৩০ মার্চ ২০২৬

‘ক্ষুধার জ্বালা লকডাউন মানছে না’

কক্সবাজার প্রতিনিধি »

‘গত ৬ দিন আগে ৫ কেজি চাউল, এক কেজি ডাল, ২ কেজি গোল আলো পেয়েছিলাম। ৫ সদস্যের সংসারে তিনদিন ধরেই ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলাম। টাকাও নেই, বাজারও নেই-নেই কোন সহযোগিতাও। ১০ টাকার চাউল বিক্রি হচ্ছে শুনে ধার করে তা নিতে আসলাম। ক্ষুধার জ্বালা লকডাউন মানছে না।’

কক্সবাজার পৌরসভার রুমালিয়ারছরায় সরকারের ১০ টাকার চাউল বিতরণ প্রকল্পে চাউল নিতে আসা দক্ষিণ রুমালিয়ারছরার কর্মজীবী আবদুল হালিমের স্ত্রী নুর জাহান এসব কথাগুলো বলেন।

শুধু তিনি নন, তার মতো আরো অর্ধশতাধিক নুর জাহান ১০ টাকার চাউল সংগ্রহ করতে ডিস্ট্রিভিউশন সেন্টারে ভীড় করেন। সবার বাড়িতেই প্রায় অভিন্ন ক্ষুধার সমস্যা রয়েছে বলে জানান তারা। তবে, ক্ষুধার যন্ত্রণা পেটে থাকলেও বাইরে কাউকে বলাটা লজ্জার বলেই মনে করেন এসব দুর্ভোগ তাড়িত মানুষগুলো।

স্থানীয় আবদু রশীদ জানান, অনেকদিন ধরেই ১০ টাকার চাল বিক্রি হয় এখানে। করোনার সময় শুরুর পরও বিতরণ হয়েছে। কিন্তু রোববারের (১২ এপ্রিল) মতো সাড়া দেখা যায়নি। লম্বা লাইনে নারী-পুরুষ উভয়েই ভিড় করছেন। করোনার ভয় তাদের মনে দাগ কাটতে পারছে না। তাদের নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখতে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ব্যস্ত সময় পার করতে হয়েছে।

কক্সবাজার পুরো লকডাউন ঘোষণার ৪দিন অতিবাহিত হয়েছে রোববার। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে পরিবারে নিরাপদ থাকতে প্রশাসন থেকে বার বার প্রচারণা চালানো হচ্ছিল। পর্যটন স্পটসহ জেলার সকল কর্ম ক্ষেত্র বন্ধ করে দেয়া হলেও প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছিল কেউ অভুক্ত থাকবে না। প্রশাসনই বাড়ি বাড়ি খাবার পৌছে দিবেন। সেভাবেই এগুচ্ছিল সব।

অতিউৎসাহি কিছু আত্মপ্রচারপ্রিয় ব্যক্তি প্রশাসনের লেজুড়ভিত্তি করে ত্রাণের পুটলা মাথায় নিয়েছিল। নিজেদের স্বেচ্ছাসেবী জাহির করে বলয় কিংবা এলাকার বগলের কিছু মানুষকে ত্রাণ পেতে সহায়তা করলেও মধ্যবিত্ত ও আত্মসম্মানে অবিচল পরিবারগুলোতে কোন ত্রাণই পৌছেনি। ফলে চরম দুর্ভোগে সময় পার করছেন সিংহভাগ পরিবার। অনেকে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের হট লাইনে নক করেও সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। সীমাহীন দুর্ভোগে পরিবার নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন পরিবহন শ্রমিকরাও।

এসব কথা উঠে এসেছে ওয়াহিদ রুবেল ও তুষার তুহিনসহ অনেকের ফেসবুক স্ট্যাটাসেও। ওয়াহিদ রুবেল লিখেন, বিভিন্ন উপজেলা থেকে শনিবার পরিচিত অনেকে ফোন করে জানিয়েছেন প্রশাসনের দেয়া ফোন নাম্বারে এসএমএস কিংবা কল করার পরও সহযোগিতা পাচ্ছে না। মাঝে মধ্যে নাম পরিচয় নেয়া হচ্ছে। পরে ফোন করলে বলা হয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বারদের সাথে যোগাযোগ করতে। যদি তা-ই করতে হয় তাহলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মানুষের সাথে মশকরা করার কি ছিল? সরকারের তো পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে। সহযোগিতা সরকারের পক্ষ থেকে সকলের জন্য দেয়া হবে। তারা ঐ সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারতো। ভাল থাকুন, ভাল রাখুন..

নিজেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত দাবি করে তুষার তুহিন লিখেন, ‘এই শহরে আমাদের (নিম্ন মধ্যবিত্ত) খবর রাখছে না কেউ। গোপনে জানানোর পরও সাড়া দিচ্ছে না সংশ্লিষ্ঠরা। অথচ শুনছি সাংবাদিকদের স্ট্যাটাস দেখেও নাকি ত্রান পৌছে দিচ্ছে তারা। ভাই এ কেমন রসিকতা।” কথাগুলা যদিও বা আমাকে বলেছে আমার পরিচিত এক ছোটভাই। তার কন্ঠেই যেন ঝরলো আমার মনের ক্ষোভ।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহরের পাহাড়তলীর ইসলামাবাদ এলাকার এক কর্মজীবী জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মাইকিংয়ে প্রচার করা হয়েছিল, অভাবের কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসন কিংবা পুলিশ প্রশাসনের হটলাইনে কল বা এসএমএস দিলে দ্রুত সহায়তা পৌছে যাবে সংশ্লিষ্ট পরিবারে। কিন্তু গত ৮ তারিখে আমার ১০ সদস্যের পরিবারের দূর্ভোগের কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসনের হটলাইন নাম্বারে এসএমএস দেয়া হলেও ১১ এপ্রিল বিকাল ৫টা পর্যন্তও কোন সহযোগিতা আসেনি।

শহরের রক্ষিত মার্কেট এলাকার আরেক ব্যক্তি জানান, এলাকার খেটে খাওয়া ৫ জন মানুষের দুরাবস্থার কথা উল্লেখ করে তাদের নাম-মোবাইল নাম্বার ও পরিবারের সদস্য সংখ্যাসহ পুলিশ প্রশাসনের হটলাইনে এসএমএস করা হয় ৩০ মার্চ। ১১ এপ্রিল বিকাল ৫টা পর্যন্ত সেসব ব্যক্তিগণও কোন ধরণের সহযোগিতা পাননি।

হটলাইনে নক করার পরও ত্রাণ না পাওয়া এবং সামগ্রিক ত্রাণ তৎপরতা নিয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুল আফসার বলেন, করোনা দুর্যোগে কেউ অভুক্ত থাকবে না, এটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা। সেভাবে আমরা কাজ করছি। সবাইকে শতভাগ খুশি করা কষ্টসাধ্য। কয়েক ক্যাটাগরীর তালিকা হচ্ছে। যাছাই বাছাইয়ের পর সবার কাছে একবার হলেও ত্রাণ যাবে এ নিশ্ছয়তা দেয়া যায়। হট লাইনে এসএমএস আসলে- তাও যাছাই করে ব্যবস্থা নেয়া হয়। আমাদের মতো আমরা সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছি।

এদিকে, কক্সবাজার সরকারি মেডিকেল কলেজে স্থাপিত ল্যাবে রোববার (১২ এপ্রিল) ৩২ জনের করোনা টেস্ট হয়েছে। সবারই নেগেটিভ ফল এসেছে বলে জানিয়েছেন মেডিকেলের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. অনুপম বড়ুয়া। ২ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ল্যাবে শনিবার পর্যন্ত ১৪৬ জনের করোনা পরীক্ষার ফলও নেগেটিভ আসে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

রোববার পর্যন্ত ১৭৮ জনের পরীক্ষার ফল নেগিটিভ আসে এবং ওমরাহ ফেরত ও শৃংখলা বাহিনীর একজনের নমুনায় করোনার প্রাথমিক পজেটিভিটি পাওয়ার পর তারা এখন সুস্থ এবং আর কারো করোনা পজিটিভ সনাক্ত হয়নি বলে দাবি করেছেন কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, কক্সবাজারে ঘোষণা কৃত লকডাউন বাস্তবায়নে মাঠে কঠোর ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে সেনাবাহিনী ও পুলিশসহ শৃঙ্খলাবাহিনী।

বাংলাধারা/এফএস/টিএম/এএ

আরও পড়ুন