৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

চট্টগ্রাম-৭ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের উত্তাপ, প্রতিশ্রুতি আর গণসংযোগে সরগরম মাঠ

ভোটের সমীকরণে বড় ফ্যাক্টর আওয়ামী লীগ ভোটাররা

চট্টগ্রাম-৭ সংসদীয় আসন (রাঙ্গুনিয়া) ঘিরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গ্রামগঞ্জ থেকে হাট-বাজার, পাড়া-মহল্লা থেকে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সর্বত্রই চোখে পড়ছে প্রার্থীদের ব্যস্ত গণসংযোগ, পোস্টার-ব্যানার ও নির্বাচনী প্রচারণা। দিন যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে নির্বাচনী উত্তেজনা এবং ভোটের হিসাব-নিকাশ।

এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে ত্রিমুখী লড়াইকে কেন্দ্র করে। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরী, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল হাছান এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ডা. এটিএম রেজাউল করিম। তিনজনই সক্রিয়ভাবে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজেদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন।

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৩ হাজার ১৬৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬২ হাজার ৪৫ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৫১ হাজার ১১৮ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন একজন। এ ছাড়া পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ৫ হাজার ৪৮৬ জন, যা এই আসনের ভোটের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা এই বিষয়গুলোই এবারের নির্বাচনে ভোটারদের প্রধান বিবেচ্য। অনেক ভোটার অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ যেন কোনোভাবেই অর্থের প্রভাবের মধ্যে না পড়ে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। এলাকায় টাকা দিয়ে ভোট কেনাবেচার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে বলেও দাবি করেছেন একাধিক ভোটার।

গণসংযোগকালে বিএনপির প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরী বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি রাঙ্গুনিয়াকে চাঁদাবাজ, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তুলবেন। পাশাপাশি ভাঙাচোরা সড়ক সংস্কার, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল হাছান বলেন, নৈতিকতা ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে রাঙ্গুনিয়ায় সুশাসন প্রতিষ্ঠাই তাঁর মূল লক্ষ্য। তিনি অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধ, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. এটিএম রেজাউল করিম বলেন, জনগণ পরিবর্তন চায়। তিনি নির্বাচিত হলে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থান খাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন বলে জানান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরীর বাবা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী দীর্ঘদিন এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। সেই সূত্রে তাঁর একটি শক্ত ভোটব্যাংক ও প্রভাবশালী সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে, যা তাঁকে অন্যদের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে রাখতে পারে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টেরও এই আসনে একটি সংগঠিত বলয় রয়েছে। অতীতে ইসলামী ফ্রন্টের নেতা আকতার হোসেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। সে কারণে দলটির একটি নির্দিষ্ট সমর্থনভিত্তি ক্রমেই আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

অতীতে বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক জোটে থাকা জামায়াতে ইসলামীর জন্য এবারের নির্বাচন তুলনামূলকভাবে কঠিন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। তবে দলটি কৌশলগতভাবে এগোচ্ছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় নির্বাচনটির ফল নির্ধারণে আওয়ামী লীগ ও তাদের অনুসারী ভোটারদের অবস্থানই সব প্রার্থীর জন্য বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে।

এই আসনে ত্রিমুখী মূল লড়াইয়ের বাইরে আরও কয়েকজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি এবং গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীরাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন থাকবে। কোনো কেন্দ্রেই বিশৃঙ্খলা বা অনিয়ম সহ্য করা হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে বিপুল ভোটারসংখ্যা, রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চট্টগ্রাম-৭ আসনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত রাঙ্গুনিয়ার তিন লাখের বেশি ভোটারই ঠিক করে দেবেন কে যাচ্ছেন জাতীয় সংসদে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