জে.জাহেদ, কর্ণফুলী »
কবি বলেছিলেন, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’। সত্যিই তাই। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলা বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডে চেহারায় পাল্টে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে অবৈধ বিলবোর্ড জুড়ে বাহারি বিজ্ঞাপনের ‘রঙীন ব্যানার’।
প্রশাসনের ও অভিযোগ, এ্যাড এজেন্সি গুলো কোন অনুমতি ছাড়াই উপজেলা জুড়ে এসব বিলবোর্ড বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। এর মধ্যে বৈধ বিলবোর্ডের সংখ্যা কতটি তা জানা না গেলেও অবৈধ বিলবোর্ডের সংখ্যা কিন্তু প্রচুর।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কিছু রাজনৈতিক বিলবোর্ড, সুজুকি, বিএসআরএম, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, কেওয়াই স্টিল, সজিব কর্পোরেশন এর মেক্স স্টপ ফায়ার, এস আলম সিমেন্ট, ডায়মন্ট সিমেন্ট, ইএসআরএম, কেএসআরমের সৌজন্য কিছু ট্রাফিক পুলিশের ব্যানার ও বিলবোর্ডে ছেয়ে রয়েছে।
দেখা যায়, প্রতিটি সড়কের ডিভাইডার, মোড়, বাসার ছাদ, দেয়াল ও গাছ সহ বিভিন্ন স্থানে ছোটবড় বিলবোর্ড বসানো হয়েছে। এর কোনোটি স্টিলের ঝালাই করা বড় বোর্ডে লাগানো আবার কোনোটি কাঠ দিয়ে তৈরি। এসবের বেশির ভাগই অনুমতি ছাড়াই স্থাপন করা হয়েছে বলে উপজেলা সুত্রে জানা যায়।
লাখ লাখ টাকার এসব অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেই। যদিও বিলবোর্ড সৌন্দর্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। শুধু সৌন্দর্যের প্রশ্নই নয়, ভাষারুচি ও উৎকট রঙের বাড়াবাড়িও চোখে পড়ার মতো। যা দেখে অল্প বয়সীরা নেতিবাচক ভাবে প্রভাবিত হয়।
বৈদ্যুতিক খুঁটি ও নানা স্থাপনায় অবৈধ বিলবোর্ড-ব্যানার ও ফেস্টুন সাঁটানো হয়েছে। এসব বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে শহরের প্রবেশদ্বার কর্ণফুলী উপজেলার মহাসড়ক। এ ধরনের বড় বড় অবৈধ বিলবোর্ড ও ফেস্টুনের আলোকউজ্জ্বল প্রতিবিম্বে মহাসড়কে যানবাহন চালকেরা ও অতিষ্ট। অনেক সময় বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে দূর্ঘটনা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রধান সড়ক গুলোতে সাঁটানো বিলবোর্ড ও ফেস্টুনগুলোর মধ্যে ব্যক্তি উদ্যোগে রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের পাশাপাশি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন-সংবলিত প্রচারমূলক বিলবোর্ড বেশি দেখা গেছে।
প্রতিটি বিলবোর্ডের মূল্য বছরে ২/৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানায়। সে হিসেবে শাহ আমানত তৃতীয় সেতুর দক্ষিণ পাড় হতে শিকলবাহা ক্রসিং হয়ে ফকিরনিরহাট রাস্তার মাথা পর্যন্ত বহু বিলবোর্ডের মূল্য দাঁড়ায় অর্ধ কোটি টাকার কাছাকাছি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারের রাজস্ব খাতে এসব টাকার অংশ যোগ না হলে তাহলে বিলবোর্ডের আয় যাচ্ছে কার পকেটে? কারাই বা জড়িত এসব ব্যবসায় সাথে তার বিস্তারিত এখনো অন্দরমহলে। আরো জানা যায়, সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) জায়গায় এসব বিলবোর্ড বসানো হলেও ইহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোন ভূমিকা রাখছে না সংস্থাটি। ফলে এসব সংস্থা রাজস্ব হতে বঞ্চিত হচ্ছে।
