সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার »
গত দু’দিন ধরে কক্সবাজারের সর্বত্র ভারী বর্ষণ চলছে। অতিবৃষ্টির ফলে ঈদগাঁওর ফুলেশ্বরী, চকরিয়ার মাতামুহুরি ও কক্সবাজারের বাঁকখালীতে নেমেছে পাহাড়ি ঢল। ঢলের তীব্রতায় ভেঙ্গে গেছে ঈদগাঁওর নদীর ফরাজিপাড়া মনজুর মৌলভীর দোকান এলাকার বাঁধ। ভাঙ্গনের পথে রয়েছে কবি নুরুল হুদা সড়কের বাঁশঘাটা অংশ। মহেশখালীর জনতাবাজার সড়ক ভেঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছ। পাহাড় বেয়ে নামা পানিতে তলিয়ে গেছে কক্সবাজার শহরের প্রধান ও উপসড়কগুলো। পানির সাথে ভেসে আসা নালার ময়লাগুলোতে একাকার হয়ে আছে পথঘাট। পানি ঢুকেছে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে।
বর্ষণ আর ঢলের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে বৃহত্তর ঈদগাঁওর পোকখালী ও ইসলামাবাদ এলাকার বেশ কিছু গ্রামের রাস্তা-ঘাট, বাসা-বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলে মাঠ। ভাঙ্গনের কবলে পড়ছে আভ্যান্তরীণ সড়কও। পানি প্লাবিত করছে জালালাবাদ, ঈদগাঁওর ভোমরিয়াঘোনা, চৌফলদন্ডী ও কালিরছরা এলাকার বিস্তৃর্ণ এলাকা। একই অবস্থা বিরাজ করছে কক্সবাজার হোটেল-মোটেলজোন, চকরিয়া, পেকুয়াসহ বেশ কয়েক উপজেলার নিম্নাঞ্চল। অনেক পরিবার রান্নার কাজ সারতে গিয়ে হিমশীম খাচ্ছে। গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে শতশত মানুষ।
মঙ্গলবার দুপুর থেকে শুরু হওয়া বর্ষণ বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত টানা চলছিল। এ সময় পর্যন্ত দুদিনের গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে প্রায় ১৭৬ মিলিমিটার। এরমাঝে বুধবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘন্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ২২৯ মিলিমিটার। আর মঙ্গলবার রাতে বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ১২৩ মিলিমিটার। এমনটি জানিয়েছেন কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের উচ্চ পর্যবেক্ষক আবু মহসিন।
থেমে থেমে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। ফলে ঢলের তীব্রতা বাড়ছে। এ কারণে নামতে পারছেনা সমতলের বৃষ্টির পানি। এতে পানি বন্দি হয়ে পড়ছে জেলার নিম্নাঞ্চলের শতাধিক গ্রামের কয়েক লাখ মানুষ। বৃষ্টিপাত আরো কয়েকদিন স্থায়ী থাকতে পারে। সমুদ্রে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস। সাথে পাহাড় ধ্বসেরও সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানায় আবহাওয়া সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বর্ষণ অব্যাহত থাকায় লোকালয়ে পানি ঢুকছে। প্লাবিত হচ্ছে কক্সবাজার শহরের হোটেল-মোটেল জোন, ঝিলংজার চান্দেরপাড়া, খরুলিয়া, দরগাহপাড়া, পোকখালীর মধ্যম পোকখালী, নাইক্ষংদিয়া, চৌফলদন্ডী, নতুনমহাল, ঈদগাঁও বাজার এলাকা, কালিরছড়া, রামুর উপজেলার ধলিরছরা, রশিদনগর, জোয়ারিয়ানালা, উত্তর মিঠাছড়ি, পূর্ব ও পশ্চিম মেরংলোয়া, চাকমারকুল, কলঘর, লিংকরোড়, চকরিয়া পৌরসভার বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। চকরিয়া পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের আমান চর, কাজির পাড়া,২নং ওয়ার্ডের জেলে পাড়া, হালকাকারা, মৌলভীর চর, ৩নং ওয়ার্ডের তরছ পাড়া, ও ৮নং ওর্য়াডের নামার চিরিংগা, কোচ পাড়া, ও ৯নং ওয়ার্ডের মৌলভীর কুমসহ অনেক স্থানে বাড়ি-ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। অপরদিকে, জোয়ারের পানির সাথে বৃষ্টির পানি ভোগান্তি বাড়িয়েছে উপকূলবাসীর।
ঈদগাঁও ইউনিয়নের ভোমরিয়াঘোনা এলাকার পল্লী চিকিৎসক মোস্তফা কামাল জানান, ভারী বর্ষণে ঈদগাঁও নদীতে তীব্র বেগে ঢল নেমেছে। বৃষ্টি আর ঢলের পানিতে একাকার হয়ে তলিয়ে গেছে বাড়িঘর এলাকার রাস্তাঘাট ও বিল। বিচ্ছিন্ন রয়েছে সড়ক যোগাযোগ। চরম দুর্ভোগে রয়েছে হতদরিদ্ররা।
জালালাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ওসমান সরোয়ার ডিপো বলেন, ঢলের তীব্রতায় জালালাবাদ মনজুর মৌলভীর দোকান এলাকার বেডিবাঁধ ভেঙ্গে বিশাল এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বাড়ন্ত পানি নিম্ন এলাকার বাড়ি ঘরে প্রবেশ করছে। ভোগান্তি বেড়েছে অগণিত মানুষের। এখানকার দুর্বল বেড়িবাঁধটি মেরামতে গতবছর বরাদ্দ এলেও চেয়ারম্যান কোন অদৃশ্য কারণে তা মেরামত না করায় এখন অধিবাসীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা জামিরুল ইসলাম জানান, ভারী বর্ষণে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। জনতাবাজার সড়কটি ভাঙ্গনের কবলে পড়ে বিচ্ছিন্ন হয়েছে যোগাযোগ।
কোনাখালী ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল হক সিকদার ও বিএমচর ইউপি চেয়ারম্যান এসএম জাহাংগীর আলম বলেন, তাদের ইউনিয়নে হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ জানান, উপজেলার বরইতলী ও কাকারা ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এভাবে টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পাহাড় ধস ও নদী ভাঙ্গনের আশংকা রয়েছে । উপজেলায় ১৮ ইউনিয়নের হারবাং, বরইতলী, কৈয়ারবিল, বিএমচর, কাকারা, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, ও খুটাখালি ইউনিয়নে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত জনসাধারণকে বন্যা, পাহাড় ধস ও ভাঙ্গন মোকাবেলায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে নিরাপদ স্থানে সরে আসার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ভারী বর্ষণে চরম আতংকে রয়েছে উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় পাহাড়ে বসতি গড়া লাখ লাখ রোহিঙ্গারা। ক্যাম্প এলাকায় ইতোমধ্যে বেশ কিছু বাড়ি ও রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এ আতংক সর্বময় ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে, অতিবর্ষণে পাহাড় ধ্বস বা যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে স্থানীয়দের রক্ষার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিংসহ সব ধরণের ব্যবস্থা নেয়া রয়েছে বলে জানান কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন।
বাংলাধারা/এফএস/টিএম/এএ












