চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার জুলধা ইউনিয়নের প্রধান সড়কটি যেন এখন দুর্ভোগের আরেক নাম। প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার পর সড়কে ইটের খোয়া ফেলে কাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এরপর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে তিন বছর। এখনও কাজের উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কটি কাদামাটির ভাগাড়ে পরিণত হয়। শুকনো মৌসুমে ধুলাবালির কারণে চলাচল দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থী, রোগী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, পথচারী এবং বিভিন্ন শিল্প-কারখানার শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও শুধু ইটের খোয়া ফেলে রেখে কাজ অসমাপ্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৪ হাজার ৪৬০ মিটার (প্রায় ৫ কিলোমিটার) দীর্ঘ এ সড়কটি ১৮ ফুট প্রশস্ত করে উন্নয়নের জন্য ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কাজটি টেন্ডারে পায় মেসার্স মোহাম্মদ এরফানুল করিম (এরফান) নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত মাত্র ৬০০ মিটার কার্পেটিং এবং প্রায় ২ কিলোমিটার মেগাডাম করা হয়েছে। এছাড়া সড়কের অধিকাংশ অংশের প্রশস্তকরণের (ওয়াইডেনিং) কাজ শেষ হলেও প্রায় ১৫০ মিটার অংশ এখনও বাকি রয়েছে। ইতোমধ্যে ঠিকাদার ১ কোটি ২১ লাখ টাকা বিল উত্তোলন করেছেন।
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির টেন্ডার হয় ২০২৪ সালের ৬ মার্চ। কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। পরে ঠিকাদারের আবেদনের পর সময় বাড়িয়ে ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্ট মাসেও কাজের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
কর্ণফুলী উপজেলা এলজিইডির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ঠিকাদারের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি একাধিকবার জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানানো হলেও দীর্ঘদিন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তারা আরও জানান, বর্তমানে জুলধা ইউনিয়নের বিএনপি নেতা মো. ইব্রাহিম পূর্বের ঠিকাদারের সঙ্গে সমন্বয় করে অবশিষ্ট কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন।
এ বিষয়ে মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘মূল ঠিকাদার কাজ না করায় এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে আমরা তার সঙ্গে কথা বলে কাজটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি।’
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব সরোয়ার জামাল নিজাম বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন এবং এলজিইডিকে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার তাগিদ দিয়েছেন। এছাড়া ঠিকাদার মোহাম্মদ এরফানুল করিমের পক্ষে সমর মিত্র নামের একজনও কাজটি সমন্বয়ের চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে সড়কটির কাজ বন্ধ। বর্ষায় কাদা, আর শুকনো মৌসুমে ধুলাবালির কারণে স্বাভাবিক চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
স্থানীয় মহিউদ্দিন ও সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, রোগী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী— সবাই প্রতিদিন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রিদুয়ানুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি। জনস্বার্থে দ্রুত সড়ক উন্নয়নের কাজ শুরু করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
চট্টগ্রাম জেলা এলজিইডির নবনিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানব। ঠিকাদারের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’














