ট্রাক বোঝাই পণ্য। কিন্তু কাগজে-কলমে সেই ট্রাক ‘খালি’। আর এই কৌশলেই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে সরকারি রাজস্বের বড় ধরনের ক্ষতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ডিপোর সাবেক ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামানকে ঘিরে ওঠা অভিযোগে বলা হয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র নির্দিষ্ট কয়েকটি পয়েন্টে পণ্যবাহী ট্রাক ‘খালি’ দেখিয়ে অর্থ আদায় করত।
একাধিক চালকের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হতো। ট্রাকপ্রতি ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থের একটি অংশ ডিপোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে পৌঁছাত বলেও অভিযোগ করেছেন চালকরা।
তবে অভিযোগের বিপরীতে বছরে কয়েক শত কোটি টাকা আত্মসাতের যে দাবি করা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব, অডিট রিপোর্ট বা আর্থিক নথি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ওই অঙ্কের দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
লোড গাড়ি ‘খালি’ দেখানোর অভিযোগ
বিআরটিসির চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ট্রাকগুলো চট্টগ্রামের কাফকো, টিএসপি, ডিএপি এবং নরসিংদীর ঘোড়াশাল থেকে সার নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাফার গুদামে পৌঁছে দেয়। পরে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ থেকে চাল, ভুট্টা, আলুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য নিয়ে এসব ট্রাক চট্টগ্রাম, ঢাকা, ফেনীসহ বিভিন্ন এলাকায় ফেরে।
অভিযোগ রয়েছে, পণ্যবোঝাই অবস্থায় ফিরে আসা এসব ট্রাকের একটি অংশকে নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছানোর পর ‘খালি’ দেখানো হতো। এতে পরিবহন ও রাজস্ব হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
চালকদের দেওয়া তথ্যমতে, টাঙ্গাইলের করটিয়া এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনের পাশে দায়িত্ব পালন করতেন প্রতিনিধি মো. জসিম। সেখানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টি পণ্যবাহী ট্রাককে খালি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে মেঘনা-দাউদকান্দি এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনের পাশে দায়িত্ব পালনকারী প্রতিনিধি মো. শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে দক্ষিণবঙ্গ থেকে আসা প্রতিদিন ৮ থেকে ১০টি লোড ট্রাক খালি দেখানোর অভিযোগ করেছেন কয়েকজন চালক।
ট্রাকপ্রতি ১ থেকে ৩ হাজার টাকা
শুধু ফেরার সময় নয়, বিভিন্ন লোড পয়েন্টেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চালকের দাবি, গাড়ি লোড হওয়ার পর প্রতিটি ট্রাক থেকে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো।
কাফকোতে প্রতিনিধি মো. রেদোয়ান, ডিএপি ও টিএসপিতে প্রতিনিধি মো. ইলিয়াস এবং ঘোড়াশালে প্রতিনিধি মো. নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে এ ধরনের অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন তারা।
চালকদের অভিযোগ, সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সাবেক ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। বাকি অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি ও ডিপোর কয়েকজন কর্মচারীর মধ্যে ভাগ হয়ে যেত বলে দাবি তাদের।
ইয়ার্ড মাস্টার মো. আনোয়ারের বিরুদ্ধেও অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তার ভাই মো. ইলিয়াসও এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন চালক। তাদের দাবি, দুই ভাই মিলে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০টি লোড ট্রাক খালি দেখিয়ে অর্থ আদায় করতেন।
‘সিন্ডিকেট’ গড়ার অভিযোগ
অনিয়ম নির্বিঘ্নে চালাতে সাবেক ম্যানেজার কামরুজ্জামান বিভিন্ন ডিপো থেকে তার পছন্দের লোকজনকে বদলি করে এনে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। চালকদের দাবি, ওই বলয়ে তার শ্যালক, ভগ্নিপতি ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজন আত্মীয়ও ছিলেন।
কামরুজ্জামান ২০২৪ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২৬ সালের ২৫ জুন বদলি হয়ে চট্টগ্রাম ছাড়েন তিনি। অর্থাৎ প্রায় ১৯ মাস চট্টগ্রাম ডিপোর দায়িত্বে ছিলেন।
চট্টগ্রাম ছাড়ার পরও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
চট্টগ্রাম থেকে বদলি হওয়ার পরও খুলনা থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। খুলনা-ঢাকা রুটে দুটি বিআরটিসি বাস চালকের নামে নিজস্ব লোক দিয়ে পরিচালনা করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কমিটি, কিন্তু নথি মিলছে না
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে অভিযোগের তদন্ত নিয়ে। বিআরটিসি ট্রাক ডিপো চট্টগ্রামের বর্তমান ম্যানেজার জামিলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে অভিযোগ সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান। পরে তিনি স্বীকার করেন, এ বিষয়ে একটি অভিযোগ পাওয়ার পর বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, একজন মেজরের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটির সদস্যরা চট্টগ্রামে এসে বিষয়টি খতিয়ে দেখেছেন। কিন্তু অভিযোগ-সংক্রান্ত নথিপত্র চাইলে তিনি তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। সাবেক ম্যানেজার কামরুজ্জামান তার সিনিয়র কর্মকর্তা হওয়ায় এ বিষয়ে ডকুমেন্ট দিয়ে সহযোগিতা করতে পারবেন না বলে জানান তিনি। পরে অভিযোগকারী দুই ট্রাকচালক হানিফ ও জামালের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
অভিযোগকারীও মুখ খুললেন না
অভিযোগকারী ট্রাকচালক হানিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ করার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে গণমাধ্যমে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি সামনাসামনি কথা বলার কথা জানান।
ফলে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি, ট্রাক চলাচলের রেকর্ড, লোড-আনলোডের হিসাব এবং রাজস্ব আদায়ের তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে।
সাবেক ম্যানেজারের দাবি- ‘অভিযোগের সত্যতা মেলেনি’
অভিযোগের বিষয়ে মো. কামরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ উঠেছিল। তদন্তের পর এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তার দাবি, বিভিন্ন ব্যক্তি ব্যক্তিগত সুবিধা না পেয়ে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন। চট্টগ্রাম থেকে বদলির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি নিয়মিত বদলির অংশ। তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেন তিনি।
বিআরটিসির বক্তব্য কী?
অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাকিম ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে অভিযোগের ধরন, তদন্ত কমিটি গঠন এবং বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে— পণ্যবোঝাই ট্রাক কীভাবে ‘খালি’ হয়ে গেল, কার অনুমতিতে এমন হিসাব তৈরি হলো এবং কথিত অর্থ আদায়ের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে বিআরটিসির ট্রাক মুভমেন্ট রেজিস্টার, লোড-আনলোডের হিসাব, রাজস্ব জমার রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের দায়িত্বের নথি এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে। সেসব নথি প্রকাশ্যে এলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।














