১৮ মার্চ ২০২৬

কক্সবাজারে ভাইরাস জ্বর ও ডায়রিয়ার প্রকোপ

সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার»

হেমন্তকাল অনুসারে দিনে হালকা গরম আর রাতে শীতল পরিবেশ থাকার কথা প্রকৃতিতে। কিন্তু বাস্তবতায় চলছে সব উল্টো। ভ্যাপসা গরমের মাঝে থেকে থেকে হঠাৎ বৃষ্টি। দিন-রাতে সমানতালে গরমে অতিষ্ট সময় পার হচ্ছে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার। গরম-ঠান্ডার মিশ্রণে জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া রোগের প্রকোপ বেড়েছে কক্সবাজারে। প্রায় প্রতিটি ঘরেই জ্বর-সর্দি-কাশির রোগী। বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। হাসপাতালগুলোতে বয়স্ক ও শিশু রোগীতে ভর্তি সব ওয়ার্ড। ২৫০ শয্যার কক্সবাজার সদর হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন রোগী ভর্তি থাকছেন ৫ থেকে ৭শ’ জন। আউটডোরে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন ৯শ’ হতে এক হাজার রোগী। এমনটি জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. সুমন বড়ুয়া।

ডা. সুমন বড়–য়ার মতে, গত প্রায় দুমাস ধরে সিজনাল ফ্লুতে (ভাইরাস জ্বর) আক্রান্ত হয়ে রোগীরা হাসপাতাল মুখী হচ্ছিলেন। কিন্তু চলতি মাসের শুরু হতে অস্বাভাবিক ভাবে বেড়েছে এর প্রকোপ। জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। ভর্তিকৃত রোগীর সিংহভাগই বয়স্ক ও শিশু। বয়স্কদের মাঝে বেশির ভাগই শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত। ফলে সবাইকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র মতে, কক্সবাজার সদর হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতালসহ বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডেও ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগীতে ঠাসা। গত এক সপ্তাহে আউটডোরে (বহির্বিভাগে) প্রায় ৩ হাজার নারী, ১৫৮০ জন পুরুষ ও ১২শ’ জন শিশু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এসব রোগীর মধ্যে জটিল রোগীদের ইনডোরে (আন্তর্বিভাগে) ভর্তি করা হচ্ছে। হাসপাতালের বেড ছাড়াও মেঝে ও বারান্দা চিকিৎসা নিচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। তাদের সঙ্গে নির্ঘুম রাত কাটছে মা-বাবা ও অভিভাবকদের। রোগীর চাপে সেবা দিতে গিয়ে কাহিল অবস্থা চিকিৎসকদের। হিমশিম খেতে হচ্ছে নার্স, আয়া এবং ওয়ার্ড বয়দেরও। প্রতি মুহূর্তে ভর্তি হচ্ছে নতুন রোগী। আক্রান্তদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং বয়স্ক রোগীর সংখ্যাই বেশি।

কক্সবাজার সরকারি মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, বিগত সময়ের চেয়ে চলতি বছরের এ সময়ে জ্বর, সর্দি, কাশিতে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। আউটডোরে চিকিৎসা নেয়াদের মাঝে যারা বেশি অসুস্থ তাদের ভর্তি দেয়া হচ্ছে। অনেক শিশুর জ্বর সহজে নামছে না। অ্যান্টিবায়োটিক, গ্যাস, অক্সিজেনসহ সব সেবা দিয়ে চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

কক্সবাজার শহরের মোহাজেরপাড়ার শাহাদত হোসেন নামে এক শিক্ষক বলেন, গত সপ্তাহ ধরে পরিবারের দু’শিশুসহ পুরো পরিবার জ¦রে আক্রান্ত। সবার জ¦র ১০১ থেকে ১০৩ ডিগ্রি। আমি ও আমার স্ত্রী তা সইতে পারলেও বাচ্চাগুলোর কাহিল অবস্থা হয়। চিকিৎসকরা নানা এন্টিবায়োটিক দেয়ার পরও জ¦র সারাতে বেগ পেতে হয়েছে আমাদের।

সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের পাওয়ার হাউস এলাকার মোহসেনা আক্তার বলেন, প্রথমে জ¦র ও পরে ডায়রিয়া আক্রান্ত হওয়ায় ৪ বছর বয়সী ছেলেকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি ১৫ অক্টোবর। হাসপাতালে সিট না পেয়ে শিশু ওয়ার্ডের বারান্দায় সেবা নেয়। দুদিন চিকিৎসার পর একটু ধরে এসছে পায়খানা, বর্তমানে সে কিছুটা সুস্থ।

খুরুশকুলের কুলিয়াপাড়ার হালিমা আক্তার নামে রোগীর স্বজন শাহেদ ফেরদৌস বলেন, গরমে কখনো শরীর থেকে ঘাম ঝরছে, আবার ফ্যান চালিয়ে ঘুমাতে গিয়ে  হেরফের হয়েছে শরীরে তাপমাত্রার। জ্বর-সর্দি-কাশি নিয়ে হাসপাতালে মাকে ভর্তি করেছি। সিট না পেয়ে ফ্লোরে চিকিৎসা নিচ্ছি।

বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) কক্সবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতিতে ঋতুর সহজাত যাত্রা নেই। ফলে ঠান্ডা আর গরমের মিশ্র প্রভাব এখন আবহাওয়ায়। যা অস্বস্তিকর প্রভাব ফেলেছে জনজীবনে। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে কখনো ঠান্ডা কখনো গরম ও বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হচ্ছে নানা বয়সি মানুষ। আগে যে সিজনাল ফ্লু’র চিকিৎসা দেয়া হতো সেই চিকিৎসায় এখন আর রোগ সারছে না। কাজ করছে না রোগের ধরণ অনুসারে নানা ধরণের এন্টিবায়োটিকে। পূর্বের পরিচিত রোগগুলো দিনদিন তার ধরণ পাল্টাচ্ছে। এন্টিবায়োটিকসহ নানার গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ উৎপাদনের সংশ্লিষ্টদের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ নেই বলে মনে হচ্ছে। ফলে, এসব ওষুধ প্রয়োগ হলেও কার্যকারিতা মিলছে না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী এক দশকে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে পরিচিত সব রোগগুলো। কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল ভোগ করছে পৃথিবীর মানুষ। তীব্র গরমের মাঝে হঠাৎ বৃষ্টিতে একটু ঠান্ডার পর আবার গরম-এমন পরিস্থিতির কারণে সিজনাল ফ্লুর প্রাদুর্ভাব বাড়ে। এসব রোগের বেশিরভাগই ভাইরাসজনিত। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কাশি, নাক দিয়ে পানি ঝরা, কিংবা জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলেই দ্রæত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

বাংলাধারা/এফএস/এফএস

আরও পড়ুন