সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার »
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে অকস্মাৎ ভেসে এসেছে বিপুল পরিমাণ মদের খালি বোতল, প্লাস্টিক বর্জ্য, ছেঁড়া জাল ও সামুদ্রিক কাছিম। শনিবার (১১ জুলাই) দিনের জোয়ারে এসব বর্জ্য তীরে এসে জমেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে এত বিপুল পরিমাণ বর্জ্য কোথা থেকে এলো তা কেউ আবিস্কার করতে পারেনি। এনিয়ে পরিবেশ প্রেমীদের মাঝে বিরাজ করছে চরম উদ্বেগ।
সৈকতের কলাতলীর সায়মন বীচ হতে দরিয়ানগর পর্যন্ত এলাকায় স্তূপ হয়ে থাকা আবর্জনার বিষয়টির ক্লো বের করতে এবং সৈকত তীর পরিষ্কার বীচ কর্মীরা কাজ করছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন। এসব বর্জ্যরে তেজস্ক্রীয়তায় অনেক সামুদ্রিক কাছিম মারা পড়ছে এবং অজ্ঞান হয়ে তীরে এসে ভিড়ছে। অজ্ঞান কাছিমগুলো উদ্ধার করে আবার সমুদ্রে অবমুক্ত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় অধিবাসী রাশেদুল আলম রিপন জানান, শুক্রবার বিকেলেও স্থানীয়রা কলাতলী বীচের বেলি হ্যাচারি এলাকায় ফুটবল খেলেছে। সন্ধ্যার পরই সবাই বাড়ি ফিরে। তখনো সেখানে কিছুই ছিল না। কিন্তু শনিবার (১১ জুলাই) সকালের জোয়ারে সমুদ্র উপকূলের দিকে ভেসে আসতে থাকে মদের বোতল, প্লাস্টিক বর্জ্য। রাত বাড়ার সঙ্গে তীরে ভেসে এসে জমে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদের বোতল, প্লাস্টিক বর্জ্য, ছেঁড়া জাল। এসব জালে পেঁচানো অবস্থায় রয়েছে সামুদ্রিক কাছিমও। আবার কিছু কাছিম এমনিতে। অজ্ঞান অবস্থায় ভেসে এসে সৈকতে তীরে জড়ো হচ্ছে।
সমুদ্রে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা স্থানীয় আবদুর রহিম, লিয়াকত আলী, ইব্রাহিমসহ অনেকেই জানান, গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারে গিয়ে আমরা দেখেছি বিশালাকারের শীপ (জাহাজ) মাদারসহ নানা ধরণের মাছ ধরে। জাহাজে অবস্থান করাদের সিংহভাগই বিদেশি। যারা মদসহ নানা মাদক নিয়মিত সেবন করে। সেসব জাহাজগুলোতে গৃহস্থালি নানা ধরণের পণ্য ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের জাহাজ একটি নয়, অসংখ্য থাকে। এসব জাহাজের অবস্থান করা লোকজন খাওয়ার পর মদের বোতলসহ অন্যান্য ব্যবহার্য আবর্জনাগুলো নিজেদের গার্বেজে জমা রাখে। আমাদের ধারণা হয়তো তারাই নিজেদের আবর্জনাগুলো জোয়ারের আগে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয় এবং সেগুলো জোয়ারের তোড়ে তীরে এসে জমেছে।
ইনানীর মনখালী এলাকার বাসিন্দা ওয়াহিদুর রহমান বলেন, বর্ষায় পাহাড়ী ছরা দিয়ে নানা ধরণের আবর্জনা সৈকতে নামে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু যে আবর্জনাগুলো এখন এসেছে এখনো মনুষ্যসৃষ্ট। মদ খাওয়া লোকজন তাদের বর্জ্যগুলো অমানবিক ভাবে প্রকৃতিতে ছেড়ে দিয়েছে। মিয়ানমার জলসীমায় থাকা তাদের জাহাজে করেও এনে এসব আবর্জনা সমুদ্রে ছেড়ে দিয়ে থাকতে পারে। আবার কক্সবাজারে অবস্থানকরা আইএনজিও, এনজিওর অনেক কর্মকর্তা-কর্মজীবীকে দেখা যায় মাদক সেবন করতে।
‘কেউ কেউ বারে গিয়ে খেলেও লকডাউনের কারণে বারে যেতে পারেনি কেউ। তারা নিজেদের মতো করে সংগ্রহ করে মদ খাওয়ার পর খালি বোতলগুলো জমিয়ে হয়তো কোন নদীর মোহনায় ফেলেছে। জোয়ারের জল ভাসিয়ে নিয়ে দরিয়ানগর, কলাতলী ও হিমছড়ি সৈকতে এনে জড়ো করিয়ে গেছে। মেরিন ড্রাইভের প্যাঁচারদ্বীপ এলাকায় একটি ইকো রিসোর্টে নানা ধরণের মদ পরিবেশন করা হয়ে থাকে বলে প্রচার রয়েছে। তাদের জন্য সমুদ্রটা-ই ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা অতিসহজ বিষয়। এদিকেও গভীর নজর নিয়ে গোপনে তদারক করা যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।’
কক্সবাজার বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, আমরাও হতবাক। ভেসে আসা বর্জ্যে গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্য ও মদের বোতল বেশি। স্থানীয়রা ব্যবহার অনুপযোগী গৃহস্থালী পণ্যগুলো হয়তো পুড়িয়ে ফেলে বা বিক্রি করে দেয়। এভাবে তারা তা সৈকতে ফেলার কথা নয়। আমরাও সৈকতে অবস্থান করা কোন বড় জাহাজ এসব বর্জ্য ফেলেছে বলে ধারণা করছি। এরপরও এর আদ্যপান্ত বের করতে চেষ্টা চালাচ্ছে আমাদের টিম। রোববার সকাল থেকে বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির কর্মীরা আবর্জনা পরিষ্কার কাজ করছে।
সেভ দ্যা ন্যাচার অব বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান আ ন ম মোয়াজ্জেম হোসাইন বলেন, আমাদের ২০০ নটিক্যাল সমুদ্র সীমায় পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। বিদেশি জাহাজ থেকে আমাদের জলসীমায় বর্জ্য ফেলার অভিযোগ থাকলেও সরকার কখনও তাদের শনাক্ত বা শাস্তির আওতায় আনতে পারেনি। যা সমুদ্র দূষণ ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) কনভেনশনের লঙ্ঘন। তাই আমাদের এখন সমুদ্র কমিশন গঠন করে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা উচিৎ।
বাংলাধারা/এফএস/টিএম/এএ












