কক্সবাজার প্রতিনিধি »
কক্সবাজার শহরের কলাতলী বাইপাস সড়কের চন্দ্রিমা হাউজিংয়ের পাশে সাবেক এক সরকারী কর্মচারির বাসভবনের দেয়াল ও টাইলস গুঁড়িয়ে দিয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)। তবে কউকের দুই কর্মকর্তার দাবিকৃত দু’লাখ টাকা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে তারা এই ভাঙচুর অভিযান চালিয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর।
বুধবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুরে সিরাজুল হকের বাড়িতে এ ভাঙচুর অভিযান চলে। নির্মাণাধীন ওই ভবনের ৫টি কক্ষের দেওয়াল ও ফ্লোরের লাগানো টাইল্স ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এতে কমপক্ষে ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের।
ঘটনার আকস্মিকতায় মানসিকভাবে আঘাত পেয়ে স্ট্রোক করেছেন গৃহকর্তা সিরাজুল হকের স্ত্রী ইসলাম খাতুন (৭০)। তিনি বর্তমানে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ভুক্তভোগী পরিবারটির অভিযোগ, কউকের চিহ্নিত দুই কর্মকর্তা নাছির ও ডেভিড চাকমার দাবীকৃত দু’লাখ টাকা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে তারা এই ভাঙচুর অভিযান চালিয়েছে।
ক্ষতির শিকার সিরাজুল হকের ছেলে বেলায়েত হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ২০১৫ সালের শেষের দিকে ইন্জিনিয়ার প্লানিং মতে আমাদের নিজস্ব জমিতে ছোট্ট একটি মাথাগুজার ঠাঁই নির্মাণ শুরু হয়। পৌরসভার কাছে হলেও ঝিলংজা ইউনিয়নের জমি হওয়ায় জেলা প্রশাসনের এখতিয়ারের বাইরে হওয়ায় তারা ভবন অনুমোদন দিতে পারেনি। ২০১৮ সালে ভবনটি তোলা শেষ হয়। ইতোমধ্যে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) কার্যক্রম শুরু করলে ২০২০ সালের শুরুর দিকে নিয়মানুসারে আবেদন করি। কাগজপত্র ঠিক থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে ভূমি ব্যবহার সনদ দেয়ার কথা থাকলে রহস্যজনক কারণে আজ পর্যন্ত তা দেয়া হয়নি। উল্টো অবৈধ ভবন করার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। যোগাযোগ করা হলে কউকের সহকারী অথরাইজ্ড অফিসার নাছির উদ্দিন এবং ইমারত পরিদর্শক ডেভিড চাকমা সমস্যামুক্ত ভাবে সনদ পেতে ২ লাখ টাকা দাবি করেন। ছোট ভাই বাপ্পির হাতে তাদের এজেন্ট এক ইঞ্জিনিয়ারের কাছে ৫০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। দুদিন পর সেই টাকা ফেরত পাঠিয়ে ১৭ জানুয়ারি ভবন ভাঙ্গার নোটিশ দেয়। বিষয়টি নিয়ে গত ২২ জানুয়ারি কউক চেয়ারম্যানের চেম্বারে গেলে তিনি আমাদের ফাইলটি তলব করেন। ফাইল চেক করে নিয়মমতে আমাদের পত্র না দেয়ার বিষয়টি চোখে পড়ায় দায়িত্বরতদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে নোটিশের বিষয়ে কাগজপত্র নিয়ে বিস্তারিত বসার কথা বলে আমাকে বিদায় করেন কউক চেয়ারম্যান।

তিনি আরও জানান, অথরাইজ বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগের দায়িত্বরতরা করোনা আক্রান্ত হওয়ায় এ নিয়ে আর কউক অফিসে যাওয়া হয়নি। এরই মাঝে বুধবার দুপুরে অকস্মাৎ একটি টিম এসে আমাদের মাথা গুজার ঠাই নির্মিত ভবনটির বেশ কয়েকটি দেয়াল, ফ্লোরের টাইলস, রান্নাঘর নির্দয়ভাবে গুড়িয়ে দিয়েছে।
