মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক »
কক্সবাজারের কলাতলীতে পিডব্লিউডি’র আবাসিক এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে দেলোয়ার প্যারাডাইস। আবাসিক এই হোটেলের বিরুদ্ধে পিডিবি’র ১১ কেভি’র আওতায় থাকা মিটারের রিডিং জালিয়াতির অভিযোগ দীর্ঘ তিন বছরের। বিদ্যুতের অসাধু কর্মকর্তাদের অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে ও বিদ্যুত বিভাগের আইন অমান্য করে সরকারকে ফাঁকি দিচ্ছে জমির মালিক। ১০তলা ভবনের ৭২টি ফ্ল্যাটে চাইল্ড মিটার না লাগিয়ে সাব মিটার দিয়েছে কক্সবাজার পিডিবি’র নির্বাহী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলীরা।
অবৈধভাবে সাব মিটার দিয়ে ফ্ল্যাট মালিক থেকে গড় বিল আদায় করতো ভূমি মালিক। চট্টগ্রামস্থ বিদ্যুত ভবনের মাসিক বিদ্যুত বিলের তথ্য থেকে এসব অভিযোগ উঠে এসেছে দেলোয়ার প্যারাডাইসের মালিক দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। তিনি পিক আওয়ারকে অফপিক আর অফপিককে পিক আওয়ার দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ করছেন। তথ্য ফাঁস করায় ৪০ ফ্ল্যাট মালিকের বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে ভূমি মালিক দেলোয়ার হোসেন দীর্ঘ প্রায় তিন বছর। সরকার শতভাগ বিদ্যুতের দোহাই দিলেও খোদ কক্সবাজারের কলাতলীতে দেলোয়ার প্যারাডাইসের অর্ধেকে বিদ্যুত আছে আর অর্ধেকে নেই।
আরও অভিযোগ রয়েছে, এই ভবনের ২০১৮ ও ২০১৯ সালের পিডিবি’র বিল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জালিয়াতি করতে গিয়ে মিটার রিডার পিক আওয়ারে কম রিডিং আর অফ পিক আওয়ারে বেশি রিডিং দেখানো হয়েছে। ৩৮০ কিলোওয়াট বরাদ্দের আওতায় ২০১৯ সালে সেপ্টেম্বর মাসের বিলে পিক আওয়ারে ৭ হাজার ইউনিট ও অফ-পিক আওয়ারে ২০ হাজার ইউনিট বিদ্যুতের ব্যবহার দেখানো হয়েছে। আগস্টে ২ লাখ ৪১ হাজার টাকা, জুলাই মাসে মাত্র ১৫ হাজার ৪১৮ টাকা ও জুন মাসে ১ লাখ ৪০ হাজার ৪৯৭ টাকা বিল বকেয়া দেখানো হয়েছে। আবার সেপ্টেম্বর মাসের বিল দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজার ২৮৩ টাকা। মোট ৪ মাসের বিল দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৫১ হাজার ২১২ টাকা।

জালিয়াতির কারণে প্রশ্ন উঠেছে, এক মাসের বিলের সঙ্গে অন্য মাসের বিলের কোন সামঞ্জস্যতা নেই। ২০১৮ সালের জানুয়ারী থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২ বছরের বিল বিশ্লেষনে দেখা গেছে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে বিল মাত্র ২৪ হাজার ৪৯১ কিন্তু ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের বিল ৯৭ হাজার ৫২৬ টাকা। ২০১৮ সালের জুলাই মাসের বিল ১ লাখ ৮৭ হাজার ৩২৬ টাকা ও ২০১৯ সালের জুলাই মাসের বিল ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৯১৬ টাকা।
এদিকে, ২০১৯ সালের ২অক্টোবর ২০২২ সালের ২ এপ্রিল পর্যন্ত ৪০টি ফ্ল্যাটে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। এমনও অভিযোগ রয়েছে, ফ্ল্যাট মালিকদের ভোগান্তিতে ফেলে ফ্ল্যাট হাতিয়ে নিতে কৌশলে জিম্মি করেছে এই প্রতারক। আবাসিক এলাকায় বিলাসহুল স্থাপনা নির্মাণ করে কক্ষ হিসেবে ভাড়া দিচ্ছে প্রতারক দেলোয়ার। এমনকি ফ্ল্যাট মালিকদের ৪০টি ফ্ল্যাটও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায় ভূমি মালিক।

অপরদিকে, ডেভলপার প্রতিষ্ঠানকে ফ্ল্যাটের সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করে দেয়ার পরও রেজিস্ট্রেশন না দিয়ে নানা চক্রান্ত শুরু করেছে প্রতারক চক্র। বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ফলে ব্যবহারকারীরা বিদ্যুত ব্যবহার করতে পারছে না ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
