২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ট্যারিফ আপডেটের বোঝা গ্রাহকের ঘাড়ে!

‘ডিজিটালের নামে দুর্ভোগ’— এক রিচার্জে ২৮০ ডিজিট! ভোগান্তিতে চট্টগ্রামের প্রিপেইড গ্রাহক

বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার রিচার্জ করতে গিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকরা নতুন ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। সাধারণত ২০ ডিজিটের টোকেনের পরিবর্তে ২৮০ থেকে ৩০০ ডিজিট পর্যন্ত দীর্ঘ কোড পাওয়ায় অনেক গ্রাহক সেটি মিটারে প্রবেশ করাতে গিয়ে ভুল করছেন। ফলে মিটার লক হয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গ্রাহকদের অভিযোগ, দীর্ঘ টোকেন নম্বর প্রবেশ করাতে গিয়ে বারবার ভুল হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মিটার লক হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো দিন বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে।

এ ছাড়া রিচার্জের পর ব্যালান্স সমন্বয়ে জটিলতা, বিভিন্ন খাতে অর্থ কর্তনের অভিযোগ এবং সার্ভারজনিত সমস্যার কথাও জানিয়েছেন অনেক গ্রাহক। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার বাসিন্দা মনির আহমেদ বলেন, “ডিজিটাল মিটার মানুষের সুবিধার জন্য চালু হয়েছিল। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রে ভোগান্তি বাড়ছে। ২০০-এর বেশি ডিজিটের কোড দিতে গিয়ে ভুল হলে আবার শুরু থেকে দিতে হয়। কখনো মিটার লকও হয়ে যায়।”

চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দা রিপন চৌধুরী জানান, বিকাশের মাধ্যমে রিচার্জ করতে গিয়ে তিনি সার্ভার সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। বন্দর এলাকার গ্রাহক শাহরদ করিম বলেন, “প্রথমে এত বড় টোকেন দেখে হতবাক হয়ে যাই। পরে ২০ ডিজিট করে ভাগ করে কোড প্রবেশ করাতে হয়েছে।”

পাহাড়তলী এলাকার ইকবাল হায়দার রনি বলেন, “এত বড় টোকেন নম্বর সাধারণ গ্রাহকদের জন্য বাড়তি ঝামেলার সৃষ্টি করছে।” পটিয়ার কাউছার হোসেনের ভাষ্য, “শিক্ষিত মানুষও সমস্যায় পড়ছেন। বয়স্ক ও প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ মানুষের জন্য এটি আরও কঠিন।”

কত গ্রাহক প্রিপেইড মিটারের আওতায়
পিডিবির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলা মিলিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে মোট ১১ লাখ ৭৩ হাজার ২২৮ জন গ্রাহক ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রিপেইড মিটারের আওতায় আসে।

পরবর্তীতে পিডিবি চট্টগ্রাম জোন জানায়, তাদের প্রায় ৭৫ শতাংশ গ্রাহক প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। সেই হিসাবে বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রিপেইড গ্রাহকের সংখ্যা আনুমানিক ৮ থেকে ৯ লাখ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো হালনাগাদ সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।

দেশে বর্তমানে প্রায় পাঁচ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৫৫ লাখ গ্রাহক প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

কেন আসছে ২০০-৩০০ ডিজিটের টোকেন

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুতের ট্যারিফ বা মূল্যহার পরিবর্তনের পর মিটারে নতুন তথ্য হালনাগাদ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে শুধু ইউনিট রিচার্জ নয়, নতুন ট্যারিফ, চার্জ সমন্বয় এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্যও একাধিক এসটিএস (STS) টোকেনের মাধ্যমে পাঠানো হয়।

ফলে স্বাভাবিক ২০ ডিজিটের পরিবর্তে কয়েকটি টোকেন একত্র হয়ে ২০০ থেকে ৩০০ বা তারও বেশি সংখ্যার কোড তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ প্রিপেইড মিটার সরাসরি অনলাইনভিত্তিক নয়। তাই মূল্যহার পরিবর্তনসহ বিভিন্ন তথ্য মিটারে পাঠাতে আলাদা কোড ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। আন্তর্জাতিক STS (Standard Transfer Specification) প্রযুক্তিতে এসব তথ্য এনক্রিপ্ট করা হয়, যার ফলে টোকেন দীর্ঘ হয়ে যায়।

কী বলছে পিডিবি

চট্টগ্রাম পিডিবির ডিজিটাল মিটার-সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এমরান হোসাইন বলেন, “বিদ্যুতের দাম বা ট্যারিফ পরিবর্তনের পর একবার দীর্ঘ টোকেন আসতে পারে। এটি প্রযুক্তিগত কারণে হয়। গ্রাহকদের একটু কষ্ট হলেও সাধারণত এটি বছরে একবারের মতো ঘটে। পরে আবার স্বাভাবিক ২০ ডিজিটের টোকেনই পাওয়া যায়।”

পিডিবি চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার মোহন্ত বলেন, “এটি সাময়িক একটি বিষয়। নতুন ট্যারিফের তথ্য একবার মিটারে আপডেট হয়ে গেলে পরবর্তী রিচার্জে আর এমন দীর্ঘ টোকেন থাকবে না। তবে গ্রাহকদের যে ভোগান্তি হচ্ছে, সেটি আমরা উপলব্ধি করছি।”

চার্জ কর্তন নিয়ে অসন্তোষ

প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের আরেকটি অভিযোগ বিভিন্ন খাতে অর্থ কর্তন নিয়ে। গ্রাহকদের দাবি, রিচার্জের পর মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাটসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ কেটে নেওয়া হয়। তবে কোন খাতে কত টাকা কর্তন হচ্ছে, সে বিষয়ে অনেক সময় পরিষ্কার তথ্য পান না তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) অনুমোদিত বিধান অনুযায়ী ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও অন্যান্য নির্ধারিত চার্জ আদায় করা হয়। তবে এসব বিষয়ে গ্রাহকদের কাছে আরও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা।

বিশেষজ্ঞদের মত

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ নতুন নয়। ডিজিটাল সেবার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত গ্রাহকের ভোগান্তি কমানো। কিন্তু দীর্ঘ টোকেন, মিটার লক এবং প্রযুক্তিগত জটিলতা সেই লক্ষ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

তাঁদের মতে, প্রযুক্তিগত আপডেটের প্রয়োজন থাকলেও সেটি এমনভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত যাতে বয়স্ক, অশিক্ষিত বা প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ গ্রাহকরা অতিরিক্ত ভোগান্তির শিকার না হন।

স্মার্ট মিটারে সমাধানের আশা
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক স্মার্ট মিটারে এসব দীর্ঘ টোকেন ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্যারিফ ও অন্যান্য তথ্য হালনাগাদ করা যায়। সরকার ধীরে ধীরে প্রচলিত প্রিপেইড মিটারকে স্মার্ট মিটারে রূপান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

তবে ততদিন পর্যন্ত দীর্ঘ টোকেন, মিটার লক এবং চার্জ সংক্রান্ত অস্পষ্টতার মতো সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান চায় সাধারণ গ্রাহকরা।

সম্প্রতি বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ (ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া) প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

তবে একই সময়ে Bangladesh Energy Regulatory Commission জানায়, ডিমান্ড চার্জ প্রত্যাহারের কোনো ঘোষণা তারা দেয়নি এবং বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী ডিমান্ড চার্জ বহাল রয়েছে।

আরও পড়ুন