মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»
ড্রাগনের নাম শুনলে অনেকে শিউরে উঠে। ইংরেজী ছবি কিংবা কার্টুন ছবির মাধ্যমে অনেকেই ড্রাগনের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু ড্রাগন আকৃতির গাছও রয়েছে। এ গাছে আবার ফলও হয়। ফলটি দেখতে আকর্ষণীয় হলেও স্বাদে ততটা মধুর নয়। তবে এ ফলে প্রচুর পরিমাণে দেহ গঠনের আয়রণ গুণ রয়েছে। ফলে শরীরের জন্য এটি অনেক উত্তম। এছাড়াও পুষ্টি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় এ ফলের অবদান রাখতে সকলকে চাষের দিকে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন কৃষিবিদরা।
চট্টগ্রামে এ ফলের বৈজ্ঞানিক চাষ দেখা গেছে বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল রিচার্স ইনস্টিটিউটের (বারি) পাহাড়তলী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে। এ কেন্দ্র থেকে প্রায়ই ড্রাগন গাছের চারা বিক্রয় করা হয়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করে ফল উৎপাদন ও তা বিদেশে রফতানির উদ্যোগ নেয়া যায়। এছাড়াও ভাটিয়ারিস্থ গলফ ক্লাবের মাঠের এককোণায় এ ফলের চাষ করা হয়েছে সৌখিনতার কারণে।

উৎপত্তি ॥ সর্বপ্রথম সেন্ট্রাল আমেরিকায় এ ড্রাগন ফলের উৎপত্তি হয় ১৩শ শতাব্দীতে। তবে মালয়েমিয়ায় বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এ ফলের চাষ দেখা গেছে। পরবর্তীতে বাণিজ্যিকভাবে ভিয়েতনামে চাষ করা হয় ড্রাগন গাছ এবং ব্যাপক উৎপাদন হয় ফলের। দক্ষিণ চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এমনকি বাংলাদেশেও এখন ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ড্রাগন ফলের প্রথম চাষ হয়।
ড্রাগন ফলের জাত ॥ এ ফলের চারটি জাত রয়েছে। এগুলো হল সাদা, লাল, হলুদ ও কালচে লাল। তবে সফলভাবে এ ফলের চাষ করতে হলে সাদা ও লাল ড্রাগন ফল উৎপাদনের জন্য ঐ জাতের চারা রোপন করতে হবে। কিন্তু হলুদ ও কালচে লাল ড্রাগন ফল উৎপাদন যেমন কম হয়, তেমনি স্বাদেও ভিন্নতা রয়েছে সাদা ও লাল ড্রাগন ফলের তুলনায়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সাদা ও লাল ড্রাগন ফলের কদর সবচেয়ে বেশি।
চাষ পদ্ধতি ॥ চারা রোপনের কমপক্ষে পনের দিন আগে গর্ত করে তাতে ৪০ গ্রাম পচা গোবর, ৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও টিএসপি সার, ১শ গ্রাম এমপি সার, জিপসাম, সালফেট সামান্য পরিমাণ দিয়ে গর্তে মেশাতে হবে। এরপর প্রতি তিন মিটার দূরত্বে চারা রোপন করতে হবে। এতে পরিচর্যা যেমন সহজ হবে তেমনি ফল উৎপাদনের পরিমাণও হবে বেশি। এ গাছের ওজন অনেক বেশি হওয়ায় সিমেন্টের চিকন পিলার বা গাছের খুঁটি দিয়ে মাচা তৈরি করে গাছ রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। চারা রোপনের এক বছরের মধ্যেই এ গাছে ফল পাওয়া যাবে। তবে পর্যাপ্ত পরিচর্যা না করা গেলে এক বছরের পরিবর্তে দেড় বছরে এ গাছ থেকে ফল আহরণ করা যাবে।