এ ব্যপারে ২০১৯ সালের ৯ অক্টোবর জেলা প্রশাসনে অভিযোগ করা হলেও কোন লাভ হয়নি ৪০ ফ্ল্যাট মালিকের। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কক্সবাজার বিদ্যুত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বিধি মোতাবেক বিদ্যুত সংযোগ পুনঃস্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল নামকা ওয়াস্তে ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর। ওই নির্দেশনার প্রেক্ষিতে নির্বাহী প্রকৌশলী এ সংযোগ স্থাপনের জন্য উপসহকারী প্রকৌশলী মাহবুব আলমকে মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। জেলা প্রশাসন থেকে প্রেরিত অভিযোগকারীর অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী স্বাক্ষর করলেও এই দুই কর্মকর্তা প্রতারকের পক্ষ নিয়ে আদৌ কোন সংযোগ স্থাপন করেনি বলে অভিযোগ করেছেন ৩৮ ফ্ল্যাটের মালিক। এদিকে, এ ব্যাপারে কক্সবাজারে এসপি বরাবর ২০১৯ সালের ৯ অক্টোবর অভিযোগ করা হলেও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পুলিশ ম্যানেজ হয়ে যাওয়ায় প্রতারক চক্রান্ত করতেও ইতস্তত বোধ করছে না।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার পিডিবি’র এক প্রকৌশলী বাংলাধারাকে জানান, এইচটি লাইন থেকে মাদার মিটারের আওতায় চাইল্ড মিটার স্থাপনের নিয়ম রয়েছে। দেলায়ার হোসেন কি কারনে ৪০টি ফ্ল্যাটের বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন এ বিষয়ে তিনি জানেন না। তবে ২০১৯ সালে উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাহবুব আলমের সঙ্গে প্রতারক দেলোয়ারের সখ্যতা ছিল। ভূমি মালিকের অনুমতি ছাড়া চাইল্ড মিটার লাগাবে না পিডিবি। কিন্তু এই আবাসিক ভবনের বিপরীতে মাদার মিটারের আওতায় সাব-মিটার লাগিয়েছে। মাদার মিটার স্থাপনে ভূমি মালিককে আবেদন করতে হবে।
বিদ্যুত ভবন চট্টগ্রামের দফতর সূত্রে জানা গেছে, মাদার মিটারের আওতায় চাইল্ড মিটার লাগানোর নিয়ম রয়েছে। প্রতিটি চাইল্ড মিটারের আওতায় সরকার রাজস্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু দেলোয়ার হোসেন সাব মিটার বসানোর কারণে সরকার মিটারের লাইনরেন্ট যেমন পাচ্ছে না তেমনি ভ্যাটও আদায় করতে পারছে না। আবার এসব ফ্ল্যাট মালিকরা যে পরিমান বিদ্যুত ব্যবহার করতো তা থেকেও সরকার রাজস্ব আদায় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে সরকার ত্রিমুখী রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এদিকে, ভূমি মালিক সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিতে ও নিজের আয় বাড়াতে জালিয়াতির উদ্দেশ্যে সাব মিটার বসিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পার্শ্ববর্তী ভবন মালিকরা। আবার আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক হোটেল পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে এই ধুরন্ধরের বিরুদ্ধে। পিডিবির এক উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে মাসিক মোটা অঙ্কে ম্যানেজ করে নিয়ে পিক আওয়ারে কম ও অফপিক আওয়ারে রিডিং বেশি দেখিয়েও সরকারের রাজস্ব আত্মসাৎ করার মত অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আরো অভিযোগ উঠেছে, ভবনে মোট ৭২টি ফ্ল্যাট থাকলেও একটি মাদার মিটারের আওতায় ৭২টি সাব মিটার লাগানো হয়েছে । কিন্তু এই ভবনে ৭২টি সাব মিটার লাগিয়ে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে গড় বিল আত্মসাৎ করেছেন ভূমি মালিক দেলোয়ার হোসেন। ২০১৫ সাল থেকে এসব সাব মিটারের আওতায় হাতে লিখা বিদ্যুতের গড় বিল আদায় করেছেন এই প্রতারক। কিন্তু এই অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ করে বিদ্যুতের সরকারী বিল প্রায় সাড়ে ৬ লাখ বকেয়া ছিল ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
আরো জানা গেছে, কক্সবাজারের কলাতলীতে পিডব্লিউডি এর আবাসিক এলাকার ‘এ’ নং ব্লকে ১৩ নং হোল্ডিংয়ে গড়ে উঠেছে কনফিগার দেলোয়ার প্যারাডাইস নামের বিলাসবহুল আবাসিক ভবন। কনফিগার ডেভলপারর্স লিমিটেড এই ভবন নির্মাণ করেছে। এ ভবনে নীচতলার পার্কিং স্পেস ছাড়াও মোট ৭২টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এরমধ্যে ভূমি মালিক হিসেবে দেলোয়ার হোসাইন ৩২টি ও ডেভলপার প্রতিষ্ঠান কনফিগার এর মালিক খোরশেদ আলম অপুর ৪০টি ফ্ল্যাটের মালিকানা রয়েছে। ডেভলপার প্রতিষ্ঠানের ৪০টি ফ্ল্যাট বিভিন্ন নির্দায় সাফ কবলা মালিকানায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু সময়ের নয়-ছয় দেখিয়ে নিরবিছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহের জন্য বসানো হয়েছে ১১ কেভির এইচটি লাইনের পাওয়ার স্টেশন। গ্রাহক নং-৮৩৮১২৮৮৩ এর আওতায় বসানো হয়েছে একটি মাদার মিটার যার নম্বর-২১৪০৮৩৯২৯।












