চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার জুলধা ইউনিয়নের তিনটি সরকারি বড় খাস পুকুর থেকে মাছ তুলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার নেতৃত্বে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগাভাগি করার অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, নীতিমালা অনুসরণ না করে গোপনে এসব মাছ বণ্টন ও বিক্রি করায় গরিব ও অসহায় মানুষ বঞ্চিত হয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গতকাল বুধবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত একটানা জাল বসিয়ে ওই তিন পুকুর থেকে কাতাল, কোরাল, রুই, লাইলোটিকা, কালো গুনি, শোল, টেংরা, মলা ও চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৯–১০ মণ মাছ তোলা হয়। এর মধ্যে কিছু মাছ নিলামে বিক্রি করা হলেও অবশিষ্ট উল্লেখযোগ্য অংশ উপজেলা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাছ ভর্তি বস্তা গাড়িতে করে উপজেলা সদরে নেওয়া হয়। যার নেপথ্যে ছিলেন মৎস্য কর্মকর্তা। পরে সেখান থেকে বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তার বাসায় বাসায় মাছ পাঠানো হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা প্রশাসনের তিনজন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জানা গেছে, উপজেলা পরিষদের বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প (এডিপি) বরাদ্দের অর্থে প্রতিবছর এসব পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, খাস পুকুরের মাছ উত্তোলনের পর তা নিলামে বিক্রি করে অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া অথবা দরিদ্র, দুঃস্থ ও এতিমখানায় বিতরণের বিধান রয়েছে। তবে এ বছর সে নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
মাছ উত্তোলনের সময় উপস্থিত ছিলেন কর্ণফুলী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল আলীম, সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা, জুলধা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সাবেক সচিব) মিলটন চৌধুরী, জুলধা ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহসিলদার) অরুণ বাবু এবং স্থানীয় কয়েকজন গ্রাম পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলার দুই কর্মচারী বলেন, “উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই মাছ তোলা হয়। পরে এগুলো কর্মকর্তা ও স্টাফদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। কয়েকজন নিতে অনীহা প্রকাশ করলেও অধিকাংশই মাছ নিয়েছেন।”
এ বিষয়ে জুলধা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সাবেক সচিব) মিলটন চৌধুরী বলেন, “এটি আমার ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে নয়; এটি উপজেলা পরিষদের কাজ। উপজেলা থেকে মৎস্য কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি এসে শুধু আমার সহযোগিতা নিয়েছেন। জুলধা তহসিলদারও উপস্থিত ছিলেন। তিনটি পুকুর থেকে মাছ তুলে প্রকাশ্যে নিলামে প্রায় ৬৬ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করা হয়েছে। আর কিছু টেংরা মাছ চৌকিদারদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে হয়তো কেউ পেয়েছে, কেউ পায়নি।”
জুলধা ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহসিলদার) অরুণ বাবু বলেন, “উপজেলা থেকে মৎস্য কর্মকর্তা, জুলধা ইউপি সচিবসহ অনেকেই সেখানে যান। তিনটি খাস পুকুর থেকে মাছ তোলা হয়েছে। মাছ উত্তোলনের দায়িত্ব ছিল মৎস্য কর্মকর্তা ও ইউপি সচিবের তাঁরাই ভালো জানেন কত মণ মাছ তোলা হয়েছে এবং কত টাকার মাছ বিক্রি হয়েছে। যদিও জমিটি আমার অধিক্ষেত্রভুক্ত। তিনটি পুকুরের মধ্যে মাঝের একটিতে তেমন মাছ ছিল না। কিছু লাইলোটিকা ও টেংরা মাছ হয়তো ভাগবাটোয়ারা হয়েছে এটুকুই বলতে পারি। আমাকেও সামান্য মাছ দেওয়া হয়েছিল, তবে আমার স্টাফরা কিছু পায়নি।”
কর্ণফুলী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল আলীম জানান, “ইউএনওর নির্দেশে ওই এলাকার পুকুরে জাল দেওয়া হয়েছে। তিনটি পুকুর থেকে নিলামে প্রায় ৬৬ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করা হয়েছে, যা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা।” তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ নিলামের বাইরে কিছু মাছ ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে এবং মাছ উত্তোলনের ক্ষেত্রে লিখিত কোনো অনুমতি ছিল কি না এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, “সরকারি খাস পুকুর সরাসরি আমাদের আওতাভুক্ত নয়। বিষয়টি খোঁজ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে মৎস্য কর্মকর্তা সেখানে গিয়েছিলেন বলে তিনি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে আপনারা ইউএনও ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সঙ্গে কথা বলতে পারেন। বিষয়টি তাঁরাই দেখভাল করেন।”
তবে নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকায় এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সরকারি খাস পুকুর থেকে মাছ ধরার আইনি ও নৈতিক বিশ্লেষণে আইনজীবী আবু তৈয়ব জানান,
“খাস পুকুর ব্যবস্থাপনা মূলত ভূমি প্রশাসনের এখতিয়ার। ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ও জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী খাস জলাশয় ইজারা, সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হয়। সরকারি অর্থে পোনা অবমুক্ত করা পুকুরের মাছ ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া আইনসঙ্গত নয়।”
অন্য সূত্রের দাবি, এডিপি বা সরকারি প্রকল্পের অর্থে উৎপাদিত মাছ হলো রাষ্ট্রীয় সম্পদ। তা নিলামে বিক্রি করে অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা অথবা সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে বিতরণ করতে হয়। অননুমোদিত ভাগ-বাটোয়ারা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যা দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা (সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ) এবং সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধিমালা অনুযায়ী গুরুতর অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
লিখিত অনুমতি ও স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক। ইউএনও-ডিসির লিখিত অনুমোদন, নিলামের বিজ্ঞপ্তি, বিক্রয় রসিদ ও কোষাগারে জমার চালান না থাকলে পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো নৈতিকতার সংকট।
যে প্রশাসন গরিব ও অসহায় মানুষের স্বার্থ রক্ষার কথা, সেই প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগতভাবে ভোগের অভিযোগ উঠলে তা শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, মানুষের আস্থা ও প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
দরকার স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা করা, মাছ বিক্রির অর্থের হিসাব প্রকাশ করা এবং ভবিষ্যতে খাস পুকুর ব্যবস্থাপনায় স্পষ্ট নির্দেশনা ও গণনজরদারি নিশ্চিত করা। ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের হস্তক্ষেপের দাবি সাধারণ মানুষের।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট কর্ণফুলীতে প্রায় ৮ একর আয়তনের ৬টি সরকারি খাস পুকুর অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার করেন তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) পীয়ূষ কুমারী চৌধুরী। সে সব পুকুরে সরকারি অর্থে পোনা অবমুক্ত করা হয়। সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণের দায়িত্ব প্রশাসনের হলেও সাম্প্রতিক এই ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে বিস্ময় ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।













