মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়ার পর থেকেই দেশে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী ও বন্দর ঘিরে গড়ে উঠেছে চোরাই তেলের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. আসলাম, যিনি বর্তমানে আত্মগোপনে থাকলেও আড়াল থেকে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন।
জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কর্ণফুলী নদীতে থাকা জাহাজ থেকে রাতের আঁধারে চোরাই তেল পাচারে সক্রিয় একাধিক চক্র। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পটপরিবর্তনের পর গা ঢাকা থাকলেও আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন তার তেল চুরিতে সক্রিয় সিন্ডিকেট। আর তার হয়ে সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন কর্ণফুলীতে আব্দুস শুক্কুর (প্রকাশ তেল শুক্কুর) এবং ইপিজেড এলাকায় হারুনুর রশিদ, আক্কাস সওদাগর। এছাড়াও পতেঙ্গার বার্মা ইউসুফ ও চরপাথরঘাটার খোরশেদ রয়েছে। অত্যন্ত শক্তিশালী এ সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক অতীতে বহু চেষ্টা করেও কেউ ভাঙতে পারেনি। বরং রুট লেভেল পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে তাদের কার্যক্রম। রাস্তার পাশের খুপরি ঘর থেকে শুরু করে তেলের ট্যাংকলরি, ডিপো এবং তেলবাহী জাহাজ পর্যন্ত বিস্তৃত এদের নেটওয়ার্ক।
শুধু তাই নয়, সাবেক কাউন্সিলর আসলামের নেতৃত্বে কর্ণফুলী ও আশপাশ এলাকায় গড়ে উঠেছে বেশ কিছু অবৈধ ডিপো। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী ঘিরে গড়ে উঠেছে চোরাই জ্বালানি তেলের এক সুসংগঠিত, শক্তিশালী ও ভয়ংকর সিন্ডিকেট। আসলামের নেতৃত্বাধীন ওই সিন্ডিকেটগুলোই জাহাজ থেকে চোরাই এসব তেল ডিপোতে নিয়ে আসে। পরে এসব তেল স্থানীয় বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও জাহাজে বাংকারিং করা হয়।
সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে কার্যত অকার্যকর করে তেল চোর চক্রটির পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন বহুল আলোচিত চোরাকারবারি মো. আসলাম। তিনি নিজে পলাতক থাকলেও তার নেতৃত্বে কর্ণফুলী এখন এক অদৃশ্য তেল-অর্থনীতির কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে।
কর্ণফুলী এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন,
“রাত হলেই নদীতে ছোট ছোট নৌকার চলাচল বেড়ে যায়। আমরা বুঝি তেল নামানো হচ্ছে, কিন্তু কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।”
একই এলাকার শাহাবুদ্দীন জানান “এই চোরাই তেলের কারণে এলাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। আগুন লাগলে পুরো এলাকা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।”
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণভাবে সরকার নিয়ন্ত্রিত হলেও কর্ণফুলী এলাকায় সেই নিয়ন্ত্রণ কার্যত ভেঙে পড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসি এবং এর অধীনস্থ পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির ডিপো থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দরে আগত দেশি-বিদেশি জাহাজ—সব জায়গা থেকেই কৌশলে তেল সংগ্রহ করছে আসলামের নিয়ন্ত্রণাধীন এই চক্রগুলো। আইন যেখানে ব্যক্তি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানি বা বাজারজাতের কোনো সুযোগ রাখেনি, সেখানে এই সিন্ডিকেট দিন-রাত নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অবৈধ কার্যক্রম। এদিকে মো. আসলাম গা ঢাকা থাকলেও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত চোরাই তেল বিক্রির ভাগ চলে যাচ্ছে তার হাতে।
তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত ৫০ হাজার লিটার তেল হাতবদল হচ্ছে। জাহাজ থেকে প্রতি লিটার ৫০-৫৫ টাকায় সংগ্রহ করে তা পাইকারদের কাছে ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি করা হয়। ফলে প্রতিদিন কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেটটি আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, “বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি। কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। সিন্ডিকেটটি অনেক শক্তিশালী ও সুসংগঠিত। তবে চোরাই তেল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জানা গেছে, দিনমজুর পরিবারের সন্তান মো. আসলাম ছোটখাটো চুরি দিয়ে অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে চোরাচালান, ভূমিদস্যুতা ও তেল পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি দুই দফা কাউন্সিলর নির্বাচিত হন এবং বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান।
স্থানীয় সূত্র মতে, নগরীর ইপিজেড থানাধীন সিমেন্ট ক্রসিং নারিকেলতলা এলাকার দিনমজুর সিরাজদৌল্লাহর ছেলে মো. আসলাম। ৮০-এর দশকে সে স্টিলমিল থেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লোহা, সিমেন্টের বস্তা চুরি করত। কখনো কখনো মানুষের বাড়িঘরের মূল্যবান জিনিসপত্রও চুরি করত।
তার চুরিতে অতিষ্ঠ হয়ে ১৯৯২ সালের দিকে এলাকার একটি সিমেন্ট কারখানা কর্তৃপক্ষ তাকে দারোয়ানের চাকরি দেয়। সেখানে থেকে সে চাকরির আড়ালে রড চুরি ও বিভিন্ন দপ্তরের বড় কর্মকর্তাদের কাছে নারী সরবরাহ করত। ক্রমান্বয়ে সমুদ্রপথে মদ, বিয়ার, ইয়াবা, সিগারেট ও অস্ত্র চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ে। ১/১১-এর সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয় আসলাম।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেপরোয়া হয়ে ওঠে আসলাম। থানার দালালি, মামলা বাণিজ্য থেকে শুরু করে এমন কোনো অপকর্ম নেই যা সে করেনি। এলাকায় বেড়ে যায় ভূমিদস্যুতা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ও এর অধীনস্থ পদ্মা, মেঘনা, যমুনার কতিপয় কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে তেল পাচারে জড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের হয়ে ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে দুই দফা কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে জয়লাভ করে। এরপর আসলামের পেছনে ছুটে টাকা আর টাকা। রাতারাতি অঢেল সম্পদের মালিক বনে যায়। নারিকেলতলা এলাকায় গড়ে তোলে দুটি ৭ তলা ভবন। নিজ নামে-বেনামে এলাকায় ও আশপাশে, এমনকি পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত ও ডাঙাচর এলাকায়ও অনেক জায়গাজমি কিনে নেয়।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কর্তৃক প্রকাশিত মো. আসলাম (প্রকাশ ডাকাত আসলাম) নামে দুষ্কৃতিকারীর তালিকায় তার নাম দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে কর্ণফুলী নদী ও চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে গড়ে ওঠা এই চোরাই তেল সিন্ডিকেট শুধু রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতিই করছে না, বরং নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শক্তিশালী এই চক্র ভাঙতে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
দ্বিতীয় পর্বে থাকছে: তেল শুক্কুরের অবৈধ তেলের রাজত্ব!












