কক্সবাজারে বর্ণাঢ্য র্যালি ও আলোচনা সভায় জমজমাট ভাবে উদযাপন হয়েছে বিশ্ব পর্যটন দিবস। ১৯৮০ সাল থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হয়ে আসছে। পর্যটনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর এ দিবস পালিত হয়। ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য-‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’।
বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দিবস উপলক্ষ্যে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট হতে শুরু হওয়া র্যালি প্রধান সড়ক হয়ে লাবণী পয়েন্টের উন্মুক্ত মঞ্চে এসে শেষ হয়। সামনে সওয়ারসহ ঘোড়া ও বীচ বাইকের সারি, মাঝখানে ঘোড়ার গাড়ি তার পেছনে দৃষ্টিনন্দন পোষাকে বাদ্য বাজকের দল তাদের পেছনে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে বিশাল ব্যানারে র্যালি। শরতের নীল আকাশ ও সাগরের নীল জলরাশির সাথে সমন্বয় করে তৈরী করা টি-শার্ট, শান্তির সাদা রংয়ের টুপি মাথায় নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে র্যালিতে অংশ নেয় তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইস, লংবিচ, সায়মন, কক্স টু ডে, ওয়াল্ড বিচ, প্রাসাদ প্যারাডাইস, মিশুক, টুয়াকসহ নানা পর্যটন কেন্দ্রীক সংগঠনের কর্মীরা। অংশ নেয় বিভিন্ন স্কুল, কলেজের স্কাউট ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
বর্ণাঢ্য র্যালি শেষে লাবণী পয়েন্টের উন্মুক্ত মঞ্চে জেলা প্রশাসক এম এ মান্নানের সভাপতিত্বে ও পর্যটন সেলের ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েমের সঞ্চালনায় শুরু হয় আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন কক্সবাজার সদর আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল ও নারী সাংসদ অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না।
ব্কব্য রাখেন, মেরিন ড্রাইভ হোটেল সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান, হোটেল-গেস্ট হাউস সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার, স্কোয়াব সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর, ট্যুরস্ট পুলিশের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার আজমল হোসেন, জেলা পুলিশের প্রতিনিধি দেবদূত মজুমদার, টুয়াক সভাপতি আনোয়ার কামাল প্রমূখ। সভা শেষে অতিথিগণ বেলুন উড়িয়ে পর্যটন দিবসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, কক্সবাজার বাংলাদেশের সম্পদ। এখানে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, মিয়ানমার সীমান্ত, নাফনদী, সেন্টমার্টিনের মতো পর্যটন ডেসটিনেশন রয়েছে। এসকল উপলক্ষ থেকে বর্তমানে বাৎসরিক ১৮শ কোটি টাকা রাজস্ব পাচ্ছে রাষ্ট্র। পর্যটন ও সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগিয়ে কক্সবাজারকে অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রীকে প্রধান করে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। যার মূল লক্ষ্য কক্সবাজারকে বিশ্বময় করে গড়ে তোলা।
বক্তাদের মতে, দেশি-বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতি চাইলে পরিচ্ছন্ন কক্সবাজার দরকার। সরকার কক্সবাজারকে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক নগরী গড়তে কমিটি গঠন করেছে। সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগাতে কাজ চলছে। অতি শিগগিরই কক্সবাজার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিকতায় যুক্ত হবে। এখান থেকে মালয়েশিয়া, চীন, জাপান অতি নিকটবর্তী। সময় লাগবে কম। কক্সবাজারকে পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ রাখতে সবার আন্তরিক সহযোগিতা দরকার। এটা প্রশাসনের একার কাজ নয়, স্থানীয় সকলের স্বতঃস্ফূর্ততায় এটি সম্ভব। কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী সকলকে নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সহযোগিতা দেয়া দরকার। পরিচ্চন্নতা নিশ্চিতে দরকার সচেতনতা। পরিবেশের দোহাই দিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাঁধাগ্রস্ত না করে উভয়কূল রক্ষা করে উন্নয়নও দরকার। পর্যটক বান্ধব কক্সবাজার গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানান তারা।
আলোচকদের মতে, বিশ্ব পর্যটন দিবসের অনুষ্ঠান কক্সবাজার কেন্দ্রিক প্রতিপালন দরকার। পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ অখন্ড সৈকত ও সবুজের সমারোহকে বিশ্বময় করতে হলে কক্সবাজারেই প্রাধান্য দিয়ে বিশ্ব পর্যটন দিবস উদযাপনের পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দু’দিন বা মাসে তিনদিন কোন না কোন আয়োজন করে পর্যটনকে চাঙা রাখা উচিত।
বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ডে পর্যটন জেলা সম্পর্কে প্রচারণা থাকা দরকার। উপকূলীয় জেলা হিসেবে পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষা করেই উন্নয়ন তরান্বিত করে অবকাঠামোগত উন্নতি ঘটাতে হবে। সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে সমৃদ্ধ হবে পর্যটন, যোগ করেন বক্তারা।
কক্সবাজার বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সমন্বয়ক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান জানান, বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে কক্সবাজারে ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে চলছে তিনদিন ব্যাপী পর্যটন মেলা। জেলা প্রশাসন ও বিচ ম্যানেজম্যান্ট কমিটির তত্বাবধানে চলা পর্যটন মেলা উপলক্ষে হোটেল-মোটেল গুলোতে ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় চলছে। পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, বাইক, স্পিডবোটসহ নানা অনুষঙ্গেও দেয়া হচ্ছে ছাড়। মেলার শুরুরদিন থেকে পর্যটক দর্শণার্থীতে ভরে গেছে কক্সবাজার।
তিনি আরো জানান, মেলায় তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইস, সায়মন, সী পার্ল, গ্রীণ ন্যাচার, সীগাল স্টল সাজিয়ে মেলাকে সমৃদ্ধ করেছে। মেলাতেই স্বল্প ব্যয়ে তারকা হোটেলের খাবারের স্বাদ পাচ্ছেন আগত পর্যটক ও দর্শণার্থীরা। কক্সবাজারের পর্যটন খাত সংশ্লিষ্ট জিনিসপত্র তুলে ধরা হয়েছে অন্য স্টল গুলোতে। নারী উদ্যোক্তাদের বাহারী পণ্য, আচার, শুঁটকি ও পিঠাসহ হরেক রকমের আয়োজন রয়েছে মেলায়। সবমিলে ৮০টির মতো স্টল বসানো হয়েছে। রবিবার সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় ঝমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে এবারের মেলা শেষ হবে।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারিদের মতে, কক্সবাজারে সমুদ্র আছে, আছে পাহাড়, প্রকৃতি আর পর্যটকদের বিপুল আগ্রহ। নেই শুধু সমন্বিত ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ কাঠামো। পর্যটন দিবতের এবারের প্রতিপাদ্যের সাথে কক্সবাজার প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পর্যটনের যুগে কতটা প্রস্তুত- এমন প্রশ্ন থেকেই যায়। পর্যটকদের জন্য ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্র, নির্ভরযোগ্য পরিবহন ও হোটেল তথ্য, অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা, জরুরি সহায়তা, নিরাপত্তা নজরদারি এবং পর্যটনসেবার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে চলতি বছরের প্রতিপাদ্য স্বার্থকতা পাবে- হয়রানি কমবে অনেকাংশে, এমনটাই মনে করছেন তারা।












