৩ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান পদে কে এই ড. খন্দকার আক্তার!

বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির বর্তমান উপাচার্য রিয়ার অ্যাডমিরাল ড. খন্দকার আক্তার হোসেনকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রেষণে এ নিয়োগের বিষয়ে মতামত দিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মতামত ও পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ, এখনো তাঁকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ নূর-এ-আলম স্বাক্ষরিত গত ১৬ আগস্টের এক চিঠিতে এ নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও নৌবাহিনী সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল ড. খন্দকার আক্তার হোসেনকে প্রেষণে নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।

চিঠির সংযুক্ত তালিকায় প্রস্তাবিত পদ হিসেবে ‘চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম’ এবং নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় হিসেবে ‘নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়’ উল্লেখ করা হয়েছে। নিয়োগের বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে পূর্ব অভিজ্ঞতা
রিয়ার অ্যাডমিরাল ড. খন্দকার আক্তার হোসেনের চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (ইঞ্জিনিয়ার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই সময়ে বন্দরের বিভিন্ন অবকাঠামো ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।

চট্টগ্রাম বন্দরে দায়িত্ব পালনকালে বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ী বাণিজ্যিক বন্দর, আন্তর্জাতিক জাহাজ ও বন্দর নিরাপত্তা বিধিমালা বাস্তবায়ন এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও কার্যক্রমে তাঁর ভূমিকা ছিল।

তাঁর দীর্ঘ নৌপ্রকৌশল ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং বন্দর উন্নয়ন কার্যক্রমে পূর্বসম্পৃক্ততাকে বিবেচনায় নিয়েই চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

৩৬ বছরের অভিজ্ঞতা
রিয়ার অ্যাডমিরাল ড. খন্দকার আক্তার হোসেন বাংলাদেশের নৌপ্রকৌশল, জাহাজ নির্মাণ, সামুদ্রিক শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘ ৩৬ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৯১ সালে নিজ ব্যাচে প্রথম স্থান অর্জন করে কমিশন লাভ করেন তিনি। কর্মজীবনে নৌপ্রকৌশলী, নৌ স্থপতি ও সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা
শিক্ষাজীবনেও তাঁর রয়েছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৌ স্থাপত্য ও সামুদ্রিক প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রকৌশল ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশল ব্যবস্থাপনা ও উন্নত প্রযুক্তি বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। হাওয়াইয়ে জাহাজ নির্মাণ বিষয়ে প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন তিনি। এছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৌ স্থাপত্য ও ভারী শিল্প বিষয়ে দ্বিতীয় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

গবেষণাক্ষেত্রেও তাঁর রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন, উন্নত প্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, ব্যবস্থাপনা, নীল অর্থনীতি, জ্বালানি ও প্রকৌশল প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর ২৫০টির বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। সামুদ্রিক প্রকৌশল ও প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁর বেশ কয়েকটি বইও প্রকাশিত হয়েছে।

নৌবাহিনী ও জাহাজ নির্মাণে ভূমিকা
সামরিক জীবনে আধুনিক বিভিন্ন ফ্রিগেট ও করভেটসহ যুদ্ধজাহাজে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ড. খন্দকার আক্তার হোসেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ নেভাল একাডেমি, মেরিন একাডেমি, নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে শিক্ষক ও অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

দেশের জাহাজ নির্মাণ ও শিল্প খাতেও রয়েছে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। খুলনা শিপইয়ার্ড, চট্টগ্রাম ড্রাই ডক ও নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে মহাব্যবস্থাপক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি করোনা মহামারির মধ্যেও ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখযোগ্য নিট মুনাফা অর্জন করে। একই সময়ে সরকারি কোষাগারে বিপুল পরিমাণ কর জমা দেওয়ার রেকর্ডও তৈরি হয়।

খুলনা শিপইয়ার্ড ও চট্টগ্রাম ড্রাই ডকের নেতৃত্বেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও লাভজনক করার উদ্যোগ নেন তিনি।

বর্তমান চেয়ারম্যানের মেয়াদ
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বর্তমান চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে রিয়ার অ্যাডমিরাল ড. খন্দকার আক্তার হোসেনকে নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে এখনো চূড়ান্ত নিয়োগের কথা বলা হয়নি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মতামত এবং পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

মেরিটাইম খাতে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব
মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে বিভাগীয় প্রধান ও ডিনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন ড. খন্দকার আক্তার হোসেন। বর্তমানে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসেবে দেশের সামুদ্রিক শিক্ষার প্রসার ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।

দীর্ঘ সামরিক ও বেসামরিক অভিজ্ঞতা, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নৌপ্রকৌশল ও জাহাজ নির্মাণ খাতে দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশের সামুদ্রিক খাতের উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নৌপ্রকৌশল, যুদ্ধজাহাজ পরিচালনা, জাহাজ নির্মাণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও সামুদ্রিক শিক্ষায় দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ড. খন্দকার আক্তার হোসেনকে দেশের মেরিটাইম খাতের একজন অভিজ্ঞ ও বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আরও পড়ুন