জলবায়ু ও পরিবেশ ॥ এ ফলটির জন্য ট্রপিক্যাল জলবায়ু প্রয়োজন হয়। মধ্যম মাত্রার বৃষ্টিপাত এ চাষের জন্য উত্তম। এ গাছে ফলন আসে বর্ষাকালে। তবে অতি বৃষ্টি হলে ফুল ঝরে পড়তে পারে। গাছের গোড়া থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নতুবা গোড়ায় পচন ধরে গাছ মরে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। বেলে দোআঁশ মাটিতে এ ফলের চাষ উত্তম। এছাড়াও তাপমাত্রার জন্য সূর্যের আলো অনেকটা সহায়ক।
রোগ ও প্রতিরোধ ॥ এ গাছে তেমন একটা রোগ বালাই দেখা দেয় না। তবে পানির কারণে গাছের গোড়া, কান্ড ও পাতায় পচন রোগ সৃষ্টি হতে পারে। এক্ষেত্রে গাছের নিচে ওপরে কোথাও যেন পানি জমতে না পারে সে জন্য মাচাকে এমনভাবে টাঙানো উচিত যাতে গাছটি মাটির দিকে নুয়ে থাকে। ছত্রাক অথবা ব্যাকটেরিয়ার কারণে এ গাছে হলদে রঙ ধারণের পর তা আস্তে আস্তে কালো হয়ে পচন শুরু হতে থাকে। এক্ষেত্রে বেবেষ্টিন, রিডোমিল ও থিওবিট নামক ছত্রাক নাশক দিয়ে রোগ প্রতিরোধ সম্ভব হয়। এছাড়াও এফিড ও মিলিবাগ নামক এক ধরনের পোকার আক্রমণ দেখা যায়। এসব পোকা পাতার রস ও ডগা খেয়ে গাছকে দুর্বল করে ফেলে। গাছের ডগা খাবার কারণে ফুল আশা করতে পারেন না চাষী। এক্ষেত্রে স্প্রে দিয়ে কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।
ফল প্রাপ্তি ॥ এ গাছ থেকে এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে ফলন নিশ্চিত করা যায়। এ ক্ষেত্রে চাষী প্রতি গাছ থেকে কমপক্ষে ৫-১০টি ফল পেতে পারেন। তবে পূর্ণ বয়স্ক গাছে বার বার ফুল আসার কারণে ৭৫ থেকে ১শটি পর্যন্ত ফল আশা করা যায়। এক্ষেত্রে পানির উপর অনেকটা নির্ভরশীলতা চলে আসে। উর্বর ও ঢালু জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ করা হলে ক্ষতির সম্ভাবনা নেই।

দেহের পুষ্টি ॥ মানব দেহের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি রোধে এটি উত্তম। এ ফলে প্রচুর পরিমাণে আঁশ রয়েছে। যা থেকে পেটের ব্যথা ও লিভার জটিলতা দূর করা সম্ভব।এছাড়াও এ ফলে প্রচুর পরিমাণে মিনারেল, ভিটামিন সি ও আঁশের মাত্রা বেশি রয়েছে। চিকিৎসকের মতে, প্রতি ১শ গ্রাম ফলে দশমিক ৬১ গ্রাম চর্বি, দশমিক ৯ গ্রাম আঁশ, দশমিক ৬৮ গ্রাম এ্যাশ, ৮৩ গ্রাম পানি, ৩৬ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ৯ মিলিগ্রাম এসফরিক এ্যাসিড, দশমিক ২২ গ্রাম প্রোটিন ও দশমিক ৬৫ গ্রাম আয়রণ রয়েছে। ফলে শরীরে রক্তের গ্লুকোজকে এ ফল সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এছাড়াও ভাতের সঙ্গে সালাদ হিসেবেও এ ফল মুখরোচক।
এ ব্যাপারে পাহাড়তলীস্থ কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রজনন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্ষাকালেই এ ফলের প্রাপ্তি বেশি। মানবদেহের জন্য এটি অনেক উপকারি। ফলে এদেশে এ ফলের চাষ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে করা হলে লাভবান হবে প্রত্যেকেই। ড্রাগন গাছ ও ফলের উপর আমরা যথেষ্ট গবেষণা করেছি। গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে টার্গেটের তুলনায় অধিক ফল পাওয়া সম্ভব। আঁশযুক্ত এ ফল এদেশে কম পাওয়া গেলেও সম্প্রতি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রচুর পরিমাণে চারা নিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাধারা/এফএস












