২৬ মার্চ ২০২৬

ঘুরে আসুন কুমিরা সমুদ্র সৈকতে

মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»

চট্টগ্রামের কুমিরা এলাকায় পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কুমিরা সমুদ্র সৈকত এক সময় কেউ না চিনলেও বর্তমানে প্রেক্ষাপট পাল্টে গেছে। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হারালেও কুমিরা সমুদ্র সৈকত প্রকৃতির সাজে সজ্জিত হচ্ছে ক্রমান্বয়ে। কিন্তু সরকারি হস্তক্ষেপের অভাবে সমুদ্র উপকূলীয় এ এলাকাটি অবহেলিত হয়ে পড়ে রয়েছে। কুমিরা সমুদ্র পাড় থেকে শুরু করে বাড়বকুন্ড পর্যন্ত পুরো এলাকা জুড়ে এখন দর্শনার্থীদের ভিড় জমে পড়ন্ত বিকেলে। তবে নিরাপত্তাহীনতার কারণে পর্যটকরা অনেকটা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে সমুদ্রের বিশালতায় যেতে হয়।

কুমিরা সমুদ্র সৈকত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে খুবই কাছে। ছোট কুমিরা নেমে বেবি টেক্সিতে শেয়ারে অথবা সরাসরি যেতে পারেন পর্যটকরা। এ সড়ক দিয়ে মাত্র ২ কিলো পাড়ি দিলেই পৌঁছে যাওয়া যায়। একই সাথে অগোছালো পরিবেশে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। সমুদ্রের জোয়ার ভাটার খেলা দেখা যায় খুব সহজে। একসময় জোয়ারের পানি চলে আসতো মানুষের ঘরের ভিটেতে। আর ভাটা হলে পানি চলে যায় কয়েক কিলো দূরে। তবে বেড়িবাঁধের কারনে এখন আর তা হয়না। তবে বেড়িবাঁধ থেকে জোয়ার ভাটার এই পরিবর্তন দেখে পর্যটকরা অবাক হয়। কারণ জোয়ারের পানিতে যখন পুরো এলাকা ছেয়ে যায় তখন নবাগতরা মনে করেন এ এলাকায় বন্যা চলছে। অথচ মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে পানি যখন ভাটার টানে নেমে যায় তখন অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, মাটি হয়ে যায় অনেকটা পানিবিহীন নিস্প্রাণ। আবার সতেজতা ফিরে আসে জোয়ারে। ফিরে যায় ভাটায়।

পাহাড়তলীর জিরো পয়েন্ট অলংকার মোড় থেকে লোকাল বাস বা লেগুনাতে যাওয়া যায় ছোট কুমিরা। এরপর টেক্সিতে সাইক্লোন সেন্টার। সেখান থেকে পায়ে হেঁটেও যাওয়া যায় কুমিরা সমুদ্র সৈকতে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্য দিয়ে হলেও প্রকৃতিকে ছুঁয়ে দেখতে এলাকার সাধারণ মানুষরা যেমন পড়ন্ত বিকেলের সময়টুকু কাটাতে সেখানে ভিড় জমান। তেমনি আশপাশের এলাকা থেকেও দূরত্ব কম হওয়ার কারণে ক্লান্তির অবসর সময়টুকু কাটাতে চলে যান কাট্টলী সমুদ্র সৈকতে।

পাহাড়তলী, হালিশহর ও পতেঙ্গা থানা কেন্দ্রিক এ সমুদ্র সৈকত এখন অনেকটাই নিরাপদ। তবে কুমিরা অংশটুকু পরিপাটি হলেও অযতেœ অবহেলায় পড়ে রয়েছে সীতাকুন্ড থানার এ উপকূলীয় অংশটুকু। তবে এখানে নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন আগতরা। এলাকায় পুলিশের নজরদারি তেমন একটা চোখে পড়ে না। বাঁধের পরেই অনেক দূর উঁচু নিচুতে হেঁটে পানির নাগাল পাওয়া যায় কুমিরা সমুদ্র সৈকতে। পতেঙ্গা এলাকায় সৈকত বালুকমায় হলেও কাট্টলী ও কুমিরা সমুদ্র সৈকত কিন্তু কর্দমাক্ত। জোয়ারের পানিতেই বেড়িবাঁধ থেকে সমুদ্রের পানির ধারা পর্যন্ত ছোট ছোট গর্তে পরিণত হয়েছে। জোয়ারের পর ভাটা নেমে আসলে এসব গর্তে খুঁজে পাওয়া যায় কাকড়া আর সামুদ্রিক ছোট বড় মাছ।