বেলায়েতের দাবি, অথরাইজ বিভাগের চক্র কর্তৃক দুই লাখ টাকা ঘুষ প্রস্তাব রিজেক্ট হওয়া এবং চেয়ারম্যান বরাবর চলে যাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয় চক্রটি। তারা চেয়ারম্যানকে আবার ভুল বুঝিয়ে তড়িঘড়ি করে বুধবার দুপুরে সদলবলে সাথে অজ্ঞাত লাঠিয়াল নিয়ে এসে ভাঙচুর চালায়। ঘটনার আকস্মিকতায় মনে হয়েছে ওই দুই কর্মকর্তা আমাদের উপর প্রতিশোধ নিয়েছেন। এতো বড় ক্ষতি করবে জানলে আগেই আদালতের দ্বারস্থ হতাম। এখন ক্ষতিপূরণ ও ফাইল তলব করে আদালতের দ্বারস্থ হবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখাযায়, ঝিলংজা মৌজার ১০৫ নাম্বার খতিয়ানের ২০৬০৭ নাম্বার বিএস দাগের ৬শতক জমির উপর দ্বিতল একটি ভবন করেছে অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারি সিরাজুল হক। পেনশনের টাকায় তিনি এই ভবন নির্মাণ করেন। সেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় তলার পশ্চিম ও পূর্ব দিকের মোট ৫টি কক্ষের দেয়াল সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলা হয়েছে। আরও তিনটি দেয়ালের কিয়দংশ ভাঙ্গা দেখা গেছে। সাথে প্রায় সব রুমের ফ্লোরে বসানো প্রতিটি টাইলসে আঘাত করে ভেঙে ফেলা হয়েছে। অথচ এ ভবনের আশপাশে কউকের অনুমোদনহীন অসংখ্য বহুতল ভবন গড়ে উঠছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মালিক সিরাজ জানান, ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে আমার বৃদ্ধা স্ত্রী ইসলাম খাতুন স্ট্রোক করে এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয়দের মতে, চন্দ্রিমা হাউজিং ও আশপাশ এলাকায় সিরাজুল হক অত্যন্ত সজ্জ্বন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। আশির দশক থেকে সরকারী এ কর্মকর্তা এখানে বাস করছেন। নিজ নামে খতিয়ান করা জমিতে পেনশনের টাকায় কউক কার্যক্রম শুরুর আগের বছর এ ভবনটির ভিত্তি দেওয়া হয়েছিলো। এরপরও তারা কউকের নিয়মে ঢুকতে আবেদন দিয়েছে বলে জেনেছি। কিন্তু রহস্যজনক কারণে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফসল এভাবে মুহুর্তেই ধ্বংস করে দিয়ে নজির সৃষ্টি করলো কউক। এঘটনায় পুরো এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ বলেও জানান স্থানীয়রা।
অভিযুক্ত কউকের সহকারী অথরাইজড অফিসার নাছির উদ্দিন বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা তার পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কেউ ভবন নির্মাণের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেনি। নিয়মমতো অভিযান চালানো হয়েছে। দুই লাখ টাকা ঘুষ দাবীর বিষয়টি সঠিক নয়।
কউক চেয়ারম্যান লে. কর্ণেল (অব.) ফোরকান আহমদ বলেন, বেলায়েতকে যে ফাইল দেখানো হয়েছিল তা ভুল ছিলো। তাদের নোটিশ দেয়ার পরও কাজ করছে বলে অভিযোগ আসায় অভিযান চালানো হয়েছে। কোনো ধরণের অনুমোদন নেই, তার উপর পাওয়া নোটিশের সমাধান না করে কাজ চালানো দাম্ভিকতায় পড়ে। আমার অফিসারেরা টাকা চেয়েছে এটা প্রমাণ দিতে পারলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে উল্লেখ করেন কউক চেয়ারম্যান।












