১৩ মার্চ ২০২৬

করোনায় কোটি টাকা ক্ষতির মুখে চট্টগ্রামের পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য চাষীরা

তারেক মাহমুদ » 

মহামারি করোনাভাইসের প্রভাবে সারাদেশে লকডাউন চলছে। মানুষ বাইরে বের না হয়ে ঘরেই অবস্থান করছেন। এতে করে জনমানব শুন্য রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার। এজন্য দোকানপাট বন্ধ থাকায় পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের কোন সুযোগ না থাকায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন চট্টগ্রামের পোলট্রি, দুগ্ধ খামারি ও মৎস্য চাষীরা। দৈনিক প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এ তিন শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার প্রভাব অব্যাহত থাকলে পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য শিল্পে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। ফলে দেশের অনেক খামারির টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে জানা গেছে- কর্ণফুলী, পটিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, ফটিকছড়ি উপজেলায় প্রায় ১৬শ ডেইরি খামার রয়েছে। প্রতি খামার থেকে গড়ে প্রতিদিন ১০০ লিটার দুধ উৎপাদন হলে সে হিসাবে চট্টগ্রাম জেলায় প্রতিদিন ১ লাখ ৬০ হাজার লিটার দুধ উৎপাদন হয়। তাছাড়া গৃৃহপালিত গরু থেকেও পাওয়া যায় আরো প্রায় ১ লাখ লিটার দুধ। স্বাভাবিক সময়ে দুধের পাইকারি কেজি মূল্য ৫০ থেকে ৬০ টাকা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্ধেক মূল্যেও উৎপাদিত দুধের অর্ধেক বিক্রি হচ্ছে না বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রিজওয়ানুল হক বলেন, কিছুটা গুজব এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে উৎপাদিত দুধ বিক্রি হচ্ছে না। তবে সংকট কাটাতে সরকার অন্যান্য ত্রাণসামগ্রীর সঙ্গে মিল্ক ভিটা কারখানায় প্রস্তুতকৃত গুঁড়াদুধ বিতরণের উদ্যোগ নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে মিল্ক ভিটা কারখানায় কাঁচা দুধের উপযোগিতা সৃষ্টি হবে। যেখানে কাঁচামাল হিসেবে ডেইরি ফার্মের উৎপাদিত দুধ সরবরাহ হবে।

চট্টগ্রাম জেলা ডেইরি ফার্ম এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. নাঈম উদ্দিন বলেন, বর্তমানে দুধের বাজার একেবারেই নেই। ২০-২২ টাকা লিটার মূল্যে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান দুধ কিনে ছানা তৈরি করে রাখছে। খামারিরা দুধের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। এতে করে তারা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আবার গো খাদ্য ও ওষুধের দামও বেশি। সবমিলিয়ে এক ভয়াবহ অবস্থা। ডেইরি শিল্পকে বাঁচাতে সরকারকে প্রণোদনা দিতে হবে।

এ ব্যাপারে হিরো ডেইরি ফার্মের স্বত্বাধিকারী মো. মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ফার্মের উৎপাদিত দুধ অর্ধেক দামেও বিক্রি করা যাচ্ছে না। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনকে দুধ খাওয়াচ্ছি। গো খাদ্য, ওষুধের দাম বেড়ে গেছে। করোনার কারণে ভয়াবহ এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে, চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় করোনার থাবায় ক্ষতির মুখে পড়েছে ৯শ’ পোলট্রি খামারি, এক’শ ডেইরি খামারি ও ৫’শ মৎস্য খামারী। বিক্রি না থাকায় কোটি কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়ছেন বলে দাবি করছেন তারা।

করোনায় ক্ষতির মুখে পড়েছে চট্টগ্রামের মৎস্যজোন হিসেবে পরিচিত মুহুরী মৎস্য প্রকল্পের প্রায় ৫ শতাধিক মৎস্য চাষী। চট্টগ্রামের মাছের চাহিদার ৭৫ ভাগ মাছ সরবরাহ করা হয় এখান থেকে। বছরে প্রায় ৫শ’ কোটি টাকা লেনদেন হয়। করোনাভাইরাসের কারণে মাছ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হবে চাষীদের।

মিরসরাই উপজেলা পোলট্রি এসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আলাউদ্দিন জানান, উপজেলায় ছোট বড় মিলে প্রায় ৯শ’ খামারি রয়েছেন। এমনিতে এবছর খামারিদের অবস্থা ভালো না। রোগবালাই লেগেই আছে। মেডিসিনের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি। এখন মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে অচলাবস্থা থাকায় হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বিয়েসহ সব অনুষ্ঠানাদি বন্ধ থাকায় খামারিরা মুরগী নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

উপজেলার মধ্যম ওয়াহেদপুর এলাকার খামারি মো: মোশারফ হোসেন বলেন, এতোদিন মুরগীর মূল্য কম ছিল, এখন লকডাউন অবস্থায় মুরগী নিয়ে কোথায় যাবো? খরচ তোলা তো দুরে থাক, কিভাবে শ্রমিকদের বেতন দেবো বুঝতে পাচ্ছি না।

মিরসরাই ডেইরি ফার্মাস এসোসিয়েশনের সভাপতি মো: হেদায়েত উল্লাহ বলেন, দেশের এমন পরিস্থিতিতে আমাদের মরণের অবস্থা হয়েছে। উপজেলায় ছোট বড় প্রায় ১শ ডেইরি খামার রয়েছে। এসব খামারে প্রতিদিন ৪ হাজার লিটার দুধ উৎপাদন হয়। বেশির ভাগ খামারি উৎপাদিত দুধ মিষ্টির দোকানে বিক্রি করে থাকেন। কিন্তু করোনার কারণে অন্যান্য দোকানের ন্যায় মিষ্টির দোকানও বন্ধ। তাই খামারিরা দুধ বিক্রি করতে পারছেন না। খুচরা যারা দুধ কিনতেন তারাও বের হচ্ছেন না ঘর থেকে।

মিরসরাই উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. শ্যামল চন্দ্র পোদ্দার বলেন, করোনাভাইরাসের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শতাধিক ডেইরি ও ৮শ ছোট বড় পোলট্রি খামারি। সব কিছু বন্ধ থাকার কারণে ডেইরি খামারে উৎপাদিত দুধ ও পোলট্রি খামারে উৎপাদিত মুরগী সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। তবে ফার্মের মুরগীর মাংসে করোনার সংক্রামক রয়েছে বলে গুজব উঠেছে। ফার্মের মুরগীর মাংসতে করোভাইরাসের কোনো সংক্রামক নেই।

বাংলাধারা/এফএস/টিএম

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