৪ মার্চ ২০২৬

কুবিতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ; দায় এড়ানোই যেন প্রশাসনের দায়িত্ব

কুবি প্রতিনিধি »

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারি কিংবা শৃঙ্খলাবিরোধী কাজের ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ঘটনারই প্রশাসনিকভাবে কোনো বিচার হয় না। অভিযোগ না আসার দোহাই দিয়ে গত দুই বছরে সংঘটিত এসব কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি।

এমনকি এসব বিষয়ের সালিশ-মীমাংসার ভার ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাদের হাতে তুলে দিয়েই দায় এড়াচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসাশন।

এক্ষেত্রে প্রশাসন বলছে, সংঘর্ষ-মারামারির ঘটনায় তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লিখিত অভিযোগ পান না। যার ফলে নিতে পারেন না প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছাত্র সংসদ না থাকার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘ছাত্র প্রতিনিধি’র নাম দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে এসব ঘটনার মীমাংসার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনকে । ফলে মীমাংসা হচ্ছে নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতায় । সালিশের নামে মারধরের অভিযোগও আছে তাদের বিরুদ্ধে।

গত পহেলা মার্চ রাতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এমরান কবির চৌধুরীর বাসভবনের সামনের রাস্তায় সংঘর্ষে জড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের দুই পক্ষ। এতে আহত হন ২ জন। বন্ধ ক্যাম্পাসে এমন সংঘর্ষে জড়ানোর ঘটনাতেও নির্বিকার কুবি প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. কাজী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন এই ঘটনাতেও মীমাংসার ভার ছেড়েছেন ‘ছাত্র প্রতিনিধিদের!’ হাতে।
অথচ গণমাধ্যমকে দেয়া বক্তব্য অনুসারে দুই পক্ষের সাথে মিমাংসায় বসার কথা ছিল প্রোক্টরিয়াল বডির কিন্তু মীমাংসায় উপস্থিত ছিল না বডির কেউই ।

এদিকে মীমাংসার নামে অভিযুক্তকে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কর্তৃক মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিচারের নামে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজ বলেন, ‘মারধর করা হবে কেন? ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দিক থেকে নিজেদের মাঝে কেউ বিবাদে জড়ালে আমরা বিধি-নিষেধ দেই কিংবা মুচলেকা নেই। মারধর করবো কেন!’

বিগত কয়েক বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ে শাখা ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে বেশ কিছু মারামারি ও সাধারণ শিক্ষার্থী বা ভিন্নমতের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর ক্যাম্পাসে হামলার ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘটনারই কোনো বিচার হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদের ভেতর শিক্ষার্থী যুগলকে অপ্রীতিকর অবস্থায় দেখার অভিযোগে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের মারধরের ঘটনারও কোনো সুরাহা হয়নি। বিচার হয়নি সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়ার ঘটনাতেও।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের বক্তব্য ছিলো, ‘আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি । অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷’

প্রশাসনিক বিচার না হলেও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ ঠিকই সালিশে বসেছেন এসব ঘটনা নিয়ে। অভিযোগ আছে, কোনো ভুক্তভোগী হামলার শিকার হলে ছাত্রলীগের ভয়েই তারা প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ দেন না। তাদের চাপেই তারা মীমাংসার পথ বেছে নেন।

তবে সাধারণ শিক্ষার্থীর ওপর হামলার মীমাংসার ভার এভাবে ছাত্রলীগ নিতে পারে কিনা জানতে চাইলে শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি বলেন, ‘নিজেদের কর্মীদের ভেতর ভুল বোঝাবুঝি হলে তা নিয়ে আমরা বসতেই পারি। আর যে ভিক্টিম সে তো প্রশাসনের কাছে যায়নি। আমাদের কাছে যদি কেউ আসে তাহলে আমরা তো ছাত্র প্রতিনিধি! হিসেবে দায় এড়াতে পারি না। চেষ্টা করি সমাধানের।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব ঘটনার প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ আর এভাবে বিচারের দায় এড়ানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. কাজী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো? যে মারধরের শিকার হলো, সে যদি এসে বলে আমি তো অভিযোগ দেই নাই। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে হয়েছে, তখন আমার উত্তর কি হবে? আর ছাত্রদের সমস্যার সমাধান যদি ছাত্ররা করে, তাহলে আমাদের সেখানে ইন্টারফেয়ার করা কি উচিত? কার হাতে ছেড়ে দিচ্ছি সেটা বিষয় না, বিচার পেলো কি না সেটাই বিষয়।’

অভিযোগের অভাবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ড নিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এমরান কবীর চৌধুরী বলেন, ‘প্রশাসন কিছু করতে চাইলে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ আসতে হবে তো। প্রত্যেকটা সরকারি জিনিস একটা নিয়মশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে হয়। অভিযোগ আসলে তার ভিত্তিতে ঠিক করা হবে কোন পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হবে, কোন ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে৷ স্বাক্ষী-প্রমাণ দিয়ে বিচার করতে হয়। নয়তো কোর্টে গিয়ে উল্টো হয়ে যায়। আমাদের এমন কিছু খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। তাই আমাদের কোনো কিছু করতে হলে আমাদের কাছে অভিযোগ আসতে হবে।’

বাংলাধারা/এফএস/এআই

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