এ কাকড়া আর মাছকে ঘিরে গড়ে উঠেছে জেলে পাড়া। স্থানীয়রা বিশেষ করে জেলে পাড়ার লোকজন এই সমুদ্র সৈকতে ঘিরে অনেকটা লাভবান হলেও পর্যটকদের জন্য অনেকটা ভোগান্তি চলাফেরায়। কারণ অনেকটা লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে হয় এ এলাকায়। কোথাও উঁচু আর কোথাও-বা নিচু। সমতলের দেখা মেলে না। ফলে হাতে হাত ধরে পর্যটকদের যেতে হয় পানির নাগালে। কুমিরা সমুদ্র সৈকত পর্যটকদের জন্য পরিপাটি করে গড়ে তোলা গেলে বিনোদনে আরেকটি স্পট পরিচ্ছন্নতায় তৈরি হবে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ও জাইকার অর্থায়নে এই এলাকার বেড়িবাঁধটি রিং রোডে পরিণত হবার কথা। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আলোর মুখ দেখছে না নানা জরিপের কারণে। সম্ভাবনার এ দ্বারটি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা গেলে পর্যটকের ভিড় যেমন সামলানো যাবে না তেমনি ভাসমান ব্যবসায়ীদের পদচারণাও বেড়ে যাবে। এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে বাঁধ নির্মাণের পর সরকারি ব্যবস্থাপনায় ব্যবসাকেন্দ্র তৈরি করা গেলে রাজস্ব আদায়ের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে।

১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলীয়দের রক্ষা করতে গিয়ে সীতাকুন্ড থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে উঁচু করে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এ বেড়িবাঁধ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল ৯১’ এর জলোচ্ছ্বাসের পুনরাবৃত্তি ঘটলে যেন স্থানীয়রা রক্ষা পান। কিন্তু সরকারের এ উদ্যোগ দীর্ঘ ৩১ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। কারণ বেড়িবাঁধের নামে যে বাজেট বরাদ্দ হয়েছিল তা কয়েক দফায় সাবাড় করেছে অসাধু সরকারি আমলারা। বাঁধ প্রত্যক্ষ করলে দেখা যায়, এ বাঁধ গাড়ি চলাচলের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হলেও কার্যকর হচ্ছে না এখনও। তবে মানুষের হাঁটাচলার উপযুক্ত ছাড়া এ বাঁধ এখন ময়লা আবর্জনার স্তুপে ভরা। কিছু কিছু জায়গায় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে।

এদিকে, চট্টগ্রামের জিরো পয়েন্ট নিউ মার্কেট এলাকা থেকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। আর কুমিরা সমূদ্র সৈকতের দূরত্ব ২৮ কিলোমিটার। কিন্তু শহুরে চালচলনে আর মোটরযানের জ্যামে পড়ে পর্যটকরা পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে যেতে অনেকটা বিড়ম্বনার শিকার হন। ফলে অনেকে এখন পতেঙ্গা সৈকত এলাকায় না গিয়ে অবসর সময় কাটানোর জন্য চিন্তাভাবনা করছেন কুমিরা সৈকতে পাড়ি জমাতে। অবকাঠামোগত তেমন উন্নয়ন না হলেও এ সৈকতে পর্যটকদের ভিড়ে তিল ধারণার ক্ষমতা থাকে না সরকারি বন্ধের দিনগুলোতে। সন্ধ্যার পর নিরাপত্তাহীনতার কারণে সৈকত এলাকা ছেড়ে যান পর্যটকরা।

আরও পড়ুন