অন্যদিকে নতুন উপজেলা হিসেবে পরিষদে অর্থ সংকটে রয়েছে। অর্থের অভাবে অনেক প্রকল্প ও কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারছে না উপজেলা প্রশাসন। বিলবোর্ড হতে যথাযথভাবে অর্থ আদায় করতে পারলে স্থানীয় সরকারের এসব সংস্থা কিছুটা হলেও স্বাবলম্বী হতে পারত। কেন না নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য উপজেলা প্রশাসনকে বারবার নিজস্ব আয় বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়।
সর্বৈব এসব বিলবোর্ড কারা স্থাপন করে এ বিষয়ে কোন সুত্র না পেলেও মইজ্জ্যারটেক মোড়ে টুল প্লাজার বিপরীতে বিলবোর্ডে একটি জিপি নাম্বার পাওয়া যায়। টু-লেইট কিংবা বিজ্ঞাপনে আগ্রহীরা যোগাযোগ করতে পারেন বলে নাম্বারটি দেওয়া। তাতে যোগাযোগ করলে আগ্রাবাদ যোগাযোগ করতে বলেন।
আগ্রাবাদ কোথায় যোগাযোগ করবো সেটা জানতে চাইলে মুঠোফোনে এক ব্যক্তি জানান, যারা বিজ্ঞাপন দেয় তারা জানে কিভাবে কোথায় আসতে হয়। এই বলে ফোনের লাইন কেটে দেন। এতে স্পষ্ট বুঝা যায়, এসব অবৈধ বিলবোর্ডের কাজকর্ম কিংবা ব্যবসাও কতটা বিচিত্র!
উপজেলার অনেকেই বলছে টাঙানো বিলবোর্ডের অধিকাংশই মানহীন, ক্ষেত্র বিশেষে চরমভাবে অশৈল্পিক। ঝুঁকিপূর্ণ তো বটেই। পথচারীর মাথার ওপর বিলবোর্ড ভেঙ্গে পড়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে। যদিও উপজেলায় সৌন্দর্য বাড়ায় শিল্পিত বিলবোর্ড। শুধু ব্যবসায়িক কারণে রুচি ও সৌন্দর্যকে বিসর্জন দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিলবোর্ড স্থাপন না করে অনেকে মইজ্জ্যারটেক মোড়ে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু’র ম্যুরাল স্থাপনেরও কথা জানান।
এদিকে প্রচলিত আইন হলো, যেকোনো ধরনের সরকারি-বেসরকারি জায়গায় বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপন বোর্ড অথবা সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হলে নির্ধারিত ফি দিয়ে কতৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়। এরপর স্থাপিত বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপন বোর্ডের বিপরীতে প্রতি বছর সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নির্ধারিত হারে কর দিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে এ আইন মানছে না বলে বৈধ বিলবোর্ডের চেয়ে অবৈধ বিলবোর্ডের সংখ্যা বেশি। বছরের পর বছর ধরে এসব অবৈধ বিলবোর্ড বৈধ কাঠামোর আওতায় না আসার কারণে বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
সরকার বঞ্চিত হলে নিশ্চয়ই কোন না কোন মহলের পকেট ভারি হয়। যেখানে অবৈধ কাজ-কারবার সেখানে নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনা সংস্থার অসাধু কর্মচারী-কর্মকর্তাদের সংযুক্ত থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই সরকারের বিশেষ মনিটরিং কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারে।
উপজেলার সংবাদকর্মী মোহাম্মদ ইয়াকুব বলেন, ‘বিলবোর্ড লাগিয়ে উপজেলার সৌন্দর্য নষ্ট করা ঠিক নয়। অনেক বিলবোর্ড বিদ্যুৎ এর খুটির উপর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার সৈয়দ শামসুল তাবরীজ বাংলাধারাকে জানান, ‘বিলবোর্ড গুলো যেহেতু আমাদের নজরে এসেছে আগামী জেলা প্রশাসনের মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। সেই সাথে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বাংলাধারা/এফএস/টিএম












