরির সরঞ্জাম, ১৫০ কেজি বিস্ফোরক দ্রব্য, ২৪ রাউন্ড শর্টগানের গুলি, বিপুল পরিমাণ ব্যাটারি, ভাল্ব, তার, ভাঙ্গা কাঁচ ও বেশকিছু জিহাদী বই। জিজ্ঞাসাবাদে জঙ্গীরা র্যাব সেভেনের ইন্টেলিজেন্স টিমকে জানিয়েছিল, দেশব্যাপী বোমা তৈরি ও নাশকতামূলক কাজের প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা সক্রিয় রয়েছে। বোমা তৈরি থেকে উপকরণ সংগ্রহ এবং অর্থের যোগানও রয়েছে তাদের।\
তারা বোমা তৈরীর জন্য ৬ বস্তাভর্তি স্টেনলেস স্টীলের প্রায় ৬ ইঞ্চি পরিমাণের কাটা পাইপ, পানির পাইপের দেড় ইঞ্চি পরিমাপের চকেট, এ্যালুমিনিয়ামের তৈরি পানির বোতল প্রায় ২শটি, বিভিন্ন ধরনের বোমা তৈরির জন্য বোতল, বোমা তৈরির পাউডার, গান পাউডার, জিংক, দস্তা, কাঁচ, পটাশসহ নানা উপকরণ সংগ্রহ করেছিল। এসব উপকরণ দিয়ে হাজার হাজার বোমা তৈরির প্রস্তুতি ছিল বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের জন্য।
এছাড়াও র্যাব সদস্যরা ঐ ভবন থেকে বেশকিছু জিহাদী বই, লিফলেট ও প্রশিক্ষণ সনদ উদ্ধার করেছিল।
এ প্রশিক্ষণ সনদের তথ্য অনুযায়ী কক্সবাজারের উশু নামের একটি একাডেমি সার্টিফিকেটও পাওয়া গেছে এ বাসায়। ২০১০ সালে কক্সবাজারের বীর শ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়াম সংলগ্ন লং টেনিস মাঠে জঙ্গী প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা উল্ল্যেখ ছিল ডাইরীতে। তবে এ সনদ অনুযায়ী ২০১৪ সালের নবেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনমাসব্যাপী জঙ্গী প্রশিক্ষণের উপর ডিপ্লোমা কোর্স প্রদান করা হয়েছে। সিলেটের হবিগঞ্জস্থ বাহুবল এলাকার মো. খালদুনুল ইসলামের ছেলে হাম্মাদুনের সনদসহ বেশ কয়েকটি সনদও উদ্ধার হয়। সিদ্দিকুল ইসলাম নামের কক্সবাজার উশু একাডেমির প্রধান কোচ সাক্ষরিত এসব সনদ প্রদানের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ হাজার। তিনমাসব্যাপী এ প্রশিক্ষণে জঙ্গীরা তাদের ভাষায় চানচুয়ান, দাউসু, গুনসু, জিয়ানসু, জিয়াংসু, নানসুয়ান, নান্দাও, নানগুন, তাইসিসুয়ান, তাইসি জিয়ান ও চানসা নামক বিভিন্ন ইভেন্টের উপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে উপর দেড়শ জঙ্গীকে প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদান করা হয়েছে ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি।

দেশব্যাপী নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সচেষ্ট থাকার কথা বললেও জঙ্গী আক্রমনের পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা তৎপরতা বেড়ে যায়। দেশব্যাপী অপতৎপরতা চালাতে জঙ্গীরা জনগণকে জানান দিতে বিভিন্ন সময়ে নাশকতার লিফলেট বিতরণ অব্যাহত রেখেছে। চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত জঙ্গীদের সন্ধান মিলেছে এমন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে সীতাকুন্ড, মীরসরাই, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা। তবে এসব এলাকায় র্যাবের ফোন নাম্বারও দেয়া হয়েছে জঙ্গীদের সন্ধানে। র্যাবের ইন্টেলিজেন্স টিম এ বিষয়ে সক্রিয় রয়েছে।
আরো জানাগেছে, ২০১৫ সালের র্যাবের ১৯ ফেব্রুয়ারি হাটহাজারীর আলীপুরের সুলতান আহমদ সড়কস্থ সাফিনা ভবন থেকে মাদ্রাসার আড়ালে পরিচালিত একটি জঙ্গী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এ অভিযানে ঐ ভবনের চতুর্থ তলায় থাকা মাদ্রাসার নামে গড়ে উঠা আল মাদ্রাসাতুল আবু বকর নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১২ জঙ্গীকে গ্রেফতারে বেরিয়ে আসে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য । ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে তারা চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জঙ্গী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সদস্য সংখ্যা ও নানা তথ্য প্রদান করেছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল একে-৪৭ রাইফেল প্রশিক্ষণের ভিডিও চিত্র, সিরিয়ায় আইএসআই-এর জঙ্গী প্রশিক্ষণ, আল নুসরা ট্রেনিং ভিডিও, আল কালেদার ট্রেনিং ভিডিও, হামাস ও হিজবুল্লাহ গেরিলার ট্রেনিং ভিডিও, আনসার উল্লাহ বাংলা টিমের প্রশিক্ষণ ভিডিও।

এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় থাকা এসএসএফ এর ট্রেনিং ভিডিও ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ভিডিও চিত্র পাওয়া গেছে তাদের কাছ থেকে। এছাড়াও গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন উড়োজাহাজ হাইজ্যাক করার ভিডিও, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিসহ দেশের উচ্চ পর্যায়ের মানুষদের অপহরণ ও নির্যাতনের ভিডিও চিত্র, ওসামা বিন লাদেন এবং আইমান আল জাওয়াহিরির বক্তব্য ও সাক্ষাতকার। আফগান যুদ্ধসহ বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলার দৃশ্য এ মাদ্রাসায় ভিডিও আকারে দেখিয়ে জঙ্গী প্রশিক্ষণ দেয়া হয় ।
এরপর ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঁশখালির লটমনি পাহাড়ে অভিযান চালায়। ঐ পাহাড়ের পাদদেশে ও চূড়ায় সেখানে গরুর খামারের আড়ালে চলছিল জঙ্গী প্রশিক্ষণ। সেখানে মাটির নিচে রাখা প্লাস্টিকের ড্রামে তিনটি একে-২২ রাইফেল, ৬টি বিদেশী পিস্তল, একটি রিভলবার, ৩টি দেশীয় তৈরি বন্ধুক, একে-২২ রাইফেলের ম্যাগজিন, ৯টি পিস্তলের ম্যাগজিন, ৭৫১ রাউন্ড গুলি, ৩টি চাপাতি, ২টি ওয়াকিটকি, কংফু বা মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের সরঞ্জামাদি, ১৪ জোড়া জঙ্গল বুট, ২ জোড়া সেনা বুট, ৪ জোড়া পিটি সু, ৫টি টর্চ লাইট, ৩৮ সেট প্রশিক্ষণ পোশাক উদ্ধারসহ ৫ জঙ্গীকে গ্রেফতার করা হয়।
বাংলাধারা/এফএস/এফএস












